উদ্ধারকৃতদের মধ্যে শুধু সোমবারই লিবিয়া উপকূল থেকে দেড় হাজারের বেশি শরণার্থীকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে গত রবিবার ভূমধ্যসাগর থেকে পাঁচ শরণার্থীর লাশ উদ্ধার করে ইতালির কোস্টগার্ড।
ইতালি’র কোস্টগার্ড তাদের টুইটার অ্যাকাউন্টে জানিয়েছে, ‘ইতালির নৌবাহিনীর জাহাজ ভেগা অভিযান চালিয়ে সমুদ্রের তীরবর্তী এলাকা থেকে পাঁচজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এদের মধ্যে তিনজন জ্ঞান ফিরে পেলেও অপর দু’জন মারা যায়।’
জার্মান ত্রাণ সংস্থা জুগেন্ড রিত্তাত জানায়, তাদের জাহাজও রাবারের তৈরি একটি ডিঙি নৌকার ওপর থাকা ১৩০ জনের প্রাণ বাঁচাতে ওই একই অভিযানে অংশ নেয়। সেখান থেকে তারা জীবিতদের পাশাপাশি দু’জনের লাশ উদ্ধার করে।
ইতালির নৌবাহিনী ও মাল্টাভিত্তিক ত্রাণ সংস্থা এমওএএস একটি নৌযান থেকে ৪৭০ শরণার্থীকে উদ্ধার করে। সেখান থেকে পঞ্চম ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়।
রবিবার উদ্ধার অভিযান চালিয়ে লিবিয়া উপকূল থেকে ১১শ শরণার্থীকে উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে বৃহস্পতিবার থেকে মোট আট হাজার ৩০০ শরণার্থীকে উদ্ধার করা হলো।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে শরণার্থীদের মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। আবহাওয়ার উন্নতির ফলে সম্প্রতি বিপজ্জনকভাবে নৌকায় করে সমুদ্রপথে ইউরোপে যাত্রা করার হার আবার বেড়ে গেছে। বাড়ছে নৌকাডুবিতে মৃত্যুর সংখ্যাও।
৩১ মে ২০১৬ তারিখে সাগরে শরণার্থীদের সলিল সমাধি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)। সংস্থাটির হিসাবে, চলতি বছর ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে আড়াই হাজারের বেশি মানুষের সলিল সমাধি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সংখ্যাটি অনেক বেশি। ২০১৫ সালের প্রথম পাঁচ মাসে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ১ হাজার ৮৫৫ জন শরণার্থী মারা যায়। ২০১৪ সালের প্রথম পাঁচ মাসে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৫৭।
২০১৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছেছে ২ লাখের বেশি শরণার্থী ও অভিবাসী। ২০১৫ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ৯২ হাজার শরণার্থী সমুদ্রপথে ইউরোপে প্রবেশ করেছিল।
ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র উইলিয়াম স্পিন্ডলার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ২০১৬ সালের শরণার্থী মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, তুরস্ক থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়া যায়। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়া যায়। এর মধ্যে লিবিয়া থেকে ইতালি পথে সাগরযাত্রা বেশি দীর্ঘ। এই পথেই মারা গেছে ২ হাজার ১১৯ জন শরণার্থী। অর্থাৎ এই পথে পাড়ি দেওয়া প্রতি ২৩ জন শরণার্থীর মধ্যে ১ জন নৌকাডুবিতে মারা যাচ্ছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
৩০ মে ২০১৬ তারিখে প্রকাশিত হওয়া আরেকটি শরণার্থী শিশুর মরদেহের মর্মস্পর্শী ছবি আলোড়ন তুলেছে। ভূমধ্যসাগর থেকে তুলে আনা মৃত শিশুর ছবিটি মনে করিয়ে দিচ্ছে তুরস্কের সৈকতে পড়ে থাকা সিরীয় শিশু আয়লান কুর্দির কথা। শিশুটির ছবি প্রকাশ করা জার্মানির মানবিক সহায়তা সংগঠন সি-ওয়াচ বলেছে, শরণার্থীদের প্রতি ইউরোপীয় নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে—এমন আশায় তা প্রকাশ করা হয়েছে। নাম না জানা শিশুটি ভূমধ্যসাগরের লিবিয়া উপকূলে নৌকাডুবির ঘটনায় মারা গিয়েছিল।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০১৫ সালে অধিকতর ভালো জীবনের সন্ধানে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচ হাজারের অধিক নারী, পুরুষ ও শিশু। মানব পাচারকারীদের শিকারে পরিণত হয়েছেন ১০ সহস্রাধিক মানুষ। আর বিদেশি বিদ্বেষী নীতি এবং বিদ্যমান ভয়-আতঙ্কে বলির পাঁঠায় পরিণত হয়েছে ১০ লক্ষাধিক মানুষ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুনিয়াজুড়ে জীবন বাঁচাতে আর মাথা গোঁজার জন্য নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে এত বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর নানা দিকে ছোটাছুটির ঘটনা এর আগে আর ঘটেনি। ২০১৪ সালে যুদ্ধ-দাঙ্গাপীড়িত বা অভাবের তাড়নায় প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ নিজের জন্মভূমি আর ঘরবসত ছেড়ে নানা দেশে পাড়ি দিয়েছিল। সেই ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের একটা বড় অংশই যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার নাগরিক। যুদ্ধাবস্থা থেকে বাঁচতে দলে দলে ভিনদেশের পথে ছুটছেন দেশটির বাসিন্দারা।
২০১৫ সালে ইউরোপের অভিবাসী এবং শরণার্থী–বিষয়ক সংগঠনগুলো মূল সমস্যার পাঁচটি উপাদান চিহ্নিত করেছে। এগুলো হচ্ছে—১. সিরিয়া, ইরাক ও লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধের তীব্রতা আরও বেড়ে যাওয়া, ২. যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে শিগগিরই সমস্যা সমাধানের আশা না থাকা, ৩. প্রতিবেশী দেশগুলোর শরণার্থীদের সমস্যা ও পুনর্বাসনের ব্যাপারে অনীহা, ৪. তুরস্কে বসবাসরত সিরিয়ার শরণার্থীদের যেকোনো সময় ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা, ৫. সাবেক যুগোস্লাভিয়ার বিভক্ত বলকান রাষ্ট্র সার্বিয়া, কসোভো মন্টেনেগ্রো ও মেসিডোনিয়ার মতো দেশগুলোতে অর্থনৈতিক বিপর্যয়।
২০১৫ সালে সমুদ্রে তুরস্ক ও গ্রিসের মাঝামাঝি এলাকায় নিহত হয়েছেন ৭০০-এর বেশি শরণার্থী। এদের মধ্যে অন্তত ১৮৫ জন শিশু। এই শিশুদের অন্তত পাঁচ শতাংশের বয়স দুই বছরের কম। ভাগ্যবিড়ম্বিত এসব শিশুদের অধিকাংশই সিরিয়া, আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে পরিবারের সঙ্গে যাত্রা করেছিল। এদের অধিকাংশের বয়স ১২ বছরের নিচে।
২ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে তুরস্কের উপকূলে সন্ধান মেলে আয়লান নামের এক সিরীয় শিশুর মৃতদেহ। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে নিথর পড়ে থাকা শিশু আয়লান কুর্দির নাম শুনলে এখনও স্তব্ধ হয়ে যান অনেকে। ছোট নৌকায় থাকা আয়লান ও তার ভাই ভেসে যায় তুরস্কের সৈকতে। তাদের মা ভেসে যান দূরের অন্য এক সৈকতে। এখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সপরিবারে সাগরে ভাসছেন হাজার হাজার আয়লান কুর্দি। এই শরণার্থীদের সলিল সমাধি যেন থামছেই না।
সূত্র: ইয়াহু, মিডল ইস্ট আই, বিবিসি, আল জাজিরা।
/এমপি/