কান উৎসবের প্রধান বিচারক দক্ষিণ কোরিয়ান এই নির্মাতা

করিডোর অ্যাকশন দৃশ্যের জন্য ২০০৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ওল্ডবয়’ ছবিকে গোটা দুনিয়ায় পথিকৃৎ ধরা হয়। ২০০৪ সালে ৫৭তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে গ্রাঁ প্রিঁ জয় করে এটি। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়ে যান দক্ষিণ কোরিয়ান নির্মাতা পার্ক চ্যান-উক। ৬২ বছর বয়সী এই পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি সভাপতি (মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের প্রধান বিচারক) হিসেবে কাজ করবেন। এবারই প্রথম দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্রাঙ্গনের কেউ এমন সম্মান পেলেন। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) আয়োজকরা এই ঘোষণা দিয়েছে।

এবারের আসরে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মধ্য থেকে একটি ছবিকে দেওয়া হবে স্বর্ণপাম। পার্ক চ্যান-উকের নেতৃত্বাধীন বিচারক প্যানেলের রায়ে সেই চলচ্চিত্র চূড়ান্ত হবে। আগামী ২৩ মে উৎসবের সমাপনীতে গ্রাঁ থিয়েটার লুমিয়েরের মঞ্চে বিজয়ী ছবির নাম ঘোষণা করবেন তিনি।

আগামী মাসের মাঝামাঝি ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসিয়াল সিলেকশন ঘোষণা করা হবে। এবারের আসরের পর্দা উঠবে আগামী ১২ মে। 

গত বছর কানে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে বিচারকদের প্রধান ছিলেন ফরাসি অভিনেত্রী জুলিয়েট বিনোশ। ৭৮তম কান উৎসবে ইরানের জাফর পানাহি পরিচালিত ‌‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’ ছবিটি স্বর্ণপাম জিতেছে।

পার্ক চ্যান-উক (ছবি: কান উৎসবের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে নেয়া)

কান উৎসবের সভাপতি ইরিস নোব্লোক ও পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমোঁ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘পার্ক চ্যান-উকের উদ্ভাবনী শক্তি ও ভিজ্যুয়াল দক্ষতা সমকালীন সিনেমাকে সত্যিকার অর্থেই কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছে। তার অপরিসীম প্রতিভা এবং আরো বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে, আমাদের সময়কে প্রশ্ন করতে পারে এমন সিনেমার মাস্টারকে উদযাপন করতে পেরে আমরা আনন্দিত।’

কান উৎসবের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কোয়েন্টিন ট্যারান্টিনো, ব্রায়ান ডি পালমা ও প্রয়াত ডেভিড ফিঞ্চারের মতো চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে পার্ক চ্যান-উককে তুলনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ রয়েছে– তার নির্মাণে আকিরা কুরোসাওয়া, আলফ্রেড হিচকক, ইঙ্গমার বার্গম্যান ও লুকিনো ভিসকোন্টির প্রভাব স্পষ্ট।

একনজরে পার্ক চ্যান-উক
১৯৯২ সালে মুক্তি পায় পার্ক চ্যান-উক পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র “দ্য মুন ইজ...দ্য সান’স ড্রিম”। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে নির্মাণ করা একডজন অসাধারণ পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি তাকে সমকালীন চলচ্চিত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিচালকদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি নির্মাণে বরাবরই প্রথা ভেঙেছেন। চিত্রনাট্য ও নির্মাণশৈলীর দিক থেকে তার চলচ্চিত্রগুলো সাহসী ও ব্যতিক্রম। 

কান উৎসবে পার্ক চ্যান-উকের যাত্রা শুরু হয় ‘ওল্ডবয়’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ছবিটির মাধ্যমে প্রতিশোধধর্মী ট্রিলজি শুরু করেন। এর অন্য দুটি ছবি হলো ‘সিমপ্যাথি ফর মিস্টার ভেনজান্স’ (২০০২) ও ‘লেডি ভেনজান্স’ (২০০৫)। তার পরিচালিত তৃতীয় চলচ্চিত্র ‘জেএসএ (জয়েন্ট সিকিউরিটি এরিয়া)’ দক্ষিণ কোরিয়ার বক্স অফিসে নতুন রেকর্ড গড়েছিল।

৬২তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত ‘থার্স্ট’ (২০০৯) জুরি পুরস্কার জিতেছে। ৬৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয় তার ‘দ্য হ্যান্ডমেইডেন’ (২০১৬)। ৭৫তম কান উৎসবে ‘ডিসিশন টু লিভ’ (২০২২) ছবির জন্য সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

পার্ক চ্যান-উকের বিখ্যাত আরেকটি ছবি নিকোল কিডম্যান অভিনীত ‘স্টোকার’ (২০১৩)। গত বছর ৮১তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয় পার্ক চ্যান-উকের ‘নো আদার চয়েস’। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন ‘স্কুইড গেম’ তারকা লি বিয়াং হান। 

পার্ক চ্যান-উক (ছবি: কান উৎসবের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে নেয়া)

কান উৎসবে কোরিয়ান জয়যাত্রা
পার্ক চ্যান-উকের সভাপতি হওয়ার ঘটনা কান উৎসবের সঙ্গে কোরিয়ান চলচ্চিত্রের প্রারম্ভিক ও গভীর সম্পর্ক প্রতীকীভাবে তুলে ধরে। ২০০২ সালে কানে প্রথম কোরিয়ান হিসেবে সেরা পরিচালকের পুরস্কার জয় করেন ইম কোয়ান-তেক। ‘আঁ সার্তে রিগা’ বিভাগে নির্বাচিত হং সাং-সু পরিচালিত ‘টেল অব সিনেমা’ (২০০৫), ‘কিম কি-দুকের ‘ব্রিদ’ (২০০৭) ও লি চ্যাং ডং পরিচালিত ‘পোয়েট্রি’ (২০১০) শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের পুরস্কার লাভ করে। মিডনাইট স্ক্রিনিং বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছে কিম জি-উনের ‘অ্যা বিচারসুইট লাইফ’ (২০০৫), ইয়ন সাং-হো পরিচালিত ‘ট্রেন টু বুসান’ (২০১৬), বিয়ান সাং-হিয়ানের ‘দ্য মার্সিলেস’ (২০১৭) এবং লি উন-তেই’র ‘দ্য গ্যাংস্টার, দ্য কপ, দ্য ডেভিল’ (২০১৯)।

২০১৯ সালে প্রথম কোরিয়ান নির্মাতা হিসেবে স্বর্ণ পাম জিতেছেন বং জুন-হো। সেই আসরে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে বিচারকদের প্রধান ছিলেন আলেহান্দ্রো গঞ্জালেজ ইনারিতু। 

কোরিয়ান পরিচালকরা যেমন কান উৎসবে নিয়মিতভাবে সম্মানিত হয়েছেন, তেমনই তাদের ছবির অভিনয়শিল্পীরাও সমানভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কখনও জুরি সদস্য হিসেবে, কখনও পুরস্কারপ্রাপ্ত হিসেবে। এ তালিকায় উল্লেখযোগ্য- ‘সিক্রেট সানশাইন’ ছবির জিয়ন ডু-ইয়ন (সেরা অভিনেত্রী, ২০০৭) এবং ‘ব্রোকার’ ছবির সং কাং-হো (সেরা অভিনেতা, ২০২২)। পার্ক চ্যান-উক পরিচালিত চারটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন সং কাং-হো।