রাতের গল্প, সকালের চুম্বন আর স্কুল-পথের গান
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলকে হানা বলেন, ‘মোহাম্মদ আলীর সন্তান হিসেবে বড় হওয়াটা যে সব সময় কষ্টমুক্ত ছিল তা না। তার ৯ সন্তান চারটি ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বাস করতো। সেকারণে আমাদের সবাইকে সমানভাবে সময় দেওয়ার সুযোগ বাবা পেতেন না। তবে ভৌগোলিক দূরত্ব আর নিজস্ব ব্যস্ততা থাকার পরও প্রতি গ্রীষ্মে লস অ্যাঞ্জেলসের বাড়িতে আমাদের সবাইকে একত্র করতেন তিনি। আমরা তার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে যেতাম। রাতে আমাদের ঘুম না আসা পর্যন্ত বাবা গল্প বলে যেতেন। আর প্রতিদিন সকালে তার চুমুতে আমাদের ঘুম ভাঙতো। স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে গান শোনাতেন। প্রায় প্রতিদিনই আমাকে দুপুরের খাবার পৌঁছে দিতেন। আমাদেরকে ক্ষমা আর সমবেদনার শিক্ষা দিয়েছিলেন তিনি।’
একটি দুঃখবোধ পরবর্তী সুখস্মতি
হানা জানান, বাবার সঙ্গে তার সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটির কথা। তিনি বলেন, ‘যখন থেকে আমরা ভিন্ন ভিন্ন শহরে থাকতে লাগলাম, তখন বাবা আর আমার কাছাকাছি থাকার জন্য বেশি সময় পেতেন না কিংবা স্কুলে নিয়ে যেতে পারতেন না। কিছুদিন পর স্কুলের বাচ্চারা আমাকে উত্যক্ত করতে শুরু করলো। তারা বলতে লাগলো, মোহাম্মদ আলী যে আমার বাবা তা তারা বিশ্বাস করে না। একদিন আমি কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে সে ঘটনা বললাম। তখন আমার বয়স আট বছর। পরেরদিনই তিনি ওই শহরে ছুটে এলেন। আমাকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে থাকলেন যেন সবাই আমাদেরকে একসঙ্গে দেখে। পরেরদিন বাবা আমাকে স্কুলে নিয়ে গেলেন। আমাকে বললেন, যেসব শিশুরা আমাকে উপহাস করেছে তাদেরকে ডাকতে। আমি তাদের ডাকলাম। এরপর বাবা ওই বাচ্চাদের সঙ্গে করমর্দন করলেন এবং বললেন তিনি আমার বাবা। আর তখন আমার যে উপলব্ধি হয়েছিল তা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।’
সম্পদ আর খ্যাতির বিপরীতে হৃদয়ের আহ্বান
মোহাম্মদ আলী যে সাধারণ কোনও চ্যাম্পিয়ন নন সে নজির বার বারই মিলেছে। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন যশ আর খ্যাতির চেয়ে মানুষের হৃদয় অনেক বড় ব্যাপার। হানা বলেন, বাবা আমাদের শিখিয়েছেন, জীবনে সম্পদ কিংবা খ্যাতি যাই থাকুক না কেন হৃদয়ই বলে দেয় সে মানুষটি মহান নাকি সংকীর্ণমনা।’
আলীর ব্যাপ্ত হৃদয়ে সন্তানেরা
হানা জানান, বাবা কখনও তাদের আচরণে বিরক্ত হতেন না এবং বাধা দিতেন না। তিনি বলেন, ‘আমার মনে আছে, ছোটবেলায় বোন লায়লা আর আমি প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাবার অফিসে খেলতাম। তিনি তখন যত কাজই করুন না কেন কিংবা ওইখানে তার সঙ্গে যারাই দেখা করতে আসুক না কেন আমাদেরকে কিছু বলতেন না। আমরা ফায়ারপ্লেসের সামনে ঘুরতাম। ইচ্ছেমতো চিৎকার করতাম। মাঝে মাঝে তিনি টেপ রেকর্ডার বের করে আমাদের কথাবার্তা রেকর্ড করতেন। আমাদেরকে সেগুলো বাজিয়ে শোনাতেন এবং বলতেন যখন আমরা বড় হব তখন তিনি এমনটা করেছেন দেখে খুশি হব।’
মেয়ে হানার মতে, বাবার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল-তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারতেন। লোকজনের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে তিনি খুশি হতেন।
বাবা কতটা বড় মনের মানুষ ছিলেন তা বলতে গিয়ে হানা বলেন, ‘আপনারা যদি তার হৃদয়খানা ধার করতে পারতেন তাহলে আর প্রশ্ন করতেন না তিনি কী উৎসর্গ করেছেন। বাবা, তুমি মহান। তোমাকে কতটা ভালোবাসি তা প্রকাশ করতে পারব না।’
সে কারণেই ইন্সটাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে হানা লিখেছেন, ‘আমরা শোকে কাতর। তারপরও আমরা খুশি যে বাবা মুক্ত হয়েছেন। চলে যাবার সময় ফিসফিসিয়ে বাবাকে বলেছিলাম, তুমি চলে যাও বাবা, আমাদের কিছু হবে না। আমরা তোমাকে ভালোবাসি বাবা, তোমার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। এখন তুমি ঈশ্বরের কাছে যেতে পার।’
সূত্র: ডেইলি মেইল, ইন্সটাগ্রাম
/বিএ/