ধর্মের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক রাজনীতির সংকীর্ণ ন্যারেটিভের চেয়েও সর্বদাই জটিল এবং আকর্ষণীয়। এই সাংস্কৃতিক ইতিহাসের পাতায় জড়িয়ে রয়েছে এক সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য অন্য সম্প্রদায়ের আপন করে নেওয়ার অজস্র উদাহরণ। এই যৌথ উত্তরাধিকারকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের চেয়ে সার্থকভাবে আর কেউ বহন করেননি। মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া এই কবিই বাংলা সংগীতকে উপহার দিয়েছেন দেবী কালীকে নিবেদিত কালজয়ী সব শ্যামাসংগীত।
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই কালীপূজায় নজরুলের শ্যামাসংগীত নতুন করে মনোযোগ আকর্ষণ করছে। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে নৈহাটির বিখ্যাত ‘বড় মা’ মন্দিরের ট্যাগলাইন পরিবর্তন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। মন্দিরের পুরনো ট্যাগলাইন ‘ধর্ম যার যার, বড় মা সবার’ পরিবর্তন করে নতুন রূপ দেওয়া হয় ‘বড়মায়ে ভক্তি, সনাতনে শক্তি’।
মেম্বারদের অনুরোধেই এই সিদ্ধান্ত এবং এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক সংযোগ নেই বলে মন্দির কমিটি দাবি করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক থামেনি। বিশেষ করে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের কয়েক মাস পর এই ঘটনা ঘটে। ঠিক এই আবহেই নজরুলের সংগীতের আবেদন ধর্মীয় সীমানা ছাড়িয়ে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
ঔপনিবেশিকতা, নিপীড়ন ও সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন লেখার জন্য ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে পরিচিত হলেও নজরুল ছিলেন বহুমাত্রিক এক সুরস্রষ্টা। ইসলামী ভক্তিগীতি, হামদ ও নাত থেকে শুরু করে সনাতন ধর্মের ভজন, কীর্তন এবং শ্যামাসঙ্গীতে ছিল তার সমান বিচরণ।
রামপ্রসাদ সেন ও কামলাকান্ত ভট্টাচার্যের কাজ থেকে অনুপ্রেরণা নিলেও নজরুল নিজস্ব সাহিত্যিক কল্পনায় শ্যামাসংগীতে নতুন মাত্রা যোগ করেন। তিনি কালীকে কেবল এক শক্তিশালী দেবী হিসেবে নন, বরং এক পরম মমতাময়ী মা হিসেবে উপস্থাপন করেন। যার কাছে একজন ভক্ত আকুলতা, ভালোবাসা, অভিমান ও আত্মসমর্পণ নিয়ে উপস্থিত হতে পারে।
১৯৬৬ সালে প্রকাশিত নজরুলের ‘রাঙা জবা’ কাব্যগ্রন্থে তার উল্লেখযোগ্য শ্যামাসংগীতগুলো একত্রিত করা হয়। ‘আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা’, ‘বল্ রে জবা বল্’ এবং ‘শ্মশানে জাগিছে শ্যামা’-এর মতো তার বিখ্যাত গানগুলোতে দেবীকে করাল, করুণাময়ী, রহস্যময়ী ও গভীর মাতৃত্বের নানা রূপে তুলে ধরা হয়েছে। ‘আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়’ গানে কালীর কৃষ্ণবর্ণ ও তার ঐশ্বরিক আলোকচ্ছটার বৈপরীত্য ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে পান্নালাল ভট্টাচার্য এবং ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতো শিল্পীদের কণ্ঠে নজরুলের এই শ্যামাসংগীতগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। প্রতি কালীপূজায় রেডিও ও লাউডস্পিকারে বেজে ওঠা এই গানগুলো মনে করিয়ে দেয় যে পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার কোনও একক সম্প্রদায়ের নয়, বরং সবার।
সূত্র: টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া