সিনেমায় প্রেমও এত সহিংস হয়ে উঠছে কেন?

কিছু দিন আগেও উপমহাদেশের সিনেমাগুলোতে প্রেমের দৃশ্য ছিল কোমল, যার কেন্দ্রে ছিল মূলত পরিবার। সামাজিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক গল্প, রহস্য আর বাস্তব জীবনের গল্পই হতো সিনেমার মূল উপজীব্য। তবে গত কয়েক বছরে চিত্রটা বদলে গেছে। সিনেমার প্রেমও এখন আর কোমল নেই, সেখানেও ঢুকে পড়েছে রক্ত, প্রতিশোধ আর তীব্র সহিংসতা। 

বিশেষ করে বলিউডের ‘অ্যানিম্যাল’, ‘কেজিএফ’, ‘সালার’ ও ‘ধুরন্ধর’-এর মতো সিনেমা দিয়েই ভায়োলেন্স সিনেমার নতুন যুগ শুরু হয়েছে বলা চলে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে ঢালিউডেও। শাকিব খানের ‘তুফান’, ‘বরবাদ’, সিয়াম আহমেদের ‘রাক্ষস’, শরীফুল রাজের ‘ইনসাফ’ তারই উদাহরণ। যেখানে প্রেমের গল্প বলা হচ্ছে বন্দুকের নল আর রক্তের দাগে।

প্রেমিক থেকে ভয়ংকর নায়ক

সামাজিক গল্প বা সামাজিক-অ্যাকশন সিনেমায় নায়ককে দেখানো হতো আদর্শবান, প্রেমিক, পরিবারের দায়িত্বশীল সন্তান কিংবা ন্যায়পরায়ণ মানুষ হিসেবে। ভায়োলেন্স ভরা সিনেমায় সেই চিত্রটাই উল্টে গেছে। এখানে নায়ক ভয়ংকর ও নির্দয়। একাই বহু শত্রুর মোকাবিলা করতে সক্ষম। নিজের নিয়মে চলেন, প্রচলিত নিয়ম মানেন না। অন্যের স্বীকৃতি চান না, বরং সবাইকে নিজের ক্ষমতা অনুভব করান।

আর সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন এসেছে প্রেমের উপস্থাপনায়। এসব সিনেমায় প্রেম কেবল কোমল অনুভূতি নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা নিয়ন্ত্রণ, নির্ভরশীলতা ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। ভালোবাসাকে রক্ষার নামে, ভালোবাসা পাওয়ার নামে পর্দায় দেখানো হচ্ছে চরম নৃশংসতা। যেখানে প্রেমিকাই হয়ে উঠছেন সহিংসতার কারণ ও উপলক্ষ।

বিকল্পও দেখছেন দর্শকেরা

সহিংসতার ভিড়েও বিকল্প সিনেমা যে দর্শক দেখছে, তার প্রমাণও আছে। বলিউডে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘হনুমান অংশ’ সেটি স্পষ্ট করে দেয়। ড. বিশাল চতুর্বেদী পরিচালিত জীবনীভিত্তিক ভক্তিমূলক নাট্যধর্মী ছবিটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৩৬ দশমিক ৮৩ কোটি রুপি আয় করেছে। মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছেন শোভিনাও সত্যা এবং চন্দন আনন্দ।

ঢালিউডেও ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ও ‘উৎসব’-এর মতো সিনেমা দারুণ প্রশংসা কুড়িয়েছে, যেখানে প্রেম আছে, কিন্তু তা রক্তাক্ত নয়।

নির্মাতারা কেন ‘ভায়োলেন্স’ সিনেমায় আগ্রহী?

অনেক নির্মাতা মনে করেন, কোনও সিনেমার ট্রেলারে রক্তাক্ত দৃশ্য, ভয়ংকর নায়ক বা আলোচিত সংলাপ থাকলে তা দ্রুত দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনেক সময় বিতর্কও সিনেমার প্রচার বাড়ায়। এছাড়া সহিংসতা বা বেশি রক্তপাতের মাধ্যমে দুর্বল গল্পকেও দর্শকের কাছে সহজে পৌঁছানো যায়।

৩ জুলাই ২০২৪ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কিল’ সিনেমার নির্মাতা নিখিল ভাট বলেন, ‘একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আমি সব সময় নতুন পরীক্ষা করতে এবং নিজের ও নিজের শিল্পের সীমা আরও এগিয়ে নিতে আগ্রহী।’

সহিংসতা নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, ‘‘কিল’ একটি নির্দিষ্ট ধারার সিনেমা। এটি অত্যন্ত সহিংস ছবি। তাই সহিংসতার জন্য এর সমালোচনা করা অনেকটা এমন, যেন একটি হরর সিনেমাকে ভয় দেখানোর জন্য সমালোচনা করা হচ্ছে।’ তার মতে, চরম সহিংসতাকে অ্যাকশন-থ্রিলার ঘরানার অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে দেখছেন তিনি।

ঢালিউডের ‘বরবাদ’-খ্যাত নির্মাতা মেহেদি হাসান হৃদয় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি গল্পের প্রয়োজনে যা ছিল আমার ‘বরবাদ’ সিনেমায় সেটা দেখানোর চেষ্টা করেছি। সময় এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সেভাবে সিনেমার গল্প বলার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। এ ছাড়া সিনেমা তো স্কুল বা কলেজ নয়, এখানে মানুষ শিখতে যাবে; মানুষ সিনেমা দেখতে যায় বিনোদনের জন্য। সে বিনোদনের জন্য গল্পে যা প্রয়োজন তা আমি রাখার চেষ্টা করি।’

তিনি আরও জানান, ‘আমি ‘বরবাদ’ বা ‘রাক্ষস’ সিনেমার বাইরে ‘বিদায়’ নিয়ে আসছি। এটাতে আগের দুটোর কোনও প্রভাব নেই।’

‘ভায়োলেন্স’ সিনেমা নিয়ে তারকারা কী বলছেন

এই ধারা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারকারাও। ঢালিউড অভিনেতা আমিন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার কাছে প্রথম দিকে এক-দুটো ভালো লেগেছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখলাম সবই একই রকম হয়ে যাচ্ছে। সত্যি বলতে ‘অতিরিক্ত ভায়োলেন্স সমাজের পার্ট না’। আমাদের সমাজের কোথাও এমন সহিংসতা দেখাও যায় না। সিনেমা সমাজ পরিবর্তন করবে না। তাই বলে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সেটাও দেখানো ঠিক মনে করি না।’ 

তার মতে, ‘সিনেমা পুরো একটা বিনোদন। মানুষ টাকা দিয়ে বিনোদন দেখতে যায়। সেখানে নিশ্চয় অতিরিক্ত সহিংসতা বা ভায়োলেন্স কাউকে বিনোদন দিতে পারে না।’

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ‘অ্যানিম্যাল’ মুক্তির পর অভিনেতা আমির খানও সিনেমায় অতিরিক্ত হিংসা ও যৌনতার ব্যবহার নিয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি বলেন, ‘দর্শকদের মধ্যে কিছু আবেগ খুব সহজেই উসকে দেওয়া যায়। হিংসা তার মধ্যে একটি, আর যৌনতাও আরেকটি। যেসব পরিচালক গল্প তৈরি করতে, আবেগ ফুটিয়ে তুলতে এবং পরিস্থিতি নির্মাণ করতে খুব একটা দক্ষ নন, তারা নিজেদের সিনেমাকে সফল করতে হিংসা ও যৌনতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেন।’ 

আমির আরও বলেন, ‘এ ধরনের উপাদান ব্যবহার করে কোনও সিনেমা বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারে, কিন্তু তা সমাজের জন্য যথেষ্ট ক্ষতিকর। চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে, কারণ সিনেমা দর্শকদের, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মনে প্রভাব ফেলে।’

দর্শক কী ভাবছেন?

প্রেমের গল্পে এই সহিংসতা দর্শককেও অস্বস্তিতে ফেলছে। গণমাধ্যমকর্মী সাদ্দিফ অভি বলেন, ‘আগে পরিবার নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখা যেতো। কিন্তু গত কয়েক বছরের সব সিনেমা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কিংবা শিশুদের নিয়ে দেখা যাচ্ছে না। অনেক সিনেমাতে আজকাল অতিরিক্ত রক্তপাত ও যৌনতা প্রদর্শন দেখা যায়। এর ফলে সে সিনেমা হয়তো একা, নয়তো পরিবারের বাইরের কোনও সদস্যকে নিয়ে দেখতে হচ্ছে।’

সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া যশের প্যান ইন্ডিয়ান সিনেমা ‘টক্সিক’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ কেশব নামে এক দর্শক লেখেন, ‘সিনেমাটি কি শুধু যৌনতা আর সহিংসতা নিয়েই? ব্যাপারটা অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে! এ ধরনের উপস্থাপনার কারণে পারিবারিক দর্শকেরা সিনেমাটি দেখতে আগ্রহ হারাতে পারে।‘

ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের আইন ও মানবাধিকার বিভাগের গবেষক এবং সাবেক প্রভাষক মো. নাজমুল হোসেন সেফাত বলেন, ‘শিশুদের শেখাতে হবে যে সহিংসতা মানেই বীরত্ব নয়। অ্যাকশনধর্মী সিনেমা কাউকে অপরাধীতে পরিণত করে না। কিন্তু কিশোরেরা যেন শেখে যে সাহস সহিংসতা থেকে আসে না, সম্মান মানেই ভয় নয় এবং ক্ষমতা কোনও অস্ত্র নয়।’