বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে দুই দিনের এক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর নেতারা। সম্প্রতি ব্রেক্সিটের পক্ষে ব্রিটিশ জনগণের রায়ের পর এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। মঙ্গলবার প্রথম দিনের বৈঠকে উপস্থিত থাকলেও বুধবার দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় থাকছেন না ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। বুধবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
ব্রিটেন ছাড়া ইইউভুক্ত ২৭টি দেশের সদস্যরা বৈঠকে ব্রেক্সিট ইস্যু ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যমান নানা সংকট নিয়ে আলোচনা করবেন। ৪০ বছরের মধ্যে এটাই যুক্তরাজ্যের উপস্থিতি ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম বৈঠক।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছেড়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তরাজ্যের গণভোটের রায়ের পর এ নিয়ে মঙ্গলবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে। পুরো আলোচনায় দেশটির ইইউ ত্যাগের পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক দল ইউকে ইনডিপেনডেন্স পার্টির (ইউকিপ) নাইজেল ফারাজ ছিলেন সমালোচনা ও ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্যবস্তু।
গত বৃহস্পতিবার গণভোটের পর মঙ্গলবার প্রথম এ নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গৃহীত এক প্রস্তাবে ইইউ থেকে বিদায়প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার জন্য লিসবন চুক্তির আর্টিকেল ফিফটি দ্রুত সক্রিয় করতে যুক্তরাজ্যের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
অন্যদিকে ব্রেক্সিট ভোটের পর গৃহবিবাদে জর্জরিত যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল লেবার পার্টিতে অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হয়ে হেরে গেছেন দলনেতা জেরেমি করবিন। তার বিপক্ষে ভোট পড়ে ১৭২টি, পক্ষে ৪০টি। তবে করবিন বলছেন, দলের সঙ্গে ‘বেঈমানি’ করে তিনি পদত্যাগ করবেন না।
ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের অধিবেশনের পর মঙ্গলবার রাতে ইইউর সদর দপ্তর ব্রাসেলসে জোটের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। গণভোটের পর তাদের মধ্যে এটাই প্রথম বৈঠক। ব্রাসেলসে পৌঁছে ক্যামেরন বলেন, ‘আমি ইউরোপের নেতাদের জানাব যে, যুক্তরাজ্য আর ইইউতে থাকছে না। তবে আশা করব এই বিদায়প্রক্রিয়া হবে গঠনমূলক।’ বুধবার সকালে ইইউ নেতাদের পরবর্তী বৈঠকে থাকছেন না ডেভিড ক্যামেরন।
নাইজেল ফারাজ মঙ্গলবার ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে সমালোচনার বাণে বিদ্ধ হন। তাকে উদ্দেশ করে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জঁ-ক্লদ জাঙ্কার বলেন, ‘আপনারা ইইউ থেকে বের হয়ে যেতে লড়াই করেছেন। ব্রিটিশ জনগণও বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছেন। তাহলে আপনারা এখানে কেন?’
জঁ-ক্লদ জাঙ্কার যুক্তরাজ্যকে জোট ত্যাগের বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে বলেন এ সময়। তাঁর তোপ এখানেই থামেনি, তিনি নাইজেল ফারাজের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণার সময় ইইউর সদস্য হিসেবে যুক্তরাজ্যের দেওয়া আর্থিক সহায়তা নিয়ে মিথ্যাচারের অভিযোগ তোলেন।
পার্লামেন্টে উদারপন্থী গ্রুপের প্রতিনিধিত্বকারী বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গাই ভেরোফস্টাড বলেন, গণভোটে ফারাজ নাৎসি ধারায় প্রচারণা চালিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি অভিবাসীদের নিয়ে একটি পোস্টারের বক্তব্যও পড়ে শোনান। নাম উল্লেখ না করে ভেরোফস্টাড ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে প্রচার চালানো বরিস জনসনকেও তীব্র আক্রমণ করেন। বরিস জনসন ইতিমধ্যে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের স্থলাভিষিক্ত হবেন বলে মনে করা হচ্ছে। ভেরোফস্টাড বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হতে একজন স্বার্থপর মানুষ সবকিছু করতে পারে।’
তোপের মুখে নাইজেল ফারাজ তার বক্তব্যে পার্লামেন্ট সদস্যদের বলেন, ‘আপনাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। যুক্তরাজ্যই ইইউ ত্যাগকারী সর্বশেষ দেশ হবে না।’
মেরকেলের হুঁশিয়ারি: ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এ ঝড় বয়ে যাওয়ার আগে নিজ দেশের পার্লামেন্টে কঠোর ভাষায় কথা বলেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। তিনি বলেন, ‘গণভোটের রায়ের বিষয়ে আমার শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশরা ইইউ ছাড়ার আলোচনায় নিজেদের পছন্দ বা সুবিধামতো সবকিছু করলে চলবে না।’
ইউরোপিয়ান কমিশনের রাশ টানা দরকার: পূর্ব ইউরোপের দেশ পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও চেক প্রজাতন্ত্র বলছে, সময় এসেছে ইউরোপিয়ান কমিশনের রাশ টেনে ধরার। জঁ-ক্লদ জাঙ্কারকে বরখাস্ত করার দাবি করেছে পোল্যান্ড।
ব্রেক্সিটের ফলে সামরিক শক্তি খর্ব হওয়ার আশঙ্কায় ইইউর পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান ফেডেরিকা মোঘেরিনি সংস্থাটির প্রতিরক্ষা আরও সুসংহত করার আহ্বান জানিয়েছেন। সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা।
/এমপি/