এবার কোক স্টুডিওর নিরীক্ষার বলি রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’, সমালোচনা-নিন্দার ঝড়

নতুন গান প্রকাশের পর আবারও সমালোচনা ও নিন্দার মুখে পড়েছে কোক স্টুডিও বাংলা। তৃতীয় মৌসুমের সাম্প্রতিক গান ‘মেঘ’-এ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী কবিতা ‘সোনার তরী’-র অংশ সংযোজন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

কথাসাহিত্যিক, কবি, সাংবাদিক, সংগীতশিল্পীসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকেই এই পরিবেশনাকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির ‘মর্যাদাহানি’ ও ‘শৈল্পিক বিপর্যয়’ বলে মন্তব্য করেছেন।

শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই নয়, ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে প্রকাশিত গানটির নিচেও শ্রোতাদের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। প্রায় চার হাজার মন্তব্যের বড় অংশেই গানটি নিয়ে সমালোচনা, নিন্দা ও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।

‘মেঘ’ গানটিতে একসঙ্গে কাজ করেছেন সংগীতশিল্পী শায়ান চৌধুরী অর্ণব এবং শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও সুরকার মোহাম্মদ শোয়েব। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন মাশা ইসলাম, মোহাম্মদ শোয়েব ও মৌসুমি। শাস্ত্রীয় সংগীত, সমকালীন সাউন্ড এবং আধুনিক সংগীতায়োজনের সংমিশ্রণে গানটি নির্মিত হলেও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ‘সোনার তরী’ কবিতার ব্যবহার।

সমালোচকদের প্রধান অভিযোগ, কবিতাটির মূল ভাবার্থ যথাযথভাবে অনুধাবন না করেই বর্ষার আবহ তৈরির উপাদান হিসেবে এটি ব্যবহার করা হয়েছে। কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক নিজের ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “কবিতাটা ওঁরা বোঝেননি।” পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রশংসা করলেও তিনি এই পরিবেশনাকে ‘করুণ ব্যর্থতা’ আখ্যা দিয়ে ১০-এর মধ্যে মাইনাস ১০ নম্বর দিয়েছেন।

একইভাবে আহমেদ মুহাইমিন নামে এক নেটিজেন লিখেছেন, “রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কোনো বর্ষার কবিতা না। এটি একটি প্রতীকধর্মী কবিতা। এখানে মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবন এবং তার অর্জিত সমস্তকিছু সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়ার বাস্তবতাকে চিত্রিত করা হয়েছে।” তাঁর মতে, দ্রুতলয়ের কথাবলা গানে রূপ দেওয়ার পরিবর্তে কবিতাটি সাধারণ আবৃত্তি হিসেবেই উপস্থাপন করা হলে তা বেশি গ্রহণযোগ্য হতো।

কবিতার সঙ্গে দ্রুতলয়ের সুরের সংমিশ্রণও অনেকের কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। সংগীতশিল্পী মেহজাবীন তানহা ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, “রবি ঠাকুর প্রথম হার্ট অ্যাটাক করলেন ‘ঠেকাই মাথা’ শুনে, দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাক করলেন ‘সোনার তরী’ শুনে।” নজরুলের ‘রুমঝুম’ গানের পর এভাবে কালজয়ী সৃষ্টিগুলো নিয়ে আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করার আহ্বানও জানান তিনি।

গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন মাশা ইসলাম
সাংবাদিক ও নাট্যকর্মী পাভেল ইসলামও কড়া ভাষায় সমালোচনা করে বলেন, ‘সোনার তরী’ কবিতাকে আধুনিক সংগীতের সুরে উপস্থাপন করতে গিয়ে এর ওপর একধরনের জবরদস্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে ‘ঝড়ের পাখি’ নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “শিল্পে স্বাধীনতার নামে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা ও সংবেদনশীলতা দেখানো হয়নি।”

গানটির মিউজিক কিউরেটর শায়ান চৌধুরী অর্ণব এবং কোক স্টুডিও বাংলার সাম্প্রতিক সংগীতধারা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। কবি রুম্মান মাহমুদ লিখেছেন, “এই গানে ‘সোনার তরী’র দ্রুতলয়ের অংশ মানায় নাই। গানটা না ধরতে পারলো সেই সুরের তেজ, না ধরতে পারলো কবিতার মূল ভাব।” তিনি আরও দাবি করেন, অর্ণব বারবার নিজের গানেরই রূপান্তর করছেন এবং কোক স্টুডিও বাংলায় নতুন সুরকারদের সুযোগ দেওয়া উচিত।

কবি শুভ ইসলাম এই গানটিকে ‘অপরিপক্ব’ ও ‘অত্যন্ত নিম্নমানের’ আখ্যা দিয়ে লিখেছেন, “কোক স্টুডিও বাংলা এখন অতিরিক্ত মূল্যায়ন পাওয়া মিউজিশিয়ানদের কর্মসংস্থান প্রকল্প ছাড়া আর কিছু নয়।” অন্যদিকে রুপক মেভারিক রুপাই নামে এক শ্রোতা মন্তব্য করেন, কোক স্টুডিও বাংলা একই ধরনের সংগীত-ফর্মুলায় আটকে গেছে। তাঁর মতে, বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও বারবার বিদেশি সুর ও অপ্রাসঙ্গিক মিশ্রণ ব্যবহারের কারণে গানগুলোর মৌলিকত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইউটিউবের মন্তব্যঘরেও শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ তীব্র। অনেকেই কঠোর ভাষায় গানটির প্রতি নিজেদের অনীহা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

সামগ্রিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবের প্রতিক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে, শিল্পে পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্বাধীনতাকে অনেকেই সমর্থন করলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী সৃষ্টির এই উপস্থাপনা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রোতা ও সংস্কৃতিকর্মীর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তবে এ বিষয়ে কোক স্টুডিও বাংলা বা সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো জানা যায়নি।

গান: মেঘ