বিপ্লবী কাস্ত্রো: ইতিহাসের পাতায় বার বারই এসেছে নাম

ফিদেল কাস্ত্রোকিউবার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ওরিয়েন্তে প্রদেশে ১৯২৬ সালে জন্মগ্রহণ করা ফিদেল কাস্ত্রো পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন কিউবার বিপ্লবী নেতা। হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়ার সময় ফিদেল কাস্ত্রো তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। এরপর কিউবার রাজনীতিতে একজন বিখ্যাত ব্যক্তিতে পরিণত হন। প্রায় অর্ধ-শতাব্দী ধরে কিউবা শাসন করেছেন তিনি। যে কিউবা একসময় যুক্তরাষ্ট্রের প্লেগ্রাউন্ড বলে বিবেচিত হতো, যেখানকার দরিদ্ররা সামাজিকভাবে অসমতায় বাস করতো-সেই কিউবাকে রেকর্ড মানবাধিকারের দেশে পরিণত করেছিলেন কাস্ত্রো। কিউবার বিপ্লব ছাড়াও কিছু কিছু ঘটনায় তার নাম বার বারই ঠাঁই পেয়েছে ইতিহাসের পাতায়। তেমনই কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা জেনে নেওয়া যাক-

দীর্ঘদিনের দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা

প্রায় ৫ দশক ধরে কিউবা শাসন করেছেন ফিদেল কাস্ত্রো। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে থাকা বিশ্বনেতাদের নামের তালিকায় তার অবস্থান তৃতীয়। তার আগে নাম রয়েছে ব্রিটিশ রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ এবং থাই রাজা ভূমিবলের। ২০০৬ সালে অন্ত্রে অস্ত্রোপচারের পর সাময়িকভাবে ছোট ভাই রাউল কাস্ত্রোর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তিনি। আর ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন ফিদেল।

ফিদেল কাস্ত্রো

দীর্ঘ ভাষণ

জাতিসংঘে দীর্ঘ ভাষণ দেওয়ারও রেকর্ড রয়েছে ফিদেল কাস্ত্রোর। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ৪ ঘণ্টা ২৯ মিনিট ধরে ভাষণ দিয়েছিলেন তিনি।  ১৯৯৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশের জাতীয় পরিষদ তাকে পরবর্তী ৫ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট পুনর্নির্বাচিত করার পর ৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের ভাষণ দিয়েছিলেন ফিদেল।

১৯৬০-এর দশকে চে গুয়েভারার সঙ্গে কাস্ত্রো
হত্যাচেষ্টা থেকে প্রাণে রক্ষা

কাস্ত্রোর দাবি অনুযায়ী, তিনি ৬৩৪টি হত্যা পরিকল্পনা এবং চেষ্টা থেকে রেহাই পেয়েছেন। এগুলোর বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহিষ্কৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর ষড়যন্ত্র ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।  বিষাক্ত ওষুধ, বিষাক্ত চুরুট কিংবা বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত সাঁতারের পোশাকসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে হত্যাচেষ্টা করা হয়েছিল। আরেকটি পরিকল্পনার অভিযোগ করা হয়ে থাকে। সেটি হলো- ফিদেলকে এমন পাউডার দেওয়া যাতে তার দাড়ি পড়ে গিয়ে জনপ্রিয়তা কমে যায়।

বিভিন্ন হত্যাচেষ্টার পরও নিজের ক্ষমতাকালীন নয়জন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বদল হতে দেখেছেন এ নেতা। ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার থেকে বিল ক্লিনটন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রেসিডেন্টকে দেখেছেন তিনি। জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন ক্ষমতায় তখন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন ফিদেল।

হাভানার প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে কাস্ত্রো (১৯৪৫ সালের ছবি)
চুরুট নিয়ে বক্তব্য

কাস্ত্রো সবসময় কিউবার চুরুট টানতেন। কিন্তু ১৯৮৫ সালে তা ছেড়ে দেন। কয়েক বছর পর ধূমপানের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন- 'সবচেয়ে ভালো হয়, এ চুরুটের বাক্স যদি আপনি আপনার শত্রুকে দিয়ে দেন’।

টাইমের তালিকায় ফিদেল

২০১২ সালে টাইম ম্যাগাজিনের তৈরি সর্বকালের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় ফিদেল কাস্ত্রোকে রাখা হয়েছিল।

ফিদেল-২
স্ত্রী-প্রেমিকা-সন্তান

বলা হয়ে থাকে ব্যক্তিগত জীবনে ৫ জন নারীর সংস্পর্শে এসেছিলেন ফিদেল। তাদের ঘরে ৯ সন্তানের জন্ম হয়। তার বড় ছেলে ফিদেল কাস্ত্রো দিয়াজ-বালার্ট সোভিয়েত প্রশিক্ষিত পরমাণু বিজ্ঞানী। ফিদেলিতো নামেও পরিচিত দিয়াজের জন্ম ১৯৪৯ সালে। ফিদেলের প্রথম স্ত্রী মিরতা বালার্ট-এর গর্ভে জন্ম তার। পরে মিরতা বালার্ট-এর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়। ফিদেলের মেয়ে আলিনা ফার্নান্দেজের জন্ম ১৯৫০-এর দশকে কাস্ত্রো যখন আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলেন তখন তার এক প্রেমিকার গর্ভে জন্ম নেন আলিনা।

১৯৬০ এর দশক থেকে ফিদেলের অঘোষিত স্ত্রী ডালিয়া সটোর ঘরে একে একে জন্ম নেয় ৫ ছেলে। এছাড়া ক্ষমতায় আসার আগে তার আরও দুই প্রেমিকার ঘরে জন্ম নেয় এক ছেলে ও এক মেয়ে।
শেষ দিকের বছরগুলোতে জনসমক্ষে বিরল উপস্থিতি

জীবনের শেষ দিকের বছরগুলোতে জনসমক্ষে খুব কমই এসেছেন ফিদেল। মাঝে মাঝে ভিডিও কিংবা ছবিতে দেখা যেত তিনি অতিথিদের সঙ্গে দেখা করেছেন। অফিসিয়্যাল মিডিয়ায় তিনি শত শত কলাম লিখেছেন। দুর্বল হয়ে পড়া এবং হাঁটতে কষ্ট হওয়া ফিদেলকে ২০১২ সালে দুইবার এবং ২০১৩ সালে দুইবার জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল। ২০১৪ সালের ৮ জানুয়ারি একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্বোধনীতে আবারও তাকে দেখা যায়। গত এপ্রিলে দেশের কমিউনিস্ট পার্টির সমাবেশের শেষ দিনে তার ভাষণটিও তেমনই একটি বিরল ঘটনা ছিল।  সূত্র: রয়টার্স

/এফইউ/