মঞ্চই তার সবচেয়ে আপন ঠিকানা। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয়ের আলোয় আলোকিত করেছেন দেশের নাট্যাঙ্গন। সেই দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি, না-পাওয়ার আক্ষেপ, শিল্পচর্চার দর্শন, সংসার-সন্তানকে ঘিরে নেওয়া জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে এক আন্তরিক আড্ডায় দর্শকদের সামনে খুলে দিলেন নিজের জীবনের নানা অধ্যায়। বরেণ্য অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার যেন এদিন ছিলেন শুধু একজন শিল্পী নন, ছিলেন এক জীবন্ত ইতিহাসের কথক।
শনিবার (২৫ জুলাই) নাট্যদল অনুস্বরের সপ্তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘অনুস্বর সংলাপ’-এর চতুর্থ পর্বে ‘ফেরদৌসী মজুমদার: জীবন ও অভিনয়’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে নিজের অভিনয়জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার স্টুডিও থিয়েটারে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শুরুতে অনুস্বরের প্রধান মোহাম্মদ বারীর প্রশ্নের উত্তর দেন, পরে উপস্থিত দর্শকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব দেন এই গুণী অভিনেত্রী।
আলোচনার একপর্যায়ে উঠে আসে বিশ্ববরেণ্য নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ। ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, তখন তার মেয়ে ত্রপা মজুমদার খুব ছোট ছিল। সংসারের দায়িত্ব, সন্তানের বেড়ে ওঠা এবং মঞ্চনাটকের ব্যস্ততার কারণে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, “আমার ত্রপা তখন ছোট। ওকে রেখে অভিনয় করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কারণ সংসার আর সন্তানই আমার কাছে বড়।”
একই সময়ে বাংলাদেশের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’-তে জয়তুন চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। পরে ওই চরিত্রে অভিনেত্রী ডলি আনোয়ারকে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে এখন তার অনুভূতি কী—এমন প্রশ্নের জবাবে ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, “এখন কখনও কখনও মনে হয়, হয়তো সিনেমাগুলো করা যেত। তবে সেই সময়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে নিজের সিদ্ধান্তকে ভুল মনে হয় না।” তার ভাষায়, আক্ষেপ আছে, কিন্তু অনুশোচনা নেই।
এরপরও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ‘বরফ গলা নদীতে’ অভিনয় করেছিলেন তিনি। আর কোনো সিনেমায় অভিনয় করেননি। কেন করেছিলেন—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, অভাব মেটাতেই সে সময় সিনেমাটিতে অভিনয় করেছিলেন।
সংসারজীবন অভিনয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল কিনা জানতে চাইলে ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, “সংসার আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছে, সহযোগিতা করেছে। ছোটবেলায় বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে অভিনয় করেছি। ভেবেছিলাম এরপর আর অভিনয় হবে না। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে এসে দেখি সবাই অভিনয় করে। রামেন্দু মজুমদারের ভাই, আমার ভাসুরও অভিনয় করতেন। আমার মেয়েও কখনও বাধা দেয়নি।”
থিয়েটার নিয়ে নিজের দর্শনের কথাও তুলে ধরেন এই অভিনেত্রী। তার মতে, নাটক শুধু হতাশার গল্প বলবে না, মানুষের জন্য আশার জায়গাও তৈরি করবে। একই সঙ্গে বর্তমান সময়ে শক্তিশালী নাট্যকারের অভাব রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, একটি ভালো নাটকের প্রাণ হলো সুগঠিত গল্প ও শক্তিশালী পাণ্ডুলিপি।
নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে তার পরামর্শ, “থিয়েটারে আসতে হবে ভালোবাসা থেকে। শুধু তারকা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা খ্যাতির মোহ নিয়ে মঞ্চে দাঁড়ালে প্রকৃত শিল্পচর্চা হয় না।”
অনুষ্ঠানে মঞ্চ ও টেলিভিশন নাটকে অভিনয়ের পার্থক্য নিয়েও কথা বলেন তিনি। কেন মঞ্চে বেশি অভিনয় করেছেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, “মঞ্চে প্রত্যক্ষ ফিডব্যাক পাওয়া যায়। এটা গ্রহণ করলে আনন্দ পাওয়া যায়।”
কথা প্রসঙ্গে নিজের অভিনীত ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘কোকিলারা’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘মেরাজ ফকিরের মা’ ও ‘লাভ লেটার’সহ বেশ কয়েকটি নাটকের সংলাপ আবৃত্তি করেন ফেরদৌসী মজুমদার। তার পরিবেশনায় মুগ্ধ হয়ে বারবার করতালিতে ফেটে পড়েন উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা।
চলচ্চিত্রে কাজের অভিজ্ঞতা স্মরণ করতে গিয়ে প্রয়াত অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদীর সৌজন্য ও শ্রদ্ধাবোধের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, শুটিং সেটে তাকে দেখলেই হুমায়ূন ফরিদী উঠে দাঁড়াতেন এবং ইউনিটের সদস্যদের বলে রাখতেন, তিনি এলে যেন নিজের চেয়ারটি তাকে দেওয়া হয়।
‘সংসপ্তক’ নাটকে হুমায়ূন ফরিদীর সঙ্গে অভিনয় এবং ‘বরফ গলা নদী’ চলচ্চিত্রে সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে কাজের স্মৃতিও ভাগ করে নেন তিনি। সহশিল্পীদের প্রতি পারস্পরিক সম্মান ও আন্তরিকতাকেই শিল্পচর্চার অন্যতম সৌন্দর্য বলে মন্তব্য করেন।
নিজের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে প্রিয় কাজ হিসেবে ‘কোকিলারা’ নাটকের নাম উল্লেখ করেন ফেরদৌসী মজুমদার। তার ভাষ্য, এই নাটকের জন্যই তাকে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছিল। সৈয়দ শামসুল হক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং আবদুল্লাহ আল-মামুনের মতো নাট্যকারদের পাণ্ডুলিপিতে অভিনয়ের সুযোগকে নিজের অভিনয়জীবনের বড় প্রাপ্তি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
একজন দর্শক জানতে চান, তার মতো হতে গেলে কী করতে হবে। উত্তরে ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, “আমার মতো না, আমাকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। তবে শিল্পীকে পরিশ্রমী হতে হবে। ত্রপা সাংঘাতিক পারফেকশনিস্ট। অসম্ভব নিষ্ঠাবান, অসম্ভব পরিশ্রমী।”
জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমার জীবনের কোনও লক্ষ্য ছিল না। লক্ষ্য ঠিক করে কিছু হয় কিনা জানি না।”
শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, ছেলে-মেয়ের মধ্যে কোনো বৈষম্য ছিল না তাদের পরিবারে। “আমি ছেলেদের সঙ্গে মার্বেল খেলেছি, ডাঙ্গুলি খেলেছি। জিতেছিও,” বলেন তিনি।
নাট্যাঙ্গনের ভাঙাগড়া নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন এই বরেণ্য অভিনেত্রী। তার ভাষায়, “না ভাঙলে গড়বে কী করে। সুতরাং ভাঙাটাকে অস্বাভাবিকভাবে দেখার কিছু নাই।”
অনুষ্ঠানের শেষদিকে যেন নিজের দীর্ঘ নাট্যজীবনের সারসংক্ষেপই টেনে দেন ফেরদৌসী মজুমদার। সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর সেই উপলব্ধি—“থিয়েটার একটা সামগ্রিক ব্যাপার।”