সরকার-সেনা বৈঠকের তথ্য ফাঁস: চাপের মুখে পাকিস্তানি তথ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ

পারভেজ রশীদসরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যকার একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের অভ্যন্তরীণ খবর ফাঁস করার অভিযোগ ওঠার পর চাপের মুখে পদত্যাগ করলেন পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী পারভেজ রশীদ। জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সামরিক ও সরকারি শীর্ষ নেতৃত্বের তুমুল মতপার্থক্য, বাদানুবাদের খবর প্রথম সারির দৈনিক ‘দি ডন’-এ প্রকাশ করার জেরে এতোদিন চাপের মুখে ছিলেন তিনি। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, স্বাধীন ও বিস্তারিত তদন্তের স্বার্থে তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি ডনের প্রতিবেদনে সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরোধের খবরটি ফাঁস হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, জঙ্গিবাদের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে পাকিস্তান। এজন্য দেশটির বেসামরিক কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে সেনাবাহিনীর প্রতি একটি বার্তা পাঠানো হয়েছে। ওই বার্তায় বলা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, নয়তো আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হবে। তাছাড়া ভারতবিরোধী জঙ্গিদের সরকারিভাবে গ্রেফতারের ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী যেন হস্তক্ষেপ না করে সে ব্যাপারেও সতর্ক করা হয়। ডনে প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর রোষে পড়তে হয় সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক সিরিল আলমেইদাকে। তার নাম তোলা হয় একজিট কন্ট্রোল লিস্টে, যাতে তিনি দেশ ছেড়ে যেতে না পারেন। সরকার-সেনা বৈঠকের এতো গুরুত্বপূর্ণ খবর কে ফাঁস করলো তা নিয়েও উত্তেজনা শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত পারভেজকেই বৈঠকের খবর ফাঁস হওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী করা হচ্ছে। আর সেকারণে তার ওপর পদত্যাগের চাপ শুরু হয়।  
পারভেজ রশীদ (পাঞ্জাবি পরা)
শনিবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ‘তথ্যমন্ত্রীর দিক থেকে তথ্যগোপন রাখার দক্ষতায় ঘাটতি থাকার ব্যাপারে প্রমাণ মিলেছে।'

পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মুসাদিক মালিক জানিয়েছেন, ওই বিতর্কিত খবরের ব্যাপারে তদন্ত এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আর কয়েকদিনের মধ্যেই মিডিয়াকে সব জানানো হবে। ডন-এর রিপোর্টারের হাতে বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ খবর কে তুলে দিয়েছিলেন, কে দায়ী, তা জানা যাবে। তবে সেনা-বিরোধী খবরটি রশিদের সম্মতি ছাড়া বাইরে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না বলে তদন্তে মত প্রকাশ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, পাঠানকোটের সেনাঘাঁটিতে জঙ্গি হামলা এবং পরবর্তীতে হিজবুল নেতা বুরহান ওয়ানিকে কথিত এনকাউন্টারে হত্যার পর থেকেই ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা বাড়তে থাকে। সাম্প্রতিক উরি সেনাঘাঁটিতে জঙ্গি হামলার পর আবারও জয়েশ ই মোহাম্মদের সংশ্লিষ্টতার প্রসঙ্গ তুলে পাকিস্তানকে দায়ী করতে শুরু করে ভারত। পারস্পরিক দোষারোপ এবং এ নিয়ে আন্তর্জাতিক তৎপরতার এক পর্যায়ে ২৮ সেপ্টেম্বর (বুধবার) রাতে নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে ভারতের সেনারা সন্ত্রাসী ঘাঁটিগুলোতে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালানোর দাবি করে। ওই অভিযানে ৯ পাকিস্তানি সেনা ও ৩৫ থেকে ৪০ জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। ঘটনার পর থেকে দুই সেনা সদস্য নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করে পাকিস্তান দাবি করে আসছে এটি সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ছিল না, সীমান্ত সংঘর্ষ বা আন্তঃসীমান্ত গোলাগুলির ঘটনা ছিল। ঘটনাকে ভারতের দিক থেকে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ প্রমাণ করে তাদের সামরিক শক্তি জানান দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের দাবিটি একটি ভ্রম। মিথ্যে প্রভাব তৈরির জন্য ভারতীয়রা ইচ্ছে করে এমনটা করছে। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে ভারতের দাবিকৃত ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ এখন যতোটা না জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সাফল্য-ব্যর্থতার প্রশ্ন,তার থেকেও বেশি করে ভারত ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্ষমতা-আত্মমর্যাদা আর দম্ভের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতি ডনে সেনা-সরকার বৈঠকের খবর ফাঁস হওয়াকে ভালোভাবে নেযনি পাকিস্তান।
/এফইউ/