স্বাধীন চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর সানড্যান্স ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৬ এবার ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ২২ জানুয়ারি এবারের উৎসবের পর্দা উঠেছে, নামবে ১ ফেব্রুয়ারি। এটি যেমন প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট রেডফোর্ডকে ছাড়া প্রথম সানড্যান্স, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ স্টেটের পার্ক সিটিতে অনুষ্ঠিত শেষ আসর। যেখানে ১৯৭৮ সালে শুরু হয়েছিল এই উৎসবের পথচলা।
রেডফোর্ড শুধু একটি উৎসবের জন্ম দেননি, তিনি গড়ে তুলেছিলেন আমেরিকান ইন্ডি সিনেমার জন্য একটি সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম। ফলে এবারের সানড্যান্স আবেগঘন হবে তাকে স্মরণ করার ভেতর দিয়ে। তবে সানড্যান্স মানেই শুধু স্মৃতি নয়; নতুন সিনেমা নিয়ে তর্ক, উত্তেজনা আর ভবিষ্যৎ তারকা ও নির্মাতাদের আবিষ্কার করাই এই উৎসবের আসল প্রাণ।
গত বছর কিছু আলোচিত ছবি সারা বছর আলোচনা টিকিয়ে রাখলেও, অনেক সিনেমা দ্রুত হারিয়ে গিয়েছিল। প্রশ্ন হলো উটাহ-তে শেষ সানড্যান্স কি একটি শক্তিশালী সমাপ্তি টানতে পারবে? সেই উত্তরের খোঁজেই নজর দেওয়া যাক এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত ১০টি ছবির দিকে।
দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস ইজ হিয়ার
রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় সবচেয়ে সময়োপযোগী ছবিগুলোর একটি। ইরানে গোপনে ধারণ করা এই ছবিটি শিল্পীস্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের গল্প বলে।
ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে ছবির দুই নারী প্রধান চরিত্রসহ বহু কলাকুশলীই যুক্তরাষ্ট্রে এই উৎসবে অংশ নিতে পারছেন না, যা ছবির বাস্তবতাকেই আরও নির্মমভাবে সামনে আনে।
নাটালি পোর্টম্যান মানেই ঝুঁকি নেওয়ার সাহস। ‘ব্ল্যাক শৌস’–এ অস্কারজয়ী অভিনয়ের পর তিনি যেমন ‘জ্যাকি’, ‘অ্যানিহিলেশন’ আর ‘মে ডিসেম্বর’–এর মতো সাহসী কাজে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, তেমনি কিছু ব্যর্থ পরীক্ষাও করেছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি তিনি সত্যিই পালন করছেন।
ক্যাথি ইয়ান পরিচালিত ‘দ্য গ্যালারিস্ট’ একটি ডার্ক স্যাটায়ার, যার পটভূমি আর্ট বাসেল মায়ামি। পোর্টম্যান এখানে এক গ্যালারিস্টের ভূমিকায়, যিনি এক ভয়ংকর পরিকল্পনায় জড়িয়ে পড়েন, যেখানে একটি মৃতদেহই হয়ে ওঠে শিল্পকর্ম!
সহঅভিনয়ে আছেন জেনা ওর্টেগা, ডাভিন জয় র্যান্ডলফ, জ্যাক গ্যালিফিয়ানাকিস, স্টার্লিং কে ব্রাউন, ক্যাথরিন জেটা-জোনস, এমনকি চার্লি এক্সসিএক্স—উৎসবের সবচেয়ে লোভনীয় কাস্টগুলোর একটি।
২০২৬ যেন সিনেমায় চার্লি এক্সসিএক্স–এর বছর। তিনটি ছবিতে থাকলেও ‘দ মোমেন্ট’–এ তিনিই কেন্দ্রীয় চরিত্র। এটি একটি অ্যাবসার্ড পপ মকুমেন্টারি, যেখানে তিনি নিজেরই একটি অতিরঞ্জিত সংস্করণে অভিনয় করেছেন।
২০২৪ সালের ‘ব্রাট সামার’–এ যদি তিনি ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতেন, তবে কী হতো- এই প্রশ্ন থেকেই ছবির জন্ম। ‘দিস ইজ স্পাইনাল ট্যাপ’–এর অনুপ্রেরণায় তৈরি এই ব্যঙ্গচিত্র সাহসী, ঝুঁকিপূর্ণ এবং উৎসবের সবচেয়ে আলোচিত টিকিটগুলোর একটি হতে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সানড্যান্স ডকুমেন্টারির জন্য আরও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে। এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অ্যালেক্স গিবনি নির্মিত এই তথ্যচিত্র, যা ২০২২ সালে লেখক সালমান রুশদির ওপর হামলা এবং তার পরবর্তী জীবনযুদ্ধের অন্তরঙ্গ বিবরণ।
রুশদির স্মৃতিকথা অবলম্বনে নির্মিত ছবিতে তার স্ত্রী র্যাচেল এলিজা গ্রিফিথস ধারণ করা ফুটেজও রয়েছে। রুশদির ভাষায়, এটি কোনও ‘ট্রু ক্রাইম’ নয়, বরং এক গভীর ভালোবাসার গল্প।
প্রায় প্রতি বছরই সানড্যান্স থেকে একটি বড় হরর ব্রেকআউট আসে। এবার সেই সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি ‘বাডি’র দিকে। ‘বারবারিয়ান’–এর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের এই মিডনাইট মুভিটি একদল কিশোরকে ঘিরে, যারা একটি শিশুতোষ টিভি শোর ভয়ংকর সংস্করণ থেকে পালাতে বাধ্য হয়।
ক্রিস্টিন মিলিওটি, মাইকেল শ্যানন, প্যাটন অসওয়াল্ট, কিগান-মাইকেল কি-এই অদ্ভুত কিন্তু আকর্ষণীয় কাস্ট ইঙ্গিত দেয়, এটি হতে পারে ভয় ও কৌতুকের অদ্ভুত মিশ্রণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ডকুমেন্টারির ঢেউ আসা সময়ের ব্যাপারই ছিল। ড্যানিয়েল রোহের নির্মিত এই ছবি এআইয়ের সম্ভাবনা ও বিপদের দ্বন্দ্ব তুলে ধরে। ‘এভরিথিং এভরিয়োয়্যার অল এ ওয়ান্স’–এর নির্মাতা ড্যানিয়েল কোয়ান প্রযোজক হিসেবে যুক্ত থাকায় আগ্রহ আরও বেড়েছে।
জন উইলসন–এর অদ্ভুত, মানবিক পর্যবেক্ষণের ধারাবাহিকতা এবার বড় পর্দায়। একটি হলমার্ক মুভি লেখার কর্মশালার শিক্ষা ব্যবহার করে ‘কংক্রিট’ নিয়ে ডকুমেন্টারি বিক্রি করার চেষ্টা, এই ভাবনাই ছবির ভিত্তি। অপ্রত্যাশিত, আনন্দময় ও ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার প্রতিশ্রুতি দেয় এটি।
‘ডোন্ট অরি ডার্লিং’–এর পর অলিভিয়া ওয়াইল্ড–এর নতুন পরিচালনা নিয়ে কৌতূহল থাকাটাই স্বাভাবিক। একটি স্প্যানিশ কমেডি অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে এক দম্পতি প্রতিবেশীদের কাছ থেকে এক অস্বস্তিকর আমন্ত্রণ পায়।
সেথ রোজেন, পেনেলোপে ক্রুজ, এডওয়ার্ড নর্টন; শক্তিশালী অভিনয়শিল্পী ও ৩৫ মিমি ফিল্মে ধারণ করা সিনেমাটোগ্রাফি ছবিটিকে সানড্যান্সের ক্লাসিক চেম্বার ড্রামার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ইথান হক ও রাসেল ক্রো, দুই প্রজন্মের শক্তিশালী অভিনেতার মুখোমুখি উপস্থিতি। ১৯৩০–এর দশকে এক শ্রম শিবির থেকে পালাতে সোনা পাচারের গল্প নিয়ে নির্মিত এই ঐতিহাসিক নাটকটি শক্তিশালী অভিনয়ের আগাম বার্তা দেয়।
সবচেয়ে ‘আনফিল্টারড’ তারকাদের একজন কোর্টনি লাভকে নিয়ে এই তথ্যচিত্র। ২০১৯ সালে লন্ডনে পাড়ি দেওয়ার পর তার সৃষ্টিশীলতা ও নতুন অ্যালবামের যাত্রা উঠে এসেছে এখানে।
মাইকেল স্টাইপ ও বিলি জো আর্মস্ট্রংয়ের মতো সংগীত তারকাদের অংশগ্রহণ ছবিটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
রবার্ট রেডফোর্ডকে বিদায়, পার্ক সিটিকে বিদায়—সব মিলিয়ে সানড্যান্স ২০২৬ শুধুই একটি উৎসব নয়, একটি যুগের সমাপ্তি। তবে এই ১০টি ছবি প্রমাণ করে, সানড্যান্স এখনও ঝুঁকি নিতে জানে, প্রশ্ন তোলে এবং নতুন গল্পের দরজা খুলে দেয়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান