নির্মাতা-সমালোচক বাহাস

কাঠগড়ায় ‘বনলতা সেন’

সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্র নিয়ে আমার লেখা একটি সম্যক আলোচনা ছাপে বাংলা ট্রিবিউন, শিরোনাম: ‘বনলতা সেন: কাব্যিক অন্বেষণের চলচ্চিত্র’। লেখাটি পাঠপূর্বক ছবির পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল একটি নিবন্ধ রচনা করেছেন, সেটির শিরোনাম: “শিল্পের কাজ মূর্তি নির্মাণ নয়; মূর্তির সঙ্গে সংলাপ তৈরি করা”। তো এই নিবন্ধে পরিচালক উজ্জ্বল কিছু দ্বিমত পোষণ করেছেন, সেসব নিয়ে আমার কিছু বক্তব্য রয়েছে। সেগুলোই আমি এখানে বিনীতভাবে পেশ করবো।

তবে তার আগে আমি আদাব জানাতে চাই ফরাসি পণ্ডিত রোলাঁ বার্থকে। তিনি ‘লেখকের মৃত্যু’ শিরোনামে একটি রচনা লিখেছিলেন। যার মূল বক্তব্য ছিলো: যে কোনো শিল্পী বা লেখক শিল্পকর্মটি করে ফেললে, বা লিখে ফেললে সেটি আর তার থাকে না। সেই কর্মটি চলে যায় জনপরিসরে। তখন জনগণ সেই শিল্পকর্মটি যারযার মতো করে পাঠ করে নেয়। প্রতিক্রিয়া জানায়। তখন লেখক বা শিল্পীর আসলে আর কিছু করার থাকে না।

তবে রোলাঁ বার্থকে ভুল প্রমাণ করে ‘বনলতা সেনে’র পরিচালক উত্তর ও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এটি করে তিনি ভালোই করেছেন। তার উছিলায় ছবিটি নিয়ে দুটো কথা বেশি বলা যাচ্ছে। চলচ্চিত্র নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, কি-বোর্ডে ঝড় উঠছে, এই কৃতিত্বের দাবীদার একশোভাগ নির্মাতা। উনাদের অক্লান্ত শ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির কারণেই একটি চলচ্চিত্র আমাদের সামনে আসে এবং আমরা তার সূত্র ধরে চিন্তার ডালপালাকে প্রসারিত করতে পারি। ধন্যবাদ জানবেন। চলুন তবে অগ্রসর হওয়া যাক।

প্রথমেই আসি শিরোনাম প্রসঙ্গে। নির্মাতার লিখিত নিবন্ধের শিরোনাম: “শিল্পের কাজ মূর্তি নির্মাণ নয়; মূর্তির সঙ্গে সংলাপ তৈরি করা”। মূর্তির একটি ইংরেজি ইমেজ, স্মর্তব্য আমরা ভাবমূর্তি কথাটি অহরহ ব্যবহার করি। আমি উল্টো কথাই বলবো—শিল্পের প্রাথমিক কাজ মূর্তি তথা ইমেজ তৈরি করা। চলচ্চিত্র পরিচালক নিজেই আপনকার ছবিতে জীবনানন্দের বরাত দিয়ে যে বলছেন “তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়”, সেটি আসলে কী?

ইমেজ ওরফে ‘মূর্তি’ই তো! তো শিল্পের দ্বিতীয় কাজটি হলো এই মুর্তি নির্মাণ করার ভেতর দিয়ে সে শিল্পীকে প্রকাশ করে। ঘুরিয়ে বললে শিল্পী অন্তরাত্মার অনুভূতিকে সূর্যালোকে নিয়ে আসেন। নইলে তো “আত্মরতি”তেই সব ভেসে যেত! এই আত্মরতিটাও মানুষ কেবল নিজের জন্য করে না। করে তার ভেতর থাকা “অপরে”র জন্য। জাক লাকাঁ যাকে প্রকাশ করেন ডলার সাইন দিয়ে, অর্থাৎ সাবজেক্ট তথা সহজ মানুষ যেভাবে বিভাজিত, সেখানে আত্মরতিটাও ‘অপর’কে তুষ্ট করার জন্যই। মনোবিশ্লেষণের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘স্মল আদার’।

দ্বিতীয় ধাপের পর শিল্প চূড়ান্ত কাজটি করে। চূড়ান্ত কাজটি হলো নিজেকে প্রকাশের ভেতর দিয়ে সে অন্যকে ছুঁতে চায়, অপরকে জানাতে চায়, পরম বা ‘বিগ আদার’কে পরিতুষ্ট করতে চায়। তাহলে গোটা বিষয়টি দাঁড়ালো এই—শিল্পী প্রথমত দৃশ্য/মূর্তি নির্মাণ করেন নিজের তাগিদে, নিজেকে প্রকাশের জন্য এবং সর্বোপরী সেই প্রকাশ দিয়ে তিনি অপরের বাসনার বস্তুতে পরিণত হতে চান। জাক লাকাঁ যেমনটা বলেন, আপনার বাসনা সর্বদাই অপরের বাসনাই বটে। মোদ্দা কথা হলো শিল্পীর কাজ অপরের জন্য নিয়োজিত।

তাহলে শিল্প কী, এই প্রশ্ন যদি আপনি বেনেদেত্তো ক্রোচেকে জিজ্ঞেস করেন, তাহলে উনি বলবেন, শিল্পীর অন্তর্দৃষ্টি ও প্রকাশের ঐক্যই হলো শিল্প। যদি কার্ল মার্কসকে জিজ্ঞেস করেন, উনি বলবেন, শিল্প হলো একটি নির্দিষ্ট আর্থসামাজিক অবস্থার ভেতরে সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ। আর যাকে নিয়ে নির্মাতার সাথে আমার বিতর্ক জমে উঠেছে, সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলবেন, শিল্পের কাজ হলো সসীমকে অসীমের সাথে মিলিয়ে দেওয়া, আত্মাকে পরিব্যাপ্ত করে দেওয়া বিশ্বলোকের সাথে। অর্থাৎ তিনি শিল্পীত প্রকাশকে ব্যক্তি পর্যায় থেকে নৈর্ব্যক্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার গোটা প্রক্রিয়াটিকেই শিল্পের কাজ হিসেবে গণ্য করবেন।

এবার নির্মাতা উজ্জ্বলের অন্য ধারণাগুলো নিয়ে আলাপ করা যাক। এবারও একটু পূর্বরাগ যোগ করে বলতে চাই, যীশুখ্রিস্ট কিংবা রবীন্দ্রনাথ, কারো প্রতিই আমার কোনো অন্ধভক্তি বা বিগলিত দশা নেই। তবে ঐতিহাসিক ও সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে দুজনের যতটুকু সম্মান প্রাপ্য, আমি ততোটুকু দিতে কার্পণ্য বোধ করি না এবং অযথা এদের টেনে এনে অযৌক্তিকভাবে ছোট বা বিতর্কিত করার অভিপ্রায়ও পোষণ করি না। এখন রবীন্দ্রনাথকে ‘লাস্ট সাপার’ ফ্রেস্কোর ভেতর যীশুর জায়গায় বসানোকে নির্মাতা তুলনা করতে চাইছেন ইউরোপ-আমেরিকার শিল্পসংস্কৃতিতে প্রতীক ব্যবহারের সঙ্গে।

মাসুদ হাসান উজ্জ্বল লিখছেন, “বাংলাভাষী সমাজে রবীন্দ্রনাথ এমন এক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, যাঁকে ঘিরে সংবেদনশীলতা প্রায় ধর্মীয় মাত্রা লাভ করেছে। বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়; বরং ঐতিহাসিকভাবেই ব্যাখ্যাযোগ্য। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্য যে ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা লাতিন আমেরিকার শিল্প-সংস্কৃতিতে মহৎ ব্যক্তিত্বদের নিয়ে প্রতীকী পুনর্নির্মাণ, পুনর্ব্যাখ্যা কিংবা উল্টোপাঠের প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই স্বাভাবিক শিল্পচর্চার অংশ। সেখানে চে গুয়েভারার প্রতিকৃতি সম্বলিত অন্তর্বাসও পাওয়া যায়, কিন্তু তাতে কেউ মনে করেন না যে বিপ্লব বা বিপ্লবীকে অপমান করা হয়েছে। কারণ শিল্প প্রায়শই ব্যক্তিকে নয়, ব্যক্তির প্রতীকী শক্তিকে ব্যবহার করে।

রবীন্দ্রনাথকে ‘লাস্ট সাপার’ ছবিতে যীশুর স্থলাভিষিক্ত করে নির্মাতা নিজেই কাজটি সম্পন্ন করেছেন, অর্থাৎ যে অনুযোগ তিনি করেছেন, রবীন্দ্রনাথ নামক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাভাষী সমাজ ধর্মের পর্যায়ে নিয়ে গেছে, সেটি তিনি নিজে হাতেকলমে করে দেখিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের গল্প-কবিতা-গান নিয়ে আমার কোনো অন্ধ ভালোবাসা নেই। তার অনেক কবিতা ও গানকেই আমার গড়পরতার চেয়েও নিচে মনে হয়। একই কথা খাটে জীবনানন্দের বেলাতেও। এই বিষয়টি ব্যক্তির অভিরুচির উপর নির্ভর করে।

কিন্তু তাই বলে তাদের খর্ব করার কোনো সুযোগই নেই, কারণ বাংলা সাহিত্যে তাদের যে বিপুল ও বিশাল অবদান, তার তুলনায় ওসব হাতে গোনা কয়েকটি সাধারণ সৃষ্টি কোনো ধর্তব্যের ভেতরেই পড়ে না। যাহোক, নির্মাতাকে মনে রাখতে হবে কনটেক্সট ছাড়া আপনি যা-ই করেন না কেন, সেটি একটি আবর্জনা হতে বাধ্য। চে গেভারার প্রতিকৃতি সম্বলিত অন্তর্বাস মূলত আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে সকলকিছু যখন পণ্যে পরিণত তখন তারা বিপ্লবীদেরকেও বেঁচে দিতে চায়। তো এরও একটা রিডিং আছে।

কাজটি কেন করা হচ্ছে সেই প্রশ্ন করারও যথেষ্ট অবকাশ আছে। চে’র মতো বিপ্লবের প্রতীকি শক্তিকে অন্তর্বাসে ব্যবহার করাটাকে কেন এতোটা নিরীহ প্রজেক্ট হিসেবে নির্মাতা উজ্জ্বল দেখছেন সেটি বোধগম্য নয়। এটি তো ভালগার এক্সপ্রেশন! যদি আপনি বুর্জোয়াদের বিকৃতিকে সমালোচনা করার প্রেক্ষিতে এটি দেখান তাহলে কিন্তু একটা কার্যকারণ ও পরিপ্রেক্ষিত যুক্ত হয়। তাই বলছি, কোন পরিপ্রেক্ষিতে কোন জিনিসকে আনা হচ্ছে, তুলনা টানা হচ্ছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কনটেক্সট ছাড়া একটির মাথা আরেকটির ঘাড়ে বসিয়ে দিয়ে উদ্ভট কিছু করলেই শিল্প হয়ে যায় না। যেমন অন্তর্বাসে চে’র ছবি কোনো শিল্পের পর্যায়ে পড়ে না। চলুন এবার ভিঞ্চির চিত্রকর্মের দিকে তাকাই।

ব্যক্তির প্রতীকি শক্তিই যদি আপনার বিবেচ্য হবে, তাহলে ধরে নিচ্ছি যীশু ও রবীন্দ্রনাথের প্রতীকি শক্তি ব্যবহার করেছেন নির্মাতা। উনাদের প্রতীকি শক্তি কী? সেটি কি নির্মাতা ঠিকঠাক বুঝেছেন? যীশুর প্রতীকি শক্তি দিয়ে বোঝানো হয় মানবজাতির পরিত্রাণকে, কারণ তিনি মানবজাতির সকল পাপ নিজে মনুষ্য আকারে গ্রহণ করে ক্রুশে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতীকি শক্তি কী?

‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্রের দৃশ্য
তিনি বাংলা সাহিত্য তথা বিশ্বসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। এখন ভিঞ্চির আঁকা ‘শেষভোজে’র প্রতীকি শক্তি কী? বিশ্বাসঘাতকতা ও বিষাদের ভেতরেও পুনরুত্থানের ওয়াদা। এখন এই ছবি কিভাবে বনলতা সেন ও জীবনানন্দের জীবনীতে প্রাসঙ্গিক হলো? কেনই বা আপনার ভিঞ্চির যীশু ও শিষ্যদেরকে হুবহু পুনঃচিত্রিত করতে হলো?

নির্মাতা হিসাবে আপনার অভিপ্রায় কী? রবীন্দ্রনাথকে যীশুর স্থলাভিষিক্ত করা? সেক্ষেত্রে তো যীশুর সাথে রবীন্দ্রনাথের একটি সম্পর্ক বা কনটেক্সট আপনাকে আগে স্থাপন করতে হবে চলচ্চিত্রে। যুক্তিসিদ্ধ বা রিজনিংয়ের ভেতর নিয়ে আসতে হবে। আপনি হুট করে এই তুলনা বা বিচারে দুই ব্যক্তিত্বকে টেনে আনতে পারেন না। টেনে আনলে এটা হয়ে ওঠে খাপছাড়া ও বিসদৃশ।

অনেকটা ধরুন অত্যন্ত সুন্দরী নারীর মুখমণ্ডলে মোটা ও চওড়া গোফ লাগিয়ে দেওয়ার মতো ব্যাপার। এটাকে কোনোভাবেই আপনি দাবি করতে পারেন না, এমনটা করে সৌন্দর্যের পুনঃনির্মাণ বা উল্টোপাঠ করেছেন। পুনঃনির্মাণ বা উল্টোপাঠ কী জিনিস সেটি একটু পরই বলছি। তত্ত্ব অপেক্ষা যেহেতু উদাহরণ শ্রেয়, তাই উদাহরণ দিয়েই বলছি।

আগেই বলেছি সবকিছুর পরিপ্রেক্ষিত থাকতে হয়, প্রেক্ষাপট রচনা করতে হয়, তারপর আপনি বিষয়টি পর্দায় নিয়ে আসুন, সেখানে যৌক্তিকতা ফুটে উঠবে। বেখাপ্পা লাগবে না। যীশু নিজেই যেখানে ওই শেষভোজে শোকে কাতর, তিনি জানেন কিছুক্ষণ পরই তাকে অন্তিমযাত্রা শুরু করতে হবে, সেখানে তার জায়গায় রবীন্দ্রনাথকে কোন বিবেচনায় বসাবেন? কোনোভাবেই কি এটি যুক্তিসিদ্ধ?

শুধুমাত্র যীশুকে প্রভু হিসেবে গণ্য করা হয় বলে আপনি রবীন্দ্রনাথকে প্রভু বোঝাতে ওই শেষভোজকে তার কনটেক্সট থেকে তুলে এনে আপনার চলচ্চিত্রে বসিয়ে দিতে পারেন না। কিন্তু আপনি জোরজবরদস্তি করে সেটা করেছেন এবং সেজন্য এই দৃশ্যটি আপনার চলচ্চিত্রের জন্য পরিপূরক কিছু হয়ে ওঠেনি। বরং বাড়তি ও অপ্রয়োজনীয় সংযোজন হয়ে ঝুলে রয়েছে। 

চলচ্চিত্রে রেফারেন্স ব্যবহারের ক্ষেত্রে রিজনিং কেমন করে করা যেতে পারে তার একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। এখান থেকেই বোঝা যাবে পুনঃনির্মাণ, পুনঃপাঠ বা উল্টোপাঠ কী জিনিস। লুই বুনুয়েলের বিখ্যাত ‘ভিরিদিয়ানা’ (১৯৬১) চলচ্চিত্রটির কথা ধরা যাক, সেখানেও কিন্তু যীশুর শেষভোজের রেফারেন্স এসেছে।

কিন্তু কিভাবে এসেছে?

বলা হয়, ‘ভিরিদিয়ানা’র চেয়ে এতো তীর্যক ও সমালোচনামূলকভাবে যীশুর শেষভোজকে চলচ্চিত্রে আর আনা হয়নি। আমি বলবো লুই বুনুয়েল মাস্টারপিস রচনা করেছেন। প্রশ্ন হলো কিভাবে? যারা ছবিটি দেখেছেন, তারা জানেন ভিরিদিয়ানা একজন ধর্মযাজিকা। পারিবারিক ঘটনা ও ব্যক্তিগত বোঝাপড়া শেষে ভিরিদিয়ানা সিদ্ধান্ত নেন তিনি আর আশ্রমে ফেরত যাবেন না, বরং তার বাড়িতে তিনি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলবেন এবং গরীবদের দান ও দয়া দেখাবেন। তো সিদ্ধান্ত মোতাবেক তিনি ভিক্ষুকদের বাড়িতে এনে থাকার সুযোগ করে দেন, খাবার-দাবার দেন। যত্ন-আত্তি পেয়ে ভিক্ষুকগুলো মাথায় চড়ে বসে। একদিন ভিরিদিয়ানার অনুপস্থিতিতে এই গরীবের দল ওই বাড়ির মুরগি-ছাগল সব মেরে এক ভোজের আয়োজন করে। খাওয়াদাওয়ার এক পর্যায়ে তারা ঘরের সব ভেঙেচুরে শেষ করে দেয়। সেসময় মশকরা করে একজন ছবি তোলার ভান করে আর অন্যরা পোজ দেয় ভিঞ্চির ‘লাস্ট সাপারে’র চরিত্রদের মতো।

এই দৃশ্যটিই হলো পুনঃনির্মাণ বা পুনঃব্যাখ্যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি যীশুর শেষভোজকে নতুন করে সাজালেন অকৃতজ্ঞ গরীবদের দিয়ে। এটাই হলো উল্টোপাঠ। ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানোর পর তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। কারণ স্পেনে তৎকালে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা ছিল সেখানে ধর্মকে সর্বাগ্রে রাখা হতো। ধর্মান্ধতা ছিল।

বুনুয়েল সেই খ্রীস্টিয় বিশ্বাসকে নিয়ে চরম ব্যাঙ্গ তো করলেনই, পাশাপাশি বুর্জোয়াদের সমাজসেবার নামে যে ভণ্ডামি সেটিকেও একহাত দেখে নিলেন। এখন কথা হলো এটি করার জন্য বুনুয়েল পুরো ছবিতে শুরু থেকেই একটি ধর্মীয় প্রেক্ষাপট রচনা করেছেন। তিনি ধর্মযাজিকাদের আশ্রম দেখিয়েছেন, যাজিকার যীশুর ক্রুশ ও মুকুট বয়ে বেড়ানো দেখিয়েছেন, ক্রুশের ভেতর লুকিয়ে থাকা ছুরি দেখিয়েছেন ইত্যাদি। এসব দেখাতে দেখাতে চরম ব্যাঙ্গ মঞ্চস্থ হয় শেষভোজের দৃশ্যে। অপরদিকে, আমরা ‘বনলতা সেনে’ কী দেখলাম?

দেখলাম কামে জর্জরিত জীবনানন্দ দাশ, যিনি কামুকের মতো শোভনার উপর ঝাপিয়ে পড়ছেন, বাসর রাতে লাবণ্যকে অনেকটা জোর করেই শুইয়ে দিচ্ছেন, হস্তমৈথুন করছেন, বেশ্যালয়ে যাচ্ছেন এবং তার অল্টার-ইগো বানানো মহীন বা অনুসন্ধানী যুবকটিও একবার কাজের মেয়েকে বিছানায় নিচ্ছে, আরেকবার অধ্যাপিকার সাথে বলতে গেলে কায়দা করে শুয়ে পড়ছে, একাধিকবার শুধু প্যান্ট পরছে আর চেইন লাগাচ্ছে, সুযোগ পেলেই নারীদের টেনে নিয়ে চুম্বন করছে ইত্যাদি।

জীবনানন্দ দাশ ও শোভনা
ছবির মিজোঁসিন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় অধ্যাপিকা যখন যুবকটির ঘরে যায় তখন বারবারই ফ্রেমে জেমস বন্ডের একটি বই দেখা যায়। সেই যুবকের ঘরে আবার পাবলো পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’ (১৯৩৭) ও গুইদো রেনির আঁকা ‘আর্কেঞ্জেল মাইকেল’ (আনুমানিক ১৬৩৫) রাখা। কেন এসব ছবি যুবকের ঘরে রাখা তা বোধগম্য নয়। ‘গুয়ের্নিকা’ একটি যুদ্ধবিরোধী চিত্রকর্ম। আর ‘মাইকেল’ হলো দেবদূতের দ্বারা স্বর্গ থেকে শয়তানকে বিতাড়িত করার উপর একটি চিত্রকর্ম।

এটি মন্দের উপর ভালো’র বিজেতা হওয়ার বার্তা বহন করে। তো জীবননান্দের বনলতা খুঁজতে থাকা যুবকের ঘরে কেন যুদ্ধবিরোধী ও শয়তান খেদানো পেইন্টিং রাখা হলো সেটির কোনো প্রেক্ষাপট তৈরি করেননি পরিচালক। স্রেফ বসিয়ে দিয়েছেন। তো এসব করতে করতে হুট করেই ভিঞ্চি এলেন যীশুর শেষভোজ নিয়ে এবং সেই ভোজে দেখা গেল পাতা টেবিলে খাবারের সাথে জীবনানন্দ শুয়ে আছেন চিৎ হয়ে। এগুলো হলো গিমিক বা চমক মাত্র। যার যৌক্তিকতা নেই, সারবস্তুও অনুপস্থিত। আপনি জীবনান্দের মৃত্যুর জন্য শোক প্রকাশ ও কাউকে দায়ী করতে চাইছেন, তো সেটি প্রকাশ করার আরো হাজারটা শৈল্পিক পন্থা রয়েছে। সেদিকে না গিয়ে নির্মাতা অর্থহীন গিমিকের পথটি বেছে নিলেন।

পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’তে ফিরে যাই। যুবকের ঘরের পাশাপাশি এই পেইন্টিংয়ের খণ্ডাংশ আবার আমরা দেখি নির্মাতা ব্যবহার করছেন মগধের অধিপতি বিম্বিসার ও মৌর্য সম্রাট অশোকের আমলে যখন রক্তপাতের ঘটনা ঘটছে তখন। বিষয়টি কি বলি, আপনি আধুনিক যুগের কোনো কাজকে খ্রিস্টপূর্বের ঘটনার সাথে তুলনা করতে পারেন না।

এটা আদৌ তুলনীয় নয়। উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বলি, ধরুন আপনি ইতিহাস বলছেন সিরাউদ্দৌলার, সেই ১৭৫৭ সালের ঘটনা বর্ণনা করছেন। তার ব্যাকগ্রাউন্ডে কি আপনি ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটে আঁকা কোনো চিত্রকর্ম ব্যবহার করবেন? বরং ব্যাপারটা উল্টো হলে মানানসই হয়। অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা বর্ণনা করছেন, সেখানে আপনি হয় তো দেখালেন একটি ছবিতে আঁকা রয়েছে সিরাউদ্দৌলার ছবি। অর্থাৎ যে পরাধীনতা বাঙালি বরণ করেছিল তার অবসান হতে চলেছে একাত্তরে। এটাই হলো পুনঃনির্মাণ।

একাত্তরকে আপনি দেখানোর চেষ্টা করছেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের করুণ কাহিনিকে সম্পৃক্ত করে।

কালক্রম বলে যেমন একটা বিষয় আছে, তেমনি সাযুজ্য বলেও একটা ব্যাপার আছে। আপনি উল্টোরথে হেঁটে যা নয় তার সাথে যা-তা তুলনা করে দিতে পারেন না। এটি দিয়ে প্রমাণ হয় নির্মাতার সংগ্রহে অনেক হীরা ও মনিমাণিক্য আছে, দামি পোশাক আছে, কিন্তু কোনটির সাথে কোনটি মিলিয়ে পরতে হয় সেই নান্দনিক, যুক্তিসিদ্ধ মন ও পরিমিতি বোধটা নেই।

ধরুন আপনি একজন সম্রাজ্ঞীর কাহিনি বলছেন। তার কস্টিউমে দেখা গেল দামি শাড়ি, দামি অলঙ্কার। মাথায় আবার একটি বেজবল ক্যাপ। এখন এই বেজবল ক্যাপ তো রাজাবাদশাহদের আমলে আবিষ্কৃতই হয়নি। কিন্তু এই বেজবল ক্যাপও মানিয়ে যাবে যদি আপনি হিস্টোরিকাল সাইফাই মুভি বানান। মানে রাণী টাইম মেশিনে চড়ে ভবিষ্যৎ থেকে টুপিখানা সংগ্রহ করে এনেছে। গল্পটা যদি এমন হয় তাহলে কস্টিউম যথাযথ।

মূল কথা ওই একটাই, গল্পের গরু গাছেও চড়তে পারে, কিন্তু সেটা বিশ্বাসযোগ্য ও যুক্তিসিদ্ধ করে নিতে হবে। জেমস বন্ডের ছবিতে সেটাই হয়। আমরা সবাই জানি, ওরকম হিরোগিরি করা অসম্ভব, তারপরও আমরা বিশ্বাস করি। এর কারণ সিনেমাটি দর্শকের কাছ থেকে সম্মতি আদায় করে নিয়ে এগুতে থাকে। তো শিল্পে এসব সূক্ষ্ম বিষয় খেয়াল রাখতে হয়, তবেই সেটি কালোত্তীর্ণ শিল্প হয়ে ওঠে।

আমি নির্মাতার চলচ্চিত্রে থাকা কন্টিনিউটি ব্রেক নিয়ে কথা বলছি না, সের্গেই প্যারাজেনোভের সিনেমার অনুকৃত বালুকা বেলায় বসে থাকা বনলতা সেনের দৃশ্যটিতে শটের কন্টিনিউটি ব্রেক হয়েছে বহুবার, সেসব না হয় আমলে নিলাম না, কিন্তু লাস্ট সাপার বা গুয়ের্নিকার মতো বিখ্যাত শিল্পকর্মকে চাইলেই যে কোনো জায়গায় পাঞ্চ করা যায় না। প্রথম কথা এখানটায় কালজ্ঞান থাকতে হবে, যুক্তিসিদ্ধ হতে হবে।

লুই বুনুয়েলকে দেখুন ‘ভিরিদিয়ানা’ ছবিতে সমকালের বিষয়ের ভেতর দুই হাজার বছর আগের ঘটনার ছায়াকে হাজির করে দিয়েছেন বেশ সুচারুভাবে। অথচ আমরা দেখলাম নির্মাতা উজ্জ্বল করলেন কি, ভিঞ্চির ‘লাস্ট সাপার’ রিক্রিয়েট করে, সেটার ভেতর জীবনানন্দকে শুইয়ে দিলেন।

তো দুই হাজার বছর আগে গিয়ে জীবনানন্দকে যে ওভাবে শোয়ানো যায় না, এটা বোঝার জন্য আপনার কালাক্রমিক জ্ঞান ও শৈল্পিক বিচার থাকতে হবে। তাও মানা যেত যদি এই লাস্ট সাপারকে আনার জন্য কোনো প্রেক্ষাপট আগে রচনা করতেন নির্মাতা।   

চলচ্চিত্রের দৃশ্য
নির্মাতার লেখা থেকেই বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করা যেতে পারে। উনি আমার লেখার জবাবে একজায়গায় লিখছেন, “বাংলা ভাষার যে কোনো কবিকে তাঁর অবস্থান নির্ধারণ করতে হয়েছে সেই নক্ষত্রমণ্ডলের সাপেক্ষেই। আমার কাছে রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করা এবং রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। নিৎসে যেমন সক্রেটিসকে প্রশ্ন করেছেন বলে গ্রিক দর্শনকে অস্বীকার করেননি, কিংবা হাইডেগার যেমন প্লেটোকে পুনর্বিবেচনা করেছেন বলে পাশ্চাত্য দর্শনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি, তেমনি রবীন্দ্রনাথকে একটি নতুন প্রতীকের ভেতর স্থাপন করা মানেই তাঁকে খাটো করা নয়।

আমি একবারও বলিনি রবীন্দ্রনাথকে নতুন প্রতীকে স্থাপন করা যাবে না, বা তাকে প্রশ্ন করা যাবে না। সবই করা যাবে, যুক্তিসিদ্ধ উপায়ে। অযথা চমক সৃষ্টির জন্য প্রতিষ্ঠিত কাউকে টেনে এনে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিলে তাকে খর্ব করা হয় বৈকি। নিৎসে নির্দ্বিধায় প্রশ্ন করতে পারেন সক্রেটিসকে, হাইডেগার প্রশ্ন করতে পারেন প্লেটোকে, সেটি পাশ্চাত্য দর্শনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। আমিও এতে একমত।

তবে মনে রাখা জরুরি, এখানে সক্রেটিস ও প্লেটো দুজনেই পূর্বসূরী আর তাদের উত্তর প্রজন্ম হলো নিৎসে ও হাইডেগার। কিন্তু ভাবুন তো ব্যাপারটা যদি উল্টো হয়? সক্রেটিস আর প্লেটো দার্শনিক প্রশ্ন করছেন নিৎসে আর হাইডেগারকে? এটা কি সম্ভব? নিৎসে আর হাইডেগারের তো ওই গ্রিক দার্শনিকদের আমলে জন্মই হয়নি। তবে সেটাও সম্ভব, যদি নির্মাতা যুক্তিসিদ্ধ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে সেটিকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। দেখা গেলো সক্রেটিস বা প্লেটোর পুনর্জন্ম হয়েছে আধুনিক সময়ে, তখন তাদের পক্ষে নিৎসে ও হাইডেগারকে প্রশ্ন করাটা জায়েজ হয়।

নির্মাতার কথা মেনে চলুন ধরে নিই নিৎসে প্রশ্ন করছেন সক্রেটিসকে, করতেই পারেন, কিন্তু তার তো একটা প্রেক্ষাপট থাকতে হবে। হুট করে প্রশ্ন করলে তো হবে না। ধরুন নিহিলিজম নিয়ে কথা বলতে বলতে নিৎসে আলাপ করছেন সক্রেটিসের যুক্তিবাদিতা কেমন করে ইউরোপীয় চিন্তা কাঠামোর ভেতর নিহিলিজমকে প্রভাবিত করেছে সেটি নিয়ে, এই প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন করলেন সক্রেটিস নিজে নিহিলিস্ট না, কিন্তু নিহিলিজমের পক্ষে পরোক্ষ ওকালতিই করেছেন বলা যায়, তাহলে তাকে কেন নিহিলিস্ট বলা যাবে না?

তো নিৎসের এই প্রশ্নে পৌঁছানোর আগে কিন্তু আগের আলাপগুলো সেরে আসতে হবে। আমি এই কথাটিই বারবার বলার চেষ্টা করছি, আপনি হুট করে কিছু পয়দা করলেই সেটি শিল্প হয়না। পাগলামির ভেতরেও রিজনিং থাকে। কার্যকারণ সম্পর্ক থাকে।  

যা বলছিলাম, গুয়ের্নিকা চিত্রকর্মটির বেলায় কালিক ও স্থানিক সংক্রান্ত গণ্ডগোল বাঁধিয়েছেন নির্মাতা। বিম্বিসার ও অশোকের আমলের সঙ্কট ও সংঘাতের ব্যাকড্রপে তিনি বসিয়ে দিয়েছেন গুয়ের্নিকাকে। একে তো খ্রিস্টপূর্বাব্দের ঘটনা, তার উপর একটি ভারতবর্ষের ঘটনা, অন্যটি ইউরোপীয় প্রেক্ষাপট। আপনি সারারাত রামায়ণ পড়ে সকালে উঠে যদি হঠাৎ জিজ্ঞেস করেন ওডিসি কার বাপ? তাহলে কি কিছু হলো?

আপনি বর্ণনা করছিলেন জীবনান্দের বনলতা সেন কাব্যে কেন বিম্বিসার বা অশোকের প্রসঙ্গ এসেছে। সেটি ব্যাখ্যা করতে নির্মাতা চলে গেছেন খ্রিস্টপূর্বাব্দে। কিন্তু সেখানে গিয়ে পিকাসোর গুয়ের্নিকাকে দেখালেন কোন যুক্তিতে? গুয়ের্নিকা শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলছে বলে? একই গণ্ডগোল হয়েছে যীশুর ‘শেষভোজে’র দৃশ্যটিতেও। দশ সেরের মধ্যে পাঁচ সেরে ধরে, কিন্তু পাঁচ সেরের মধ্যে কি দশ সেরের জিনিস ধরবে?

পরিচালক সাফাই গেয়ে বলছেন লাস্ট সাপার আসলে জীবনানন্দের স্বপ্ন মাত্র। তিনি বলছেন, “অথচ দৃশ্যটি ইতিহাস নয়; এটি একটি স্বপ্ন, একটি মৃত্যুপথযাত্রীর অন্তর্দৃষ্টি, একটি মেটাফিজিক্যাল আদালত। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘দ্য লাস্ট সাপার’-এর সঙ্গে এর সম্পর্ক আক্ষরিক নয়, প্রতীকী।” মেটাফিজিকাল বা অধিবিদ্যাগত আদালতের বিষয়টি আপনি স্বপ্ন বলে চালিয়ে দেওয়াতে আমি কোনো আপত্তি দেখি না। ফ্রয়েডের ‘ইন্টারপ্রিটেশন অব ড্রিমস’ যার পড়া আছে তিনি জানেন স্বপ্ন কী বস্তু। মানসিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে অচেতনে জমা হওয়া ঘটনা বা ব্যক্তি স্বপ্নের ভেতর সরাসরি, প্রতিস্থাপিত অথবা ঘনীভূত হয়ে প্রকাশ হতে পারে। তো বিষয়টি ব্যক্তির ফেনোমেনোলজির ভেতর থাকা চাই।

এখন ধরে নিই জীবনানন্দ ভিঞ্চিকে নিয়ে ভেবেছেন, যীশুকে নিয়ে ভেবেছেন, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তো নিঃসন্দেহে ভেবেছেন। এই ভাবনাগুলো দর্শককে জানানো হয়েছে কি? প্রশ্নটা হলো গোটা ছবিটা কী নিয়ে? আর সেই দৃশ্যাবলীতে কি আপনি কোনো ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিলেন দর্শকের জন্য ভিঞ্চি বা যীশুকে নিয়ে? যীশু কিভাবে জীবনানন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত? আর জীবনানন্দের স্বপ্ন দেখার নামে যা দেখাচ্ছেন সেই স্বপ্নের কথা কি জীবনানন্দ কোথাও বলে গেছেন? আমি পাইনি।

যদি কোথাও বলে না যান, তাহলে জীবনানন্দের স্বপ্ন বলে যা দেখাচ্ছেন সেটা তো নির্মাতার সচেতন নির্মাণ। সচেতন নির্মাণের ভেতর দিয়ে আপনি আপনার কথাই বলতে চাইছেন। সেক্ষেত্রে এমন যুক্তিহীনভাবে দুই বাস্তবতাকে এক পাটাতনে আমদানি করলেন কিভাবে? মেটাফিজিক্স বলেন, আর ফিজিক্স, কোনো কিছু দিয়েই তো অংক মেলে না। মেটাফিজিক্স বা অধিবিদ্যা হলো অস্তিত্ব, বাস্তবতা, সময়, আত্মা, ঈশ্বর, কার্যকারণ ইত্যাদি বিষয়ে দার্শনিক অনুসন্ধান। এই অনুসন্ধানে লজিক বা যুক্তি অত্যন্ত জোড়ালো ভূমিকা রাখে। পরিচালক উজ্জ্বলের মেটাফিজিকাল আদালত আমদানির পেছনে কোনো যুক্তি আছে কি? উনি দেখাচ্ছেন জীবনানন্দের দেহটাই যেন খুটিয়ে খুটিয়ে খাচ্ছে সবাই।

তাহলে এই দৃশ্যের পাঠ কী দাঁড়ায়, সেটি কি নির্মাতা ভেবে দেখবেন না? পাঠ তো দাঁড়ায় যীশুরূপী রবীন্দ্রনাথ ভোজসভায় তথাকথিক জীবনানন্দের শত্রুদের নিয়ে জীবনান্দের শরীরকেই উদরস্থ করছেন! সমালোচনার মানেই কি কেটেকুটে খেয়ে ফেলা? তো বরাবরের মতোই বলছি, এমন দৃশ্যের আমদানি ‘পান্তাভাতে ঘি’ বৈ কিছু নয়। নির্মাতা যতই বলুক না কেন “এই দৃশ্যে রবীন্দ্রনাথকে খলনায়ক করা হয়নি, দায়ীও করা হয়নি”, ছবির দৃশ্য ও সংলাপ কিন্তু বলছে উল্টো কথা।

যুবকটি এক আইনজীবীকে বলছেন, জীবনানন্দের মৃত্যুর পেছনে কারা দায়ী তিনি জানেন, রীতিমতো ধমকে সে নাম লেখাতে থাকে। এরপরই আমরা দেখি শেষভোজে বসে আছেন রবীন্দ্রনাথ। তো উনি নিজেই তো ছবিতে রবীন্দ্রনাথকে খলনায়ক বানাচ্ছেন, আর পরে অনলাইনে লিখে বলছেন রবীন্দ্রনাথকে খলনায়ক করিনি, দায়ী করিনি! এটা তো স্ববিরোধী কথা হয়ে গেলো!   

ভোজসভায় রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও যারা আছেন তাদের সম্পর্কে নির্মাতা বলছেন, “সজনীকান্ত দাস, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, ভূমেন্দ্র গুহ-এঁরা সেখানে কেবল ব্যক্তি নন; তাঁরা সমালোচনা, স্বীকৃতি, স্মৃতি এবং সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের বিভিন্ন শক্তির প্রতীক। আর টেবিলের উপর শায়িত জীবনানন্দ দাশ সেই একমাত্র মানুষ, যার শরীরে, মগজে, স্মৃতিতে অন্তহীন ক্ষত রয়েছে।” খুব ভালো আপনি তাদের প্রতীক হিসেবে হাজির করেছেন কিন্তু আপনি মিজোঁসিনে দেখাচ্ছেন কী? যীশুর পাশে কিন্তু সাধু পিতর ছিলেন, আবার বিশ্বাসঘাতক জুডাসও ছিলেন।

ভিঞ্চির আঁকা মূল চিত্রকর্ম
ভিঞ্চির মূল চিত্রকর্মের যে প্রতীক সেখানে শোকের পাশাপাশি বিশ্বাসঘাতকতাও আছে। দেখুন পুনঃনির্মাণ কী জিনিস, সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ছবি ‘দি ডেভিল ওয়ের্স প্রাডা-২’ যারা দেখেছেন, তারা দেখবেন ফ্যাশন ম্যাগাজিনের সব কর্তাব্যক্তি যখন ইতালিতে যায় এক শোতে, সেখানে ডিনারের আয়োজন করা হয়। ডিনার চলাকালে বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা ঘটে। ওই ভোজসভার পেছনে বেশ কৌশলে কিন্তু যীশুর ‘লাস্ট সাপার’ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সূক্ষ্মভাবে দর্শকের মনে আগে থেকেই তথ্যটি দিয়ে দেওয়া। পরে দেখা যায় সত্যিই ম্যাগাজিনের মালিকানা নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা ঘটেছে। হলিউডের ছবিটিতে পেইন্টিংটি কিন্তু বেশ টোনডাউন করে রাখা হয়েছিল, তারপরও একটা সাযুজ্য ছিলো, বিশ্বাসঘাতকতার সাযুজ্য। কিন্তু ‘বনলতা সেন’ ছবিতে যুবকটির ঘরে রাখা ‘গুয়ের্নিকা’ অথবা ‘আর্কেঞ্জেল মাইকেল’ ছবির কোনো দূরতম সাযুজ্যও দর্শক বের করতে পারবেন না। পারলেও সেটি টেনেটুনে কোনোরকমে মেলানোর প্রচেষ্টা হবে।

নির্মাতা বারবার যে প্রতীকের কথা বলছেন, সেই প্রতীক পাঠ কি নির্মাতার মর্জি মতো হবে? যীশুকে দেখে কেউ যীশু ভাববে না? যীশুর জায়গায় রবীন্দ্রনাথকে দেখে কেউ রবীন্দ্রনাথের প্রভুত্ব নিয়ে ভাববে না? খাবারের টেবিলে জীবনানন্দ দাশকে দেখে রবীন্দ্রনাথ প্রমুখদের লোকে জীবনানন্দ-খেকো ভাববে না? শুধু নির্মাতা যে প্রতীকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন সেটাই পাঠ করবে? তাহলে তো জনে জনে গিয়ে সেই ব্যাখ্যা বুঝিয়ে দিয়ে আসতে হবে নির্মাতাকে। এটা কি সম্ভব? শুরুতেই যেটা বলছিলাম শিল্পী নিজের প্রকাশকে মিলিয়ে দেন সর্বজনীনতার সাথে। তো নির্মাতা উজ্জ্বল সেটি কি করতে পেরেছেন? পারেননি। এর কারণ ছবির দৃশ্য রচনায় রিজনিংয়ে গণ্ডগোল হয়েছে।

‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্রে আরো একটি চিত্রকর্ম ব্যবহার হয়েছে, সেটি নিয়ে অল্প আলাপ করে এই লেখা শেষ করবো। ইতালির নিওক্লাসিকাল পেইন্টার ভিনচেনজো কামুচ্চিনির আঁকা ‘দ্য ডেথ অব জুলিয়াস সিজার’ (১৮০৬) শীর্ষক চিত্রনকর্মটিও এসেছে এই ছবিতে। বেশ আড়ম্বর করেই এসেছে। এখানেও যথারীতি প্রতিস্থাপনের ঘটনা ঘটেছে।

ছবিটি হুবহু পুনঃনির্মাণ করে পেছনে রাখা হয়েছে জীবনানন্দের লাশ পোড়ানোর বেদী। সামনে দেখা যাচ্ছে সম্রাট সিজারের জায়গায় সেই যুবক ওরফে মহীনকে, আর তাকে মারতে উদ্যত হচ্ছেন “দোষী” সাহিত্যিক ও কবিরা। মূল চিত্রকর্মে দেখানো হয় ব্রুটাস ও তার সহযোগীরা কিভাবে সিজারকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে। এরও একটি প্রেক্ষাপট আছে, সেটি হলো কামুচ্চিনি ছবিটি এমন সময়ে এঁকেছেন, যখন ফরাসি বিপ্লব কেবল শেষ হলো এবং নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ক্ষমতা উত্থানের পর পতনের দিকে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে তিনি সিজারের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে এরকম একটি ছবি আঁকলেন। আর সিজারের চোখেমুখে দিলেন আতঙ্ক ও অবিশ্বাস।


এর ভেতর দিয়ে কামুচ্চিনি আভাস দিলেন রাজনৈতিক শূন্যতার। পেইন্টিংয়ে সিজারকে দেখানো হচ্ছে অসহায় ও ষড়যন্ত্রের শিকার হিসেবে। নেপোলিয়নকে তিনি আদতে মেলাতে চেয়েছেন সিজারের সাথে। এটাই হলো পুনঃব্যাখ্যা।

কামুচ্চিনির ছবিটি পুনঃনির্মাণ করে নির্মাতা চলচ্চিত্রের চরিত্রদের এমনভাবে বসিয়ে দিলেন, তাতে কোনো তুল্যমূল্য তৈরি হলো না। সম্পর্কটাও স্থাপিত হলো না। সেই সভায় লাবণ্যকেও রেখেছেন নির্মাতা। লাবণ্য হিসাব মেলাচ্ছেন স্বামীর মৃত্যু হয়েছে, সাহিত্যের অনেক উপকার হলো, কিন্তু তার জন্য কী রেখে গেলেন! তো জীবনানন্দের চিতার দৃশ্যের সাথে কোন বিচারে সিজারের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র আঁকা এই ছবির সাযুজ্য তৈরি হয়?

কোথায় জীবনানন্দ ও তার সৃষ্টি মহীন, আর কোথায় সিজার ও ব্রুটাসের দল। অন্ধকারে সকল গাভিকেই কালো বলে মনে হয়। তারমানে কি এই সকল গাভিই কালো রঙের? মানে চিত্রকর্মে সিজারের মৃত্যু আছে বলেই কি জীবনানন্দের মৃত্যুর সাথে তাকে মিলিয়ে ফেলতে হবে? সিজারের মৃত্যু, তার প্রেক্ষাপট, ইতিহাস আর রাজনীতি থেকে জীবনানন্দের বাস্তবতা যোজন যোজন দূরে! এমনকি কামুচ্চিনি যে সময়ে ছবিটি আঁকছেন, সেই সময়ের সাথেও তো জীবনানন্দের সময়ের কোনো সাদৃশ্য বা যোগ নেই।

ধরুন বাংলাদেশে বসে কোনো শিল্পী যদি পঁচাত্তর সালের ১৫ আগস্টের পর নবাব সিরাজউদ্দৌলার কতলের ছবি আঁকেন, সেটির একটি মাজেজা তৈরি হবে। একটি কোনোটেশন বা অর্থবিকেন্দ্রিক জ্ঞান বা প্রতীক তৈরি হবে। কিন্তু আলোচ্য ছবিতে জীবনানন্দের মতো অভিমানী কবির আত্মহত্যার সাথে কি সিজারের ষড়যন্ত্রমূলক হত্যাকাণ্ড বা কামুচ্চিনি যে বাস্তবতাকে মাথায় নিয়ে এঁকেছেন সেগুলোর কোনো কিছুর সাথে মেলানো যায়?

সব মৃত্যু যেমন সমান নয়, সকল মৃত্যুর পেছনের প্রেক্ষাপটও এক নয়। তাই ভিন্ন বিসদৃশ দুটি জিনিসকে জোর করে মিলিয়ে দেওয়ার অর্থ হলো—শিল্পের পাঠকে যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে না পারা। একে বলা যেতে পারে উধোরপিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো। এটি কোনভাবেই পুনঃপাঠ বা উল্টোপাঠ নয়। এটি হলো উল্টোপাল্টা পাঠ। এধরনের কাজ সুকুমার রায়ের ননসেন্স রাইমে ঠিক আছে, যেমন—হাসজারু, কিন্তু জীবনানন্দকে নিয়ে সিরিয়াস কাজে একেবারেই ঠিক নেই।

বিশেষ করে আপনি যখন চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যে অর্থনীতিবিদ আকবর আলী খান রচিত “অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো: নতুন আলোকে বনলতা সেন” নামের সিরিয়াস প্রবন্ধের প্রস্তাবনাগুলোই হুবহু অনুসরণ করছেন। মাঝে মাঝে শাহাদুজ্জামান রচিত “একজন কমলালেবু” নামের ডকুফিকশন বই থেকে সংলাপ নিয়ে বসিয়ে দিচ্ছেন, তখন ননসেন্স রাইমের মতো ননসেন্স সিনেমা সৃষ্টির কোনো কারণ দেখি না। পরিচালক নিজেও বলেননি তিনি হালকা ছবি বানাচ্ছেন। তিনি এটিকে সিরিয়াস সিনেমা হিসেবেই বানিয়েছেন।

এখন সাহিত্য বিচারে রবীন্দ্রনাথ বা সজনীকান্ত জীবনানন্দের কবিতাকে দুর্বল মনে করেছেন, তার মানে এই না তাদেরকে ব্রুটাস বা মানুষখেকোর সাথে তুলনীয় করে ফেলতে হবে। অথবা জীবনানন্দের মৃত্যুর জন্য তাদের দায়ী করতে হবে। এটাও বলে রাখি, পরবর্তীকালে কবিতা ভালো লাগায় রবীন্দ্রনাথ কিন্তু জীবনানন্দকে সরাসরি প্রশংসাও করেছেন, নির্মাতা উজ্জ্বলের ছবিতে সেটি আবার অনুপস্থিত। যেন তিনি রবীন্দ্রনাথকে ফ্রেমিং করতেই ‘লাস্ট সাপার’ দৃশ্যটি রচনা করেছেন।

যাহোক, যীশুর লাস্ট সাপারের প্রতিষ্ঠিত প্রতীক বা অর্থ হলো এখানে যীশু বেদনার্ত, শেষ বিদায়ে বলছেন এই রুটি খাও, এটাই আমার দেহ, অর্থাৎ রূপক অর্থে আমার আদর্শকে গ্রহণ করো, দৈহিকভাবে আমি আর থাকব না। অন্যদিকে কামুচ্চিনির আঁকা সিজার কেন্দ্রিক ছবিটি বলতে চাইছে কাছের লোকজনের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন সিজার, এতে করে এই লোকগুলো শুধু সিজারকে হারাবে না, নেতৃত্বের শূন্যতাও তৈরি হবে। তিনি নেপোলিয়নের শাসনামলের মাঝামাঝি সময়ে এই ছবি আঁকছেন। এসব কথা সকলেই জানেন।

বড়পর্দায় সিনেমার দৃশ্য
অবাক করার মতো বিষয় নির্মাতা সেসব জেনেও কেমন করে গণ্ডগোলটা বাঁধালেন। এখন আপনি যদি লাল গোলাপ দেখিয়ে বলেন, ফুলটা একটা প্রতীক, যার অর্থ আমি করেছি ‘বিষাদ’, তাহলে তো হলো না। কারণ লাল গোলাপের যে প্রতীক, তার পাঠ হিসেবে লোকে ভালোবাসা, কামনা, এমনকি নারীর ঋতুমতি হওয়া পর্যন্ত বুঝতে পারে। দৃশ্যমাধ্যমের তো কিছু ব্যাকরণ রয়েছে। এই ব্যাকরণ সকল শিল্পকে জারিত করেই তৈরি হয়েছে। চলচ্চিত্রে নির্মাতাকে তাই দৃশ্যমাধ্যমের ব্যাকরণ জানতে হয় এবং শিল্পপাঠের শর্তগুলো পূরণ করতে হয়, তাহলে তার সৃষ্টি যুক্তিসিদ্ধ হয়।

নির্মাতা উজ্জ্বল একটা জায়গায় বলেছেন, ছবিটি নিয়ে তাকে আলাপ করতে দিলে তিনি ছবির “কাঠামো” নিয়ে আলাপ করতেন। এখন তিনি কী নিয়ে আলাপ করবেন সেটা তার ব্যাপার। তবে এটা বলে রাখি কেউ যদি কবিতার মতো কাঠামো রেখে চিঠি লেখে, সেটি কবিতা হয়ে যায় না। আঙ্গিকও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চলচ্চিত্রের মতো কিছু বানালে, সেটিও চলচ্চিত্র হয় না।

চলচ্চিত্রে ফর্ম ও স্ট্রাকচারের পাশাপাশি সিনট্যাক্স, কনটেক্সট ও রিজনিং ঠিকঠাকভাবে প্রয়োগ করতে না পারলে, যে অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা ঘটে, সেটিই ঘটেছে ‘বনলতা সেন’ ছবিটির ক্ষেত্রে। বলা বাহুল্য নয়—হরিণ, চিল, ইঁদুর ইত্যাদি দুর্বল গ্রাফিক্স ছবিটিকে আরো শ্রীহীন করে দিয়েছে।

অথচ আরেকটু যত্ন নিলে কি অসাধারণ চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে পারতো ‘বনলতা সেন’! তারপরও, আগেরবারের মতো এবারও বলতে চাই, জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে, বনলতা সেনের মতো কবিতাকে কেন্দ্র করে এমন চলচ্চিত্র নির্মাণে যে দুঃসাহস দেখিয়েছেন নির্মাতা তার জন্য তিনি সত্যি ধন্যবাদার্হ।  

লেখক: চলচ্চিত্র সমালোচক