বাংলা লোকগানের মরমী ধারায় নিজের এক আলাদা জগৎ তৈরি করেছেন তরুণ শিল্পী সূচনা শেলী। বাবার হাত ধরে সংগীতের শুরু, আর সেই সূত্রেই গড়ে ওঠা সুরের প্রতি গভীর প্রেম আজ তাকে নিয়ে গেছে দেশ-বিদেশের মঞ্চে। তাঁর গানে যেমন আছে লালনের দর্শন, তেমনি আছে আত্ম-অন্বেষণের এক নিরন্তর সাধনা। আধুনিকতার ভিড়ে থেকেও তিনি বেছে নিয়েছেন আদি মাটির পথ—যেখানে গান শুধু বিনোদন নয়, বরং সত্য, মানবতা আর আত্মার সঙ্গে সংযোগের এক মাধ্যম। বৈশাখের এই সময়ে নিজের সংগীত, দর্শন ও জীবনবোধ নিয়ে কথা বললেন সূচনা শেলী।
আপনার সংগীতের শুরুটা তো বাবার হাত ধরে, সেই শুরুর গল্পটা শুনতে চাই। কিভাবে ভেতরে সুরের প্রতি প্রেমটা গেঁথে গেল?
আমার বাবা জলিল সরদার একজন গুণী শিল্পী ছিলেন। তাঁর হাতেই আমার হাতেখড়ি। তাঁর গান শুনেই মূলত সুরের প্রতি আমার প্রেমটা শুরু। যদিও তিনি নিজে অনেক প্রচারবিমুখ ছিলেন। তিনি সব সময় চাইতেন তাঁর চার মেয়ের ভেতরে অন্তত একজন মেয়ে গান শিখুক, আর সবার ভেতরে আমাকেই বেছে নেন গান গাওয়ার জন্য। আজ তিনি নেই, অথচ আমি ঠিকই বিশ্ব জয় করেছি।
পহেলা বৈশাখ মানেই বাঙালির আত্মপরিচয়ের উৎসব। সেই ছোটবেলার বৈশাখ আর আজকের শিল্পী 'সূচনা শেলী'র বৈশাখের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কোথায় দেখেন?
ছোটবেলায় পহেলা বৈশাখে আনন্দ করতে মেলায় যেতাম। আর এখন মানুষের মাঝে আনন্দ বিলাতে বিভিন্ন বৈশাখী প্রোগ্রামে যাই। এটাই মূলত পার্থক্য—ছোটবেলার শেলী আর আজকের আমি।
লোকগানে 'গুরু-শিষ্য' পরম্পরা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনার জীবনের গুরুর অবদান এবং তার দেওয়া কোন শিক্ষাটি আপনাকে এই কঠিন সাধনার পথে অবিচল রেখেছে?
প্রথম কথা, আমার গুরু আমার বাবা। আমার বাবা আমাকে যে গানগুলো শিখিয়েছেন, সেগুলো আসলে শুধু মানুষকে আনন্দ দেয় না—এগুলো সত্যের বাণী। এই কথাগুলোই আমাকে অনুপ্রেরণা যোগায়। আমার গুরু, মানে আমার বাবা, যদি আমাকে এই ধরনের গান না শিখিয়ে অন্য ধরনের গান শেখাতেন, তাহলে হয়তো আমার যাত্রা অনেক আগেই থেমে যেত। আর তিনি সব সময়ই চেয়েছেন আমি একজন সাধু হই। আমি সেই পথেই এগোনোর চেষ্টা করছি। সাঁই চাইলে হয়তো সেটা হয়েও যাবে। সুতরাং বলতে পারেন, আমার টার্গেট শুধু শিল্পী হওয়া না। এ ব্যাপারে আমি অবিচল ছিলাম, আছি, থাকবো।
লালন শাহের দর্শনে 'নিজেকে চেনা'ই আসল কথা। গানের মধ্য দিয়ে আপনি নিজের জীবনের কোন সত্যের সন্ধান করছেন?
সাঁইজি নিজেই নিজেকে চেনার চেষ্টা করার কথা বারবার বলেছেন। আসলে কি আমরা নিজেদেরকে চেনার চেষ্টা করি, বা চেষ্টা করলেই সহজে চিনতে পারি? এটাই একটা কঠিন সাধনা। তিনি তাঁর জীবনের কোটি কোটি বাণীর ভেতরে শুধু একটা লাইনই যদি আপনি মেনে দেখেন—“সত্য বল, সুপথে চল, ওরে আমার মন”—আপনার জীবন বদলে যাবে। আর যাদের বিন্দুমাত্র জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক আছে, তারা সকলেই এই একই সন্ধান করছে—শুধু আমি একা না।
বর্তমান তরুণ প্রজন্ম যখন এআই (AI), টিকটক আর দ্রুতগতির রিলে মগ্ন, তখন আপনি ধীরস্থির 'মরমী' সাধনার পথ বেছে নিলেন কেন?
বর্তমান তরুণ প্রজন্ম একটা দিকে ধাবমান—ঠিক। তবে ওদের জন্ম আর আমার জন্ম এক সময়ে হয়েছে বলে আমি মনে করি না। আমার ধারণা, আমার আত্মার বয়স অনেক আদি, পুরোনো। আর প্রকৃতির একটা নিয়ম আছে—এক একটা সময়ের একটা সার্কেল থাকে, যে সার্কেল একসময় বর্তমানকে আবার আদিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আর আমি আদিতেই আরামে বসে থাকবো। যখন বর্তমান আবার আদিতে ফিরে আসবে, তখন ওদের সঙ্গে আমার মিলন হবে—আর সেটাই হবে আমার প্রাপ্তি, আমার আনন্দ।
বৈশাখী আয়োজনে কোথায় কোথায় শো করছেন?
গত ১১ এপ্রিল ইষ্টিশন কমিউনিকেশনস-এর আমন্ত্রণে বসুন্ধরা এক্সপো জোনে ছুটি উৎসবে, ১৩ এপ্রিল ঢাকা সেশানস-এর আয়োজনে জাস্টিস শাহাবুদ্দিন পার্কে পারফর্ম করেছি। আজ পূর্বাচলে ছায়াতলের আমন্ত্রণে পারফর্ম করছি।
যান্ত্রিকতার এই যুগে মাটির গান টিকিয়ে রাখা কতটা চ্যালেঞ্জিং?
চ্যালেঞ্জিং তো বটেই। কারণ, ওই যে বললাম—আমি অনেক আদি। আমি আমার জায়গায় ঘাপটি মেরে বসে আছি। দেখবেন, একটা সময় ঠিকই আমরা সবাই এক ছাতার নিচে জড়ো হবো। সবাই একসাথে প্রেমানন্দে কাটাবো।
আপনি গিটার বা আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সাথে লালনগীতি পরিবেশন করেন। সাধু-গুরুদের ভাবধারা বা গানের আদি প্রাণ বজায় রেখে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সাথে তাল মেলানো কি সহজ, নাকি এতে গানের মূল সুর ক্ষুণ্ণ হওয়ার ভয় থাকে?
আসলে ব্যাপারটা সুর, তাল আর লয়ের। এই বিষয়টাই আসল। যন্ত্র যদি টিউনে থাকে আর শিল্পীর কথাগুলো সঠিক ও শুদ্ধ থাকে, তাহলে সাধু-গুরুদের ভাবধারা বা গানের আদি প্রাণ বজায় রেখে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সাথে তাল মেলানো যেতেই পারে। এতে আদির সঙ্গে বর্তমানের একটা মিলন হয়। তবে কোনো কিছুই বিকৃত করার সুযোগ এখানে নেই। আর যদি কেউ এটা করে, তাহলে সেটা সে না বুঝেই করবে। বুদ্ধিমান শ্রোতা সেটা কখনোই গ্রহণ করবে না।
লোকগান কি লোকের কানে যাচ্ছে? না অন্য গানের ভীড়ে হারিয়ে যাচ্ছে?
লোকগান শুধু লোকের কানে যাচ্ছেই না—মানুষ তো বেঁচেই আছে লোকগানের সুরে। পথে-প্রান্তরে, মাঠে-ঘাটে, গ্রামে-গঞ্জে—কোথায় নেই লোকগান? শহর বা গ্রামের বিষয় না। অন্য গান বলতে যেটা বোঝায়, পশ্চিমা কালচার—ওটাই আসলে ক্ষণস্থায়ী।
আপনার গানের প্রধান শ্রোতা কারা বলে আপনি মনে করেন?
গানের শ্রোতা আসলে সবাই। শ্রেণিবিভাগ করার ক্ষমতা আমার নেই। কারণ আমি গান করি মানুষের জীবনের মুক্তির উদ্দেশ্যে। সুতরাং ধনী-গরিব নির্বিশেষে আমার শ্রোতা আছে।
আজকাল তো ফিউশনের নামে অনেক সময় গানের কথা বা সুর বিকৃত হয়। আপনার কি মনে হয় সাধারণ মানুষ বা বর্তমানের শ্রোতারা লোকগানের মূল দর্শনটা বুঝতে পারছে, নাকি তারা কেবল এর ছন্দটাকেই গ্রহণ করছে?
ফিউশনের নামে হোক বা অন্য কারণে—গানের কথা বা সুর বিকৃত করা একটা অপরাধ। এই অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। গানের কথা বা সুর বিকৃত হলে গানের মূল ভাবধারা নষ্ট হয়ে যায়। তখন সাধারণ মানুষ বা বর্তমানের অনেক শ্রোতা লোকগানের মূল দর্শনটা বুঝতে পারে না—শুধু ছন্দে মাথা দোলায়। কিন্তু যারা বুঝে গান শোনে, তারাই আসল আনন্দটা পায় এবং তারা তাদের জীবনও সেইভাবে সাজাতে পারে।
শহর আর গ্রামের শ্রোতাদের মধ্যে লালনের বাণীর গ্রহণযোগ্যতায় কোনো পার্থক্য খুঁজে পান কি?
শহরে কি গ্রামের মানুষ থাকে না? থাকে। আর শহরও তো একসময় গ্রাম ছিল। শহরের মানুষও সারাদিন পরিশ্রম করে, আর রাতে ঘুমানোর আগে হলেও অন্তত একটা-দুটো গান শোনে—আমি এটা বিশ্বাস করি।
আপনার উল্লেখযোগ্য মঞ্চ পারফর্মেন্সগুলো কি কি?
উল্লেখযোগ্য মঞ্চ পারফর্মেন্স বলতে—আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ পারফর্মেন্স “রুখ সানাত” (কিরগিজস্থান), “হাড়ওয়া লালন মেলা” (ভারত), “কোক স্টুডিও কনসার্ট” (বাংলাদেশ)।
বিদেশের মাটিতে আমাদের এই মাটির গান নিয়ে তাদের কৌতূহল কেমন ছিল?
সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আর সংগীতের কোনো ভাষা নেই। আমার মনে হয় পৃথিবীর সব সংগীতই সাত সুরের বাঁধনে বাঁধা। একশোটিরও বেশি দেশের গুণী শিল্পীদের ওই প্রতিযোগিতায় আমি বাংলাদেশকে দ্বিতীয় স্থানে আনতে পেরেছি—আমাদের মাটির গানের শক্তিতে। তাদের আগ্রহ না থাকলে এটা সম্ভব হতো না।
আপনার কতগুলো গান এ পর্যন্ত বেরিয়েছে?
হিসাব করে বলার কোনো উপায় নেই। এক কথায়—অগণিত।
গান শেখার জার্নিটা? গুরুদের কথা স্মরণ করবেন আজ?
অসম্ভব কঠিন ছিল। আমার বাবা জলিল সরদার, ফকির নহির সাঁই ছাড়াও আরও অনেক সাধু-গুরুর সঙ্গে আমার ভাব-ভালোবাসা ছিল। তাদের সবার চরণে ভক্তি। সবাইকে খুব মিস করি।
কণ্ঠটা কিভাবে এমন শান দিলেন?
যে কণ্ঠে আমার গান বের হয়, সেটা আসলে আমার না। সাঁই নিজেই গান করেন—আমি তো শুধু মাধ্যম।
কতগুলো ফ্যান এখন পর্যন্ত প্রেমে পড়েছে?
ফ্যান মানে ভক্ত। আর প্রেমে না পড়লে কেউ ভক্ত হতে পারে না। সব ভক্তই আমার প্রেমে পড়া। আমিও আমার ভক্তদের প্রেমে পড়ে আছি।
বয়স কত হল?
আমার আত্মার বয়স হাজার কোটি বছর। আর আমি এই পৃথিবীতে পদার্পণ করেছি ২ জানুয়ারি, ১৯৯৪ সালে।
প্রেম করেছেন?
আমি সব সময় প্রেমেই থাকি। প্রতি মুহূর্তেই আমার প্রেম হতে থাকে।
প্রেমের সংজ্ঞা আপনার কাছে কি?
আমার কাছে প্রেমের সংজ্ঞা হলো মানবতা। যেমন, আমি যদি একটা কুকুর পুষি, তাহলে তার প্রতিও আমার একটা প্রেম হবে—এটাই মানবতা। আর আমি সবসময়ই এর ভেতরে থাকি।
জয় হোক, সবাই ভালো থাকুক।
বৈশাখের এই দিনে নতুন প্রজন্মের সেই সব তরুণদের উদ্দেশ্যে আপনার কী বলার আছে, যারা নিজেদের সংস্কৃতি ছেড়ে ভিনদেশি সংস্কৃতিতে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ছে?
ওদের উদ্দেশ্যে একটা কথাই বলতে চাই—তোমরা ভিনদেশি সংস্কৃতি ছেড়ে আমাদের নিজেদের সংস্কৃতিতে এসে দেখো। এখানে প্রেম, ভালোবাসা, মায়া, দর্শন—সবই আছে।
সামনে তাকিয়ে নিজেকে কোথায় দেখতে চান? কেমন রূপে দেখতে চান?
নিজেকে দেখতে চাই একজন শুদ্ধ মানুষ হিসেবে। শুদ্ধ রূপে দেখতে চাই নিজেকে।