পবিত্র ঈদুল আযহার দিনে ঢাকার ‘রক্তাক্ত’ পরিস্থিতি নিয়ে ব্রেকিং সংবাদ পরিবেশন করে বাংলা ট্রিবিউন। ‘পশুর রক্তে একাকার’ শিরোনামের সেই প্রতিবেদনে ওই পরিস্থিতির জন্য পশু কোরবানির ব্যবস্থাপনায় কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাকেই দায়ী করা হয়। পরে এ সংক্রান্ত আরও দুইটি প্রতিবেদনে ঘটনার স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির বিষয়টি তুলে আনে বাংলা ট্রিবিউন। বুধবার (১৪.০৯.২০১৬) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতেও এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে। ঢাকার ‘রক্তনদী’ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ও গার্ডিয়ান, পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, অস্ট্রেলিয়ার এবিসি নিউজ এবং ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইন্ডিয়া টুডে, জিনিউজসহ বেশকিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। ওইসব প্রতিবেদনে ঢাকায় গতকালকের পরিস্থিতির কারণ হিসেবে কর্তৃপক্ষীয় অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়েছে।
‘পশুর রক্তে একাকার’ শিরোনামে গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত বাংলা ট্রিবিউনের ব্রেকিং প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘...ঈদের দিন সকালেই বৃষ্টি নামে মুষলধারে। ভিজে ভিজে জামাতে অংশ নেন মুসল্লিরা। রাজপথ, অলিগলি, এমনকি কোরবানির জন্য রাখা নির্দিষ্ট জায়গাগুলোও বৃষ্টির পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। এর মধ্যেই বৃষ্টিতে ভিজে পশু জবাই করতে হয়েছে। আর পশুর রক্ত বৃষ্টির পানিতে মিশে রাজধানীর কোথাও কোথাও ‘রক্তনদী’র রূপ ধারণ করে। রক্তাক্ত পানিতে সয়লাব হয়ে যায় রাজপথ।’ স্থানীয় অধিবাসীদের বরাত দিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের খবরে এর কারণ হিসেবে স্থায়ী জলাবদ্ধতাকে দায়ী করা হয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরেও ‘ঢাকার রক্তনদী’ সংক্রান্ত বিবরণ হাজির করে এই কারণ অনুসন্ধান করা হয়েছে। ‘ঈদে ঢাকায় রক্তনদী কেন’ শিরোনামের সেই প্রতিবেদনে কয়েকটি ধাপে এ ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা হয়েছে। প্রতিবেদনের প্রথমাংশে ‘কী ঘটেছে’ উপ-শিরোনামে বলা হয়েছে, ঢাকার পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা খুবই দুর্বল হওয়ার কারণে ভারি র্বষণ হলেই ঢাকা স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হয়। বিবিসির প্রতিবেদনের পরবর্তী অংশে মুসলমান সম্প্রদায়ের পশু কোরবানি নিয়ে ধারণা দেওয়া হয়েছে। এরপর, আগে কখনও ঢাকায় এমন রক্তনদী-পরিস্থিতি হয়েছে কিনা তা খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছে বিবিসি। সেই অংশে তারা দেখিয়েছে, বরাবরই ঢাকার রাস্তায় পশু কোরবানি দেওয়ার চল থাকলেও অতীতে কখনও রাস্তাগুলো রক্তনদীদে পরিণত হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিনের বৃষ্টি ঢাকার পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থার ভয়াবহতাকে সামনে এনেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে অভিযুক্ত হয়েছে শহর কর্তৃপক্ষ (সিটি কর্পোরেশন)। সে কারণে প্রতিবেদনের শেষ অংশে এ নিয়ে শহর কর্তৃপক্ষের মতামত প্রকাশ করেছে বিবিসি। তারা দাবি করেছে, আসলে পশু কোরবানির জন্য স্থান নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। শহরবাসী বিবিসিকে জানিয়েছে, এ নিয়ে তেমন কোনও প্রচার-প্রচারণা ছিল না। কেউ কেউ আবার নির্ধারিত স্থান ব্যবহার না করার কারণ হিসেবে বৃষ্টিকেও দায়ী করেছেন। আর ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া পানি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ চলছে।
এদিকে ‘পশু কোরবানির পর ঢাকার রাস্তায় রক্তবন্যা’ শিরোনামে প্রতিবেদন করেছে আরেক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান। তাদের প্রতিবেদনেও ঈদুল আজহার দিনের ওই ঘটনায় পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতা তুলে ধরা হয়েছে।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত খবরকেই হুবহু প্রকাশ করেছে। ‘ঈদের দিনে ঢাকায় রক্তনদী’ শিরোনামের সেই প্রতিবেদনেও একইভাবে দুর্বল পয়নিস্কাশন ব্যবস্থাজরিনত স্থায়ী জলাবদ্ধতাকে দায়ী করা হয়েছে ঈদের দিনে ঢাকার রাস্তা রক্তাক্ত হওয়ার পেছনে। তাদের প্রতিবেদনেও কর্তৃপক্ষীয় অব্যবস্থাপনাই দায়ী হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার এবিসি নিউজ ঢাকা ট্রিবিউন ও প্রথম আলো’কে উদ্ধৃত করে এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ করেছে। তারা অবশ্য কর্তৃপক্ষীয় অসতর্কতার কথা বলেনি। ঢাকাবাসী বৃষ্টির কারণে র্নিধারিত স্থানে গিয়ে পশু কোরবানি দিতে পারেনি বলেই এমন হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে তারা। অতীতের ধারাবাহিকতাতেই এবারও অনির্ধারিত স্থানে পশু কোরবানি দেওয়া হয়েছে। তবে কেন এবার অন্যরকম ঘটনা ঘটলো তা অনুসন্ধান করেনি তারা।
এদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইন্ডিয়া টুডে এবং জি-নিউজসহ আরও বেশকিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ করেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরের শিরোনামই করা হয়েছে এমন ঘটনা কেন ঘটলো সেই প্রশ্ন রেখে। ‘ঢাকার রাস্তা রক্তাক্ত কেন’ শিরোনামের সেই প্রতিবেদনে ঢাকা ট্রিবিউনসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যমকে উদ্ধৃত করে তারার এজন্য কর্তৃপক্ষীয় অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছে। র্নিধারিত স্থানে পশু কোরবানি দেওয়ার জন প্রয়োজনীয় প্রচারণার অভাব এবং ঢাকার স্থায়ী জলাবদ্ধতার সমস্যাকে সামনে এনেছে তারা।
একইভাবে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও শহর কর্তৃপক্ষ তথা ঢাকা সিটি কর্পোরেশন অভিযুক্ত হয়েছে অব্যবস্থার অভিযোগে।
মঙ্গলবার ঈদের দিনে সরেজমিনে পুরনো ঢাকার বকসি বাজার, হোসনি দালাল, যাত্রাবাড়ী, কাঠালবাগান, শান্তিনগর, শান্তিবাগ, মিরপুরের কোনও কোনও সড়কে, মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন স্থানের সড়কে রক্তাক্ত পানির দেখা পান বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদক। এ নিয়ে নগরবাসীও ফেসবুকে বিভিন্ন এলাকার রক্তাক্ত জলাবদ্ধতার ছবি পোস্ট করে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বহীনতার কথা তুলে ধরেন।
ঘটনার স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সংক্রান্ত বাংলা ট্রিবিউনের অপর এক প্রতিবেদেন বলা হয়, এতদিন বিক্ষিপ্তভাবে ছোপ ছোপ রক্ত দুর্গন্ধ ছড়ালেও এবার পানিতে মিশে দূষিত পরিবেশের বিস্তার ঘটিয়েছে। এই রক্ত এখন নতুন আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে রাজধানীতে। প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুরো ঢাকা শহরে এবার কোরবানির আগে-পরে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ কারণে বৃষ্টির পানি রক্তলাল হয়ে গেছে বলে আমরা বিভিন্ন জায়গায় দেখতে পেয়েছি। এই রক্ত অল্প সময়ের মধ্যে পচে যাবে। পচে গেলেই সেখান থেকে জীবাণু জন্ম নেবে। আর এই জীবাণু পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঘটাবে রাজধানীতে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, টাইফয়েড, জন্ডিস, উদারাময় ইত্যাদি।’
ঈদের আগে জোরেসোরে প্রচারণা চালানো হলেও অধিকাংশ ওয়ার্ডের বাসিন্দা সিটি করপোরেশনের পলিব্যাগ পাননি। পলিব্যাগ না পাওয়ার এ অভিযোগ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাসিন্দাদের বেশি। মঙ্গলবার দুপুরে যাত্রাবাড়ী শহীদ ফারুক সড়কের বাসিন্দা আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘কোরবানির বর্জ্য রাখার জন্য আমরা সিটি করপোরেশনের পলিব্যাগ পাইনি। এ কারণে নিজ উদ্যোগে রাস্তার পাশে বর্জ্য স্তূপ করে রাখি। কিন্তু, বৃষ্টির কারণে ওই বর্জ্য গলে ছড়িয়ে গেছে।’
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মঙ্গলবার দুপুর ২টায় কোরবানির বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম শুরু করে। এরপর থেকে পশুর হাটের বর্জ্য অপসারণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি পাড়া-মহল্লার বর্জ্যও অপসারণ কার্যক্রম চলতে থাকে। এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান বর্জ্যব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘নগরবাসীর কাছ থেকে এবার আমরা খুব ভাল রেসপন্স (সাড়া) পেয়েছি। অনেকেই পলিব্যাগে পশুবর্জ্য রাখায় আমাদের কার্যক্রমে সুবিধা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘গতবারের তুলনায় এবার বেশি সংখ্যক গরু কোরবানি হয়েছে। এরপরও আমরা দ্রুত অপসারণ করতে পারছি।’ দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) উপপ্রধান বর্জ্যব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে পশুর বর্জ্য ছড়িয়ে গেছে। এরপরও আমরা এগুলো দ্রুত অপসারণ করছি।’ তিনি বলেন, ‘ঈদের আগে দুই লাখ পলিব্যাগ বিতরণ করা হয়েছে। কোনও কারণে হয়ত দু/একজন পাননি। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তাদের জন্য পলিব্যাগ সরবরাহ করেছি।’
/বিএ/