একদিন আগেও দারুণ রৌদ্রজ্জ্বল ছিল সাগরপাড়ের ছোট্ট শহর কান। আয়োজকরা সকল প্রস্তুতি সেরে নিয়েছেন। এবার হাসিমুখে সবাইকে বরণের পালা। অথচ কান চলচ্চিত্র উৎসব উদ্বোধনের দিন (১৪ মে) সকাল থেকে মুখ গোমড়া করে রেখেছে কানের আকাশ। মনমরা শহরের আকাশে হালকা কালচে মেঘ ভাসছে। থেমে থেমে ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে। সেই সঙ্গে কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস মিলিয়ে অনেকটাই জবুথবু ভূমধ্যসাগরের এই ফরাসি উপকূল।
কান উৎসবের প্রাণকেন্দ্র পালে দে ফেস্টিভাল ভবনের ওপর টাঙানো সুবিশাল অফিসিয়াল পোস্টার দেখলে মনে হতে পারে, নীল আকাশ বুঝি ঝুলে আছে! কিন্তু মেঘের ঘনঘটায় সেটিও হয়ে আছে কিছুটা ম্লান। জাপানের প্রয়াত কিংবদন্তি পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়ার ‘র্যাপসোডি ইন অগাস্ট’ চলচ্চিত্রের একটি হৃদয়ছোঁয়া দৃশ্য রয়েছে এবারের পোস্টারে। মঙ্গলবার সকালে এসে তাকাতেই মলিন আকাশের নিচে নীল রঙা পোস্টারটিকে যেন মনে হলো বিচ্ছিন্ন কিছু! অথচ এবারের উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য আর পোস্টারের বার্তা হলো– সুখে-দুখে বিশ্বের সবাইকে একসঙ্গে থাকায় অনুপ্রাণিত করা।
কান উৎসবের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘পোস্টারটি আমাদের একত্রিত থাকা ও সবকিছুর মধ্যে সম্প্রীতির গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।’
যদিও উদ্বোধনের দিন মুখভার করে থাকা কান শহরে সেই ‘একসঙ্গে’ থাকার বার্তাটির সঙ্গে যেন খোদ প্রকৃতিই বিরোধ করছে! তাই তো মেঘলা আকাশ থেকে আলাদা হয়ে আছে ‘র্যাপসোডি ইন অগাস্ট’ ছবির দৃশ্যটি। টিপ টিপ বৃষ্টির কারণে অনেকটাই ফাঁকা হয়ে আছে উৎসব ভবনের চারপাশ। সকালে পালে দে ফেস্টিভ্যাল ভবনের মূল ফটকে অতিথি-দর্শনার্থীর চেয়ে ছাতা বিক্রেতার সংখ্যাই যেন ছিল বেশি!
উদ্বোধনী দিনে মেঘলা আকাশের বিষয়টি নিতান্তই কাকতাল। তারও আগে এবারের উৎসব নিয়ে বিষণ্নতার মেঘ জমে থাকায় কান কর্তৃপক্ষের আকাশটা ঝকঝকে নেই। সম্প্রতি কানকে ঘিরে চর্চিত আছে দুটি বড় ইস্যু। একটি মিটু হ্যাশট্যাগ আন্দোলন, অন্যটি উৎসবের ফ্রিল্যান্সার কর্মীদের ধর্মঘটে যাওয়ার গুজব। শঙ্কা রয়েছে, এসব কারণে কানের ৭৭তম আসর না জানি ভেস্তে যায়! সর্বশেষ ১৯৬৮ সালে ফ্রান্স জুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের কারণে কান উৎসব বাতিল হয়। এর আগে ১৯৪৮ ও ১৯৫০ সালে অর্থের অভাবে বাতিল হয় কান। এছাড়া ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে কানের আসর বসেনি।
না, ভেস্তে যাচ্ছে না। কান উৎসবের সকল আয়োজন পরিপাটিভাবে সাজানো হয়েছে ইতোমধ্যে। গোটা বিশ্ব থেকে সমবেত হওয়া সিনেমাপ্রেমীদের জন্য মেঘলা দিনেও হাসিমুখে অপেক্ষায় আছেন উৎসব কর্তৃপক্ষ। যথারীতি লালগালিচা, প্রেস রুম, অভ্যর্থনা কক্ষসহ সবই প্রস্তুত। ক্রমে ভিড় জমছে কানের বাণিজ্যিক শাখা মার্শে দ্যু ফিল্মের স্টল ও প্যাভিলিয়নগুলোতে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত দর্শনার্থী, সাংবাদিক, শিল্পী ও সিনেমাওয়ালারা সারি বেঁধে নিচ্ছেন উৎসবের ব্যাজ। এর বাইরে কানসৈকতে ভিড়তে শুরু করেছে অভিজাত ইয়টগুলো। যদিও মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, হালকা বৃষ্টি ও ঠাণ্ডা বাতাসের কারণে উৎসবের আনন্দ ঠিকঠাক এখনও ডানা মেলেনি কানের পথে পথে। আপাতত কিছুটা ঘরবন্দি হয়ে আছে এই শহর!
বলা দরকার, কানসৈকতে জীবনে একবারই পা রেখেছিলেন মেরিল স্ট্রিপ। ১৯৮৯ সালে উৎসবটির ৪২তম আসরে ‘এভিল অ্যাঞ্জেলস’ চলচ্চিত্রের সুবাদে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতেন তিনি। এতে নিজের শিশুসন্তান হত্যায় অভিযুক্ত মায়ের ভূমিকায় দেখা গেছে তাকে। একই কাজের জন্য অস্কারে সেরা অভিনেত্রী বিভাগের মনোনয়ন জোটে তার কপালে।
উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠান ফ্রান্সে ফ্রান্স টেলিভিশন এবং আন্তর্জাতিকভাবে ব্রুট সরাসরি সম্প্রচার করবে। দুটি আয়োজন সঞ্চালনার দায়িত্ব পেয়েছেন ফরাসি কমেডিয়ান-অভিনেত্রী ক্যামিল কোতাঁন। ৭৭তম কান চলচ্চিত্র উৎসব চলবে ২৫ মে পর্যন্ত।
ছবি: জনি হক/ বাংলা ট্রিবিউন