ইতালির মেস্ট্রেতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে হেনস্তা ও শারীরিকভাবে আঘাত করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। একদিকে দেশের অভিনয়শিল্পী, শিক্ষক, রাজনীতিক ও সাধারণ মানুষ বাঁধনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। অন্যদিকে আরেকটি অংশ বলছে, বাংলাদেশে গত দুই বছরে রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে যে মব-সংস্কৃতি ও প্রতিশোধের রাজনীতি তৈরি হয়েছে, ইতালির ঘটনাটি তারই এক ধরনের প্রতিফলন।
তবে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে অনেকেই একমত—রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে একজন নারীকে প্রকাশ্যে হেনস্তা, অপমান বা শারীরিকভাবে আক্রমণের শিকার হওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বাংলাদেশ সময় সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক ভিডিওবার্তায় বাঁধন অভিযোগ করেন, ইতালির মেস্ট্রেতে আওয়ামী লীগের কর্মী পরিচয় দেওয়া কয়েকজন ব্যক্তি তাকে হেনস্তা করেছেন। তার গায়ে পানি, কোক ও অন্যান্য পানীয় ছুড়ে মারা হয়েছে এবং তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বাঁধনের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় তার ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী এবং চার বছরের কম বয়সী এক শিশুও সঙ্গে ছিল। শিশুটি ভয় পেয়ে কান্না করছিল বলেও ভিডিওবার্তায় জানান তিনি। অভিনেত্রী বলেন, তাকে জোর করে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তার ফোন ফেলে দেওয়া হয়েছে এবং কানের কাছে আঘাত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন এই অভিনেত্রী।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে একটি বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নিয়ে সেখানে অবস্থান করছেন বাঁধন। এমন একটি আন্তর্জাতিক আয়োজনের সময় একজন বাংলাদেশি অভিনেত্রীকে ঘিরে এ ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
বাঁধনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে রাতেই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা সারজিস আলম ফেসবুকে লিখেছেন, অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে নিয়ে তারা গর্বিত। হামলায় অভিযুক্তদের কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই আপনার সাথে আছি। পুরো বাংলাদেশ আপনার সাথে।’
তবে তার পোস্টের ভাষা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। কেউ কেউ বাঁধনের প্রতি সংহতিকে স্বাগত জানালেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে ব্যবহৃত কঠোর ভাষা দেশের চলমান রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়াতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন।
ঘটনার পর বিনোদন অঙ্গনের অনেকেই বাঁধনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অভিনেত্রী জাকিয়া বারী মম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘কিচ্ছু ঠিক হচ্ছে না! এই কর্মকাণ্ডগুলোর কোনটাই ভালো হচ্ছে না!’ নারীর প্রতি অসম্মান, ভিন্নমতের মানুষের ওপর নির্যাতন, রাজনৈতিক অন্ধ আনুগত্য, সহিংসতা ও নাগরিক নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশ আরও ভয়াবহ সংকটের দিকে যেতে পারে।
মডেল, অভিনেত্রী ও আইনজীবী পিয়া জান্নাতুলও নারী ও শিল্পীদের প্রতি মানুষের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, মানুষ দিন দিন বিশেষ করে নারী ও শিল্পীদের প্রতি আরও নিষ্ঠুর ও সংবেদনহীন হয়ে উঠছে।
পিয়ার ভাষায়, প্রকৃত উন্নতি বোঝা যায় একজন মানুষ অন্যকে কতটা সম্মান করতে পারে এবং কতটা মানবিক থাকতে পারে—সেখানেই।
চিত্রনায়িকা পরীমণিও ঘটনার ভিডিও শেয়ার করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার প্রতিক্রিয়ায় বিশেষভাবে উঠে আসে ঘটনার সময় উপস্থিত ছোট শিশুটির কান্নার বিষয়টি।
অভিনেত্রী সাফা কবির বলেন, একজন শিল্পী যখন দেশের বাইরে একটি চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের চলচ্চিত্র ও দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে যান, তখন তার প্রাপ্য হওয়া উচিত সম্মান ও নিরাপত্তা—অপমান, হয়রানি বা আতঙ্ক নয়।
তার ভাষায়, রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে শিল্পীদের টেনে আনা দুঃখজনক। একজন শিল্পীর কণ্ঠ, সম্মান ও নিরাপত্তা কখনোই রাজনীতির মূল্য হওয়া উচিত নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুনও ঘটনাটিকে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন। তার মতে, ভেনিসের মতো আন্তর্জাতিক আয়োজনের সময় বাঁধন শুধু একজন সাধারণ বাংলাদেশি নন; তিনি এক অর্থে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
তিনি মনে করেন, প্রতিশোধ ও ‘টিট ফর ট্যাট’ রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি বড় অংশের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের প্রশ্ন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে মানুষকে হেনস্তা, অপমান ও আক্রমণের যে ঘটনা ঘটেছে, সেসবের বিরুদ্ধে সমাজের প্রভাবশালী অনেক মানুষ কেন একইভাবে সোচ্চার হননি?
এই পক্ষের অনেকেই বিশেষ করে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় নারীসহ বিভিন্ন মানুষের হেনস্তার ঘটনা সামনে আনছেন। তাদের বক্তব্য, দেশে যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সাধারণ মানুষ, নারী বা ভিন্নমতের ব্যক্তিরা মবের শিকার হয়েছেন, তখন অনেকের নীরবতা আজকের ঘটনায় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বাঁধনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টের নিচে আলিজা চৌধুরী নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, অতীতে সাধারণ মানুষকে হেনস্তার সময় সেই ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের অনুভূতি নিয়েও ভাবা উচিত ছিল।
আরেক ব্যবহারকারী তন্ময় চৌধুরী লিখেছেন, বাঁধনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনায় তিনি পানি বা পানীয় নিক্ষেপের মতো আচরণ সমর্থন করেন না। তবে তার প্রশ্ন, দেশে বিভিন্ন সময়ে নারীদের হেনস্তার ঘটনায় প্রতিবাদ কেন একই মাত্রায় দেখা যায়নি। তার ভাষায়, একজন সেলিব্রেটির ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করা সহজ হলেও সাধারণ মানুষের ওপর একই ধরনের নির্যাতনের ঘটনায় সমাজের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক কম—এমন অভিযোগও তিনি তুলেছেন।
এই বিতর্কের মূল জায়গাটিও সেখানেই; সহিংসতা ও হেনস্তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কি ব্যক্তি, রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান দেখে হবে, নাকি সব ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হবে?
বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থানরত চিত্রনায়ক সাইমন সাদিকও ফেসবুক লাইভে এসে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। তার বক্তব্য, জুলাই আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অনেক শিল্পী ও মানুষের মধ্যেও মবের ভয় ছিল এবং তাদের অনেকে প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে পারেননি। তার ভাষায়, ‘পৃথিবীতে আমি যা করবো, সেটা রিটার্ন পাবো।’
ঢাবি অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন তার লেখায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়েও আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তার মতে, দলটির বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অন্যকে দায়ী করার আগে নিজেদের ভুল ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার ভাষ্য, ‘সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির দিকে এগোনোর পরিবর্তে রাজনীতি আরও অসহিষ্ণু ও সহিংস হয়ে উঠছে। প্রতিশোধ, ভয় ও সহিংসতার বদলে জবাবদিহি, আত্মসমালোচনা ও সহনশীল রাজনীতির প্রয়োজন রয়েছে।’