ভারতে বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে ভাওয়াইয়া সম্রাটের জন্মভিটা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার নাটাবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বলরামপুর গ্রামের প্রায় কয়েক বিঘা জমি নিয়ে ছিল ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদের বাড়ি। যে বাড়ি থেকে সৃষ্টি হয়েছিলো ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে’ কিংবা ‘তোরসা নদী উথাল-পাতাল কার বা চলে নাও’সহ এমন অসংখ্য গান। প্রচলিত আছে, ভাওয়াইয়া গানের জন্মই হয়েছিলো ‘হাওয়া মহল’ নামের এই বাড়ি থেকে। সৃষ্টি হয়েছিল কাঁঠাল কাঠের তৈরি দোতারা বাদ্যযন্ত্রের।

এখন সেই ঐতিহাসিক বাড়িটি পড়ে আছে ঘন জঙ্গলের আড়ালে। ভেঙে পড়েছে বাড়ির কাঠামো। নেই সেটি রক্ষণাবেক্ষণের কোনও উদ্যোগ। 

ইতিহাস বলছে, একসময় খোল-করতাল-ঢোলক এবং দোতারার তালে সকাল-সন্ধ্যা রেওয়াজ চলতো এই বাড়িতে, সেসব এখন অতীত। এখন আর সেখানে কেউ থাকেনা। যদিও স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে আজও রয়েছে আব্বাসউদ্দীনের পিতা-মাতার গোরস্থান। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সম্পূর্ণ জঙ্গলে ঢেকে আছে আব্বাসউদ্দীনের পৈত্রিক বাড়িটি। যে বাড়ির ভেতরে রয়েছে বিরাট এক ইন্দিরা (কুয়া)। একসময় হাতি থাকতো এই বাড়িতে। 

স্থানীয় বাসিন্দা ঠাকুরদাস পাল স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘‘সেই সময় তিনি অনেক ছোট ছিলেন। কিন্তু আমার মনে আছে রেওয়াজ ভবনের বারান্দায় বসে দূরে একটি বককে ফাঁদে আটকে যেতে দেখে আব্বাসউদ্দীন গান লিখেছিলেন, ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে...’। আব্বাসউদ্দীন চলে যাওয়ার পর একটু একটু করে সমাজ বিরোধীদের হাতে চলে যায়, প্রাচীন এই বাড়ির কাঠগুলি খুলে নিয়ে যান তারই আত্মীয়-স্বজনেরা। এখন আর এই বাড়িতে কেউ থাকে না। আত্মীয়-স্বজন যারা রয়েছেন তারা বেশিরভাগ রয়েছেন কোচবিহার সদরে, আর পুরনো আত্মীয়-স্বজন যারা রয়েছেন তারা সবাই বাংলাদেশে।’’ 

জানা গেছে, মূলত দেশভাগের সময় (১৯৪৭) আব্বাসউদ্দীন ভারত ছেড়ে বাংলাদেশে পাড়ি জমান, তারপর থেকেই বর্তমান বাংলাদেশ তার বাসস্থান হয়ে ওঠে। ৩০ বছরের বেশি সময় থেকে বলরামপুর গ্রামের বাড়িটি ফাঁকা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব তিলে তিলে নষ্ট করে দিচ্ছে পুরনো এই স্থাপত্যকে। 

উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথ ঘোষ এই বাড়িটিকে নিয়ে একটি সংগ্রহশালা তৈরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে তার পরাজয়ের পর সেই উদ্যোগ কোথাও যেন হারিয়ে গেছে। স্থানীয়রা মনে করেন, এভাবে থাকতে থাকতেই হয়ত এক সময় ইতিহাসের পাতা থেকেও হারিয়ে যাবে, ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দীনের এই জন্মভিটার স্থাপত্যটুকু।

আব্বাসউদ্দীন সম্পর্কে ফরহাদ মজহার বলেছেন, ‘আব্বাস উদ্দিন কেবল গায়ক ছিলেন না, এই প্রজন্মের গায়করা যদি ভাবেন আব্বাস উদ্দিন শুধু গান গেয়ে এদেশের মানুষের মন জয় করেছেন তাহলে তা মস্ত বড় ভুল হবে।আব্বাস তার সময়কালের আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামকে ধারণ করেছিলেন, সঙ্গে ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম এবং আরও অনেকে।’

অজস্র গান সৃষ্টি ও গাওয়ার পাশাপাশি আব্বাসউদ্দিন আহমেদ মোট ৪টি বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এগুলো হলো বিষ্ণুমায়া (১৯৩২), মহানিশা (১৯৩৬), একটি কথা ও ঠিকাদার(১৯৪০)।

আব্বাসউদ্দীন আহমদ ১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আব্বাসউদ্দীন আহমদের পিতা জাফর আলী আহমদ ছিলেন তুফানগঞ্জ মহকুমার আদালতের উকিল। মাতা হিরামন নেসা। শৈশবে বলরামপুর স্কুলে আব্বাসউদ্দীনের শিক্ষা জীবন শুরু হয়। ১৯১৯ সালে তুফানগঞ্জ স্কুল থেকে তিনি প্রবেশিকা এবং ১৯২১ সালে কুচবিহার কলেজ থেকে আই.এ পাস করেন। এখান থেকে বি.এ পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়ে তিনি সঙ্গীত জগতে প্রবেশ করেন। তার বড় ছেলে ড. মোস্তফা কামাল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি ছিলেন। মেজো ছেলে মুস্তাফা জামান আব্বাসী ও একমাত্র মেয়ে ফেরদৌসী রহমান কণ্ঠশিল্পী।

তিনি ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।