দেশের সংস্কৃতি খাত, ক্রিয়েটিভ ইকোনমি বা সৃজনশীল অর্থনীতি এবং প্রাথমিক স্তরে সংস্কৃতিচর্চাকে যুক্ত করার বিষয়ে সরকারের সাম্প্রতিক কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ও বাজেট পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ও সংগীতাঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হামিন আহমেদ। জুলাই আন্দোলন পরবর্তী বাংলাদেশে নতুন সরকারের কাছে অবাধ সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ সৃষ্টিই সকলের অন্যতম চাহিদা। সরকার গঠিত হওয়ার পর প্রথম বাজেটে সংস্কৃতিখাতে সরকারের পরিকল্পনা ও বাজেট দেখে অনেকেই আশান্বিত হচ্ছেন।
সোমবার, বাজেট পরবর্তী সংগীত অঙ্গন ও সংস্কৃতি সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে সরকারের এই দূরদর্শী চিন্তাভাবনাকে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে বাংলা ট্রিবিউন-এর কাছে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন হামিন আহমেদ।
নিজের প্রতিক্রিয়ায় হামিন আহমেদ সরকারের এই নতুন পদক্ষেপগুলোর বিভিন্ন দিক নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন ও মতামত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “সরকার প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে গান, নাচ এবং চারুকলাকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিকে আমরা আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাই। মিউজিক ফ্রেটারনিটি বা সংগীত অঙ্গনের সবাই সরকারের এই সিদ্ধান্তে অত্যন্ত আনন্দিত। প্রাথমিক স্তর থেকেই শিশুদের সৃজনশীল বিকাশ ও সংস্কৃতিমনস্ক করে গড়ে তোলার এই প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনেক আলোচনা ও কথাবার্তা হয়েছিল।
অবশেষে এই অন্তর্ভুক্তি বা 'ইনক্লুশন' সফল হওয়ায় সংস্কৃতি অঙ্গনে স্বস্তি ফিরেছে। বিগত বছরগুলোতে যারা সরকারের দায়িত্বে ছিলেন, তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ মানুষের মনে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তা দূর হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।”
সংস্কৃতি খাতের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে এবারই প্রথম সংগীতে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রের ওপর আরোপিত কর বা ডিউটি কিছুটা শিথিল করা হয়েছে, যা আগের চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ কমানো হয়েছে। এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে হামিন আহমেদ বলেন, “বাদ্যযন্ত্রের ওপর করের এই শিথিলতা হয়তো পুরোপুরি পর্যাপ্ত নয়, আরও কিছুটা কমলে বা বড় পরিসরে সুবিধা দিলে ভালো হতো। কিন্তু অন্তত সরকারের চিন্তাভাবনা যে শুরু হয়েছে—এটাই সবচেয়ে প্রশংসনীয় দিক। আমরা আশাবাদী যে, ভবিষ্যতে সরকারের সাথে এ বিষয়ে আরও বিশদ আলোচনার মাধ্যমে এটিকে আরও প্র্যাকটিক্যাল এবং সংস্কৃতি খাতের জন্য আরও বেশি উপযোগী স্তরে নিয়ে আসা সম্ভব হবে।”
ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ৮২৬ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৭৩ কোটি টাকা বেশি। একই সাথে এবারের বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো 'ক্রিয়েটিভ ইকোনমি ফান্ড' বা সৃজনশীল অর্থনীতি তহবিল গঠন। সরকার এই সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য অতিরিক্ত ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যার সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর (CSR) তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা যুক্ত করে মোট ৮০০ কোটি টাকার একটি বড় তহবিল গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এই তহবিলের আওতায় চলচ্চিত্র, সংগীত, ওটিটি, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণ, পাবলিশিং, অ্যানিমেশন, গেমিং ও পারফর্মিং আর্টস সহ সংস্কৃতি, ব্যবসা ও প্রযুক্তির সংযোগস্থলকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে স্বীকৃত।
এছাড়া ২০২৫-২৬ বাজেটের ধারাবাহিকতায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর এবং জুলাই আন্দোলনভিত্তিক অডিও-ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট নির্মাণের মতো নতুন অগ্রাধিকারগুলোও এই খাতের পরিকল্পনায় বিশেষ স্থান পেয়েছে।
চলতি বছরের বাজেট এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নিয়ে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে কথা বলেন এই গুণী শিল্পী।
তিনি উল্লেখ করেন যে, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার চাপ সবারই জানা। তাঁর মতে, দুর্ভাগ্যবশত বিগত দীর্ঘ ১৭ বছরের অব্যবস্থাপনা এবং অনিয়ম, এবং পরবর্তী ১৮ মাসের নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের যে নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির ওপর পড়েছে, তার বড় একটা চ্যালেঞ্জ বর্তমান সরকারের কাঁধে এসে পড়েছে। একই সাথে বর্তমান বিশ্বে চলমান যুদ্ধবিগ্রহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিতিশীল পরিস্থিতিও দেশের বাজেটের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে।
তিনি মনে করেন, এই সমস্ত সীমাবদ্ধতা বা ‘কনস্ট্রেইন্ট’-এর কারণেই হয়তো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাজেট ও সামগ্রিক পরিকল্পনা যতটা হওয়ার সুযোগ ছিল, ততটা করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকার যেভাবে ‘ক্রিয়েটিভ আর্ট’ বা সৃজনশীল অর্থনীতি নিয়ে নতুন তহবিল গঠন ও নতুন অগ্রাধিকারের মাধ্যমে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে, তার সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে এবং যে সমস্ত উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে তাতে এই চ্যালেঞ্জগুলো হয়তো মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, সংস্কৃতি ও সংগীত অঙ্গনের প্রতিনিধিরা সরকারের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছেন। হামিন আহমেদ তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলোর মধ্যে সংস্কৃতি কর্মীরা একটি আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন এবং মোটামুটি মিউজিক ফ্রেটারনিটির যার সাথেই তাঁর কথা হয়েছে, সবাই বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন ও প্রশংসা করেছেন। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এবং ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিলে ভবিষ্যতে দেশের সংস্কৃতি খাত আরও সমৃদ্ধ ও কার্যকর জায়গায় পৌঁছাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।