সন্তানরা আমাদের মনে রাখুক, ভালোবাসুক

পর্দায় কখনো স্নেহময়, কখনো কঠোর, আবার কখনো আবেগে জড়ানো আদর্শ বাবার চরিত্রে নিয়মিতই দেখা মেলে তাঁর। তিনি দর্শকপ্রিয় প্রবীণ অভিনেতা মাসুম বাশার। আজ বিশ্ব বাবা দিবস। বিশেষ এই দিনে জীবনের গল্প, অভিনয়জীবনের অভিজ্ঞতা, পারিবারিক যৌথযাত্রা এবং বাবার স্মৃতি নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। সন্তানের টানে অবস্থান করছেন সুদূর কানাডায়। সেখান থেকেই বাবা দিবস ও সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের সাথে নিজের অনুভূতি ও ভাবনার কথা অকপটে ভাগ করে নিয়েছেন এই গুণী শিল্পী।

বাবা দিবসে আপনাকে শুভেচ্ছা। একজন বাবা হিসেবে এই দিনটি আপনার কাছে কতটা বিশেষ?

আপনাকেও শুভেচ্ছা। আসলে এই ধরনের দিবসগুলো আমার কাছে তেমন বিশেষ অর্থ বহন করে না। বাবা, মা, কন্যা, স্ত্রী—এরা সারাজীবনের সম্পদ। এদের কথা সারাজীবনই মনে রাখতে হয়। বছরের প্রতিটা দিনই আমার কাছে বাবা দিবস, বছরের প্রতিটা দিনই আমার কাছে মা দিবস।

আপনার নিজের বাবার কোন স্মৃতিটা আজও সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে? বাবার কাছ থেকে পাওয়া কোন শিক্ষা আজও জীবনে বহন করছেন?

বাবার কাছ থেকে শিক্ষা যেটা পেয়েছি সেটা হচ্ছে যে—উনি সবসময় বলতেন, মিথ্যা কথা বলার চেষ্টাই করবে না। একদিন না একদিন সত্যের জয় হবেই। সেটাকেই এখনো বহন করছি। এই কথাগুলোই উনি বলতেন বেশি। এই স্মৃতিগুলোই মনে পড়ে।

মাসুম বাশার
একজন বাবা হিসেবে আপনার সন্তানদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন? বাবা হওয়ার অভিজ্ঞতা আপনাকে মানুষ ও শিল্পী হিসেবে কীভাবে বদলেছে?

আমার সাথে আমার কন্যাদের সম্পর্কটা একেবারে বন্ধুর মতো। আসলে যখনই বাবা হয়েছি তখনই দায়িত্ববোধ বেড়েছে। সেই দায়িত্ববোধের কিয়দংশও আমার মানুষ হিসেবে এবং শিল্পী হিসেবেও বদলানোর একটা কী বলব এটাকে—মানে যোগ করেছে আমার জীবনে।

সন্তানদের শৈশবে মাসুম বাশার
আপনার অভিনয়জীবনে অনেক বাবা বা অভিভাবক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সেই চরিত্রগুলোর মধ্যে কোনটি আপনার নিজের কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়? কোন চরিত্রটি করতে গিয়ে আপনি আবেগাপ্লুত হয়েছেন বা দীর্ঘদিন মনে দাগ কেটে আছে?

বেশ অনেক আগে সালাউদ্দিন লাভলুর একটা টেলিফিল্ম করেছিলাম। সেটাতে—‘বুকের ভেতর নুপুর বাজে’ নাটকটার নাম। তো সেখানে আমার ছেলে ছিল না, আমার মেয়ে ছিল জাকিয়া বারী মম। আর ছেলে ছিল নিলয় আলমগীর। নিলয় আমার আপন ছেলে না হওয়া সত্ত্বেও তাকে আমি নিজের ছেলের মতোই জানতাম। তো তার সঙ্গে আমার যে কেমিস্ট্রিটা এবং মমর সঙ্গে যে আমার কেমিস্ট্রিটা, এই চরিত্র দুটোর সঙ্গে আমার অভিনয় করতে গিয়ে আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে এবং ওই চরিত্রটা আমাকে অনেক আবেগাপ্লুতও করেছিল, দীর্ঘদিন মনে দাগ কেটে আছে।

বাংলা নাটক ও সিনেমায় বাবা চরিত্রের নির্মাণে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান নির্মাতারা বাবা চরিত্রকে যেভাবে তুলে ধরছেন, সেটিকে একজন অভিনেতা হিসেবে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

বাংলা নাটক-সিনেমায় যে পরিবর্তনের কথা বলছেন, সেটার পরিবর্তন তো হবেই। সময় এগিয়েছে, সময় বদলেছে, সময়ের সাথে সাথে সবকিছুই বদলে যায়। সেরকমভাবেও এখন আমি যেটা ফিল করছি, আমি যেটা অনুধাবন করতে পারছি সেটা হচ্ছে যে—বাবা-মায়ের চরিত্রগুলো আরো গভীরে ঢোকার চেষ্টা করছে। আগে যেমন একটা খোলসমাত্র ছিল, সেই খোলস ভেঙে বাবা-মায়ের চরিত্রের ভেতরে ঢোকার চেষ্টাটা হচ্ছে। এটা আমার কাছে ভালো লাগছে।


কন্যা অভিনেত্রী নাজিবা বাশারের সঙ্গে
আগের সময়ের বাবা চরিত্র আর বর্তমান সময়ের বাবা চরিত্রের উপস্থাপনায় কী ধরনের পরিবর্তন দেখছেন? আমাদের গল্পে বাবা চরিত্রকে কি আরও নতুনভাবে দেখার প্রয়োজন আছে?

হ্যাঁ, গল্পে বাবা চরিত্রকে আরও নতুনভাবে দেখার প্রয়োজন আছে তো। বিষয়টা হচ্ছে যে, বাবাকে কেন্দ্র করে সেরকম কোনো গল্প গড়ে ওঠে না। যদিওবা গড়ে ওঠে, সেটা ধরেন নায়ক-নায়িকা বেসড হয়ে যায় অ্যাট দ্য এন্ড অব দ্য ডে। তো সেরকমটি না করে একটা চরিত্রকে ধরে বাবা চরিত্র বা আমি বলব যে যারা সিনিয়র, যারা অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ হয়েছেন, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিল্পী যারা, তাদেরকে বেসড করে, তাদের গল্প তাদের চরিত্রের উপরে বেসড করে যদি কোনো কাজ হয়, কোনো গল্প হয়, সেটা মনে হয় আমার জন্য ভালো হবে।

একজন অভিনেতা হিসেবে বাবা চরিত্রে অভিনয় করার সময় কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন? বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা কতটা কাজে লাগে?

অভিনেতা হিসেবে বাবা চরিত্রে অভিনয় করার সময় আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগাই। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং আমার দেখা আরো বাবাদের চরিত্রগুলোকেই কাজে লাগাই। সেভাবেই, ওইভাবেই আমি কাজটা করার চেষ্টা করি।

তিন অভিনয়শিল্পী এক ফ্রেমে
আপনার স্ত্রী মিলি বাশার ও কন্যা নাজিবা বাশার—দুজনই গুণী অভিনয়শিল্পী। একই পরিবারের তিনজনের অভিনয়জীবনের এই যৌথযাত্রা কীভাবে সম্ভব হলো?

আপনি বোধহয় জানেন যে মিলি এবং আমি দুজনেই ঢাকা থিয়েটারে মঞ্চে নাটক করতাম। তো নাটক, অভিনয় তো সেখান থেকেই আমাদের দুজনেরই শুরু। আর নাজিবা তার নিজের ইচ্ছায় সে নাচ করত, সেখান থেকে তার নিজের ইচ্ছাতেই অভিনয় জগতে এসেছে। আমরা তাকে কখনো জোর করিনি। আমরা আমাদের কন্যাদের কোনো বিষয়েই জোর করি না।

যদি আজ আপনার বাবা বেঁচে থাকতেন, বাবা দিবসে তাকে কী বলতে চাইতেন? আর একজন বাবা হিসেবে আপনি চান, আপনার সন্তানরা আপনাকে কীভাবে মনে রাখুক?

শুধু একটা কথাই আমার বাবাকে বলতাম, যে কথাটা জীবনে কোনোদিন বলা হয়নি। মাকেও বলা হয়নি। যে—বাবা, আপনাকে অনেক ভালোবাসি। মাকেও বলতাম—মা, অনেক ভালোবাসি। আমার সন্তানরা কীভাবে আমাকে মনে রাখবে সেটা তো তাদের ব্যাপার। আমি তো সেটা কিছু বলতে পারব না, তবে আমরা দুজনেই চাই আমাদের সন্তানরা আমাদের মনে রাখুক, আমাদেরকে ভালোবাসুক।

দুই কন্যার সাথে মাসুম বাশার ও মিলি বাশার
আজকের প্রজন্মের বাবাদের উদ্দেশ্যে আপনার কোনো বার্তা আছে?

আজকের প্রজন্মের বাবাদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ, সেটা হচ্ছে যে—নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধরে রাখার যে আপ্রাণ চেষ্টা আমরা চালিয়ে যাচ্ছি, সেইটাকে যেন তারা ধারণ করতে চেষ্টা করেন। সন্তানদের মধ্যে সেই বিষয়টা যেন প্রোথিত করার চেষ্টা করেন। সেই জিনিসটা আমরা দেখতে পাই না এখন। একেবারেই না। আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে অনেক অনেক দূরে চলে গেছি এবং মামুন ভাই (মামনুর রশীদ, নাট্যজন) যে কথাটা বলেছেন—রুচির অবক্ষয়, সে তো বটেই।

রুচির অবক্ষয় তো আজকে নতুন না, অনেক দিন থেকেই রুচির অবক্ষয় ঘটছে এবং ঘটেই চলেছে। এই বিষয়টা আমাদের এখনকার বাবারা যদি একটু মাথায় নেন, সন্তানদের যদি সেইভাবে টেক কেয়ারটা করেন, তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেন অথবা তাদেরকে নিজস্ব সংস্কৃতির শিকড়টাকে যদি বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, আমার মনে হয় সেটা অনেক উপকার হবে জাতির জন্য।