উল্লেখ্য, ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল বিষয়ক পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ওবামা ও ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান একেবারেই পরস্পরের বিপরীত। ওবামা প্রশাসন চায় দুই দেশের মধ্যকার সমস্যার দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান হোক। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন বন্ধের পাশাপাশি ১৯৬৭ সালের প্রস্তাবিত সীমানা অনুযায়ী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষেই ওবামা প্রশাসনের বর্তমান অবস্থান। বিপরীতে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী তারা দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান নীতির বিরোধী। জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা এবং ইসরায়েলে একজন কট্টরপন্থী রাষ্ট্রদূত নিয়োগের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়গুলোতে আদতে আগ্রাসী জায়নবাদী প্রকল্পকেই সমর্থন দিয়ে আসছেন।
গত ২৩ ডিসেম্বর (শুক্রবার) দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙ্গে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলি বসতিবিরোধী প্রস্তাবে ভেটো না দিয়ে নীরব ভূমিকা পালন করে যুক্তরাষ্ট্র। এদিন ভেটো দেওয়ার পরিবর্তে ভোটদান থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেয় ওবামা প্রশাসন। এ ধরনের প্রস্তাব থেকে ইসরায়েরকে বাঁচিয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রথা থেকে সরে আসেন তারা। আর তাতে প্রকট হয় ট্রাম্প-ওবামা দ্বন্দ্ব। ঘটনার পর নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন, তার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। টুইটারে তিনি লিখেছেন, ‘২০ জানুয়ারির পর পরিস্থিতি ভিন্ন হবে।’
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের তেমন কোনও তাৎপর্য নেই। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তত্ত্বগতভাবে ট্রাম্প তা পারেন। রীতি অনুযায়ী এর জন্য ট্রাম্পকে নতুন একটি প্রস্তাব উত্থাপন করতে হবে যা এটিকে পুরোপুরিভাবে পাল্টে দেবে। এরপর ওই প্রস্তাব পাসের জন্য নয়টি দেশের সমর্থন প্রয়োজন হবে।। পাশাপাশি এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে নিরাপত্তা পরিষদের বাকি চার স্থায়ী সদস্য দেশ-রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও চীন যেন ওই প্রস্তাবে ভেটো না দেয়। কাজটা খুব সহজ হবে না বলেই মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের যে বৈশ্বিক অঙ্গীকার রয়েছে, তা ভেস্তে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা হাজির করেছেন আসন্ন মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েল।
পরিস্থিতিকে ইসরায়েলের পক্ষে নেওয়ার স্বার্থে= উপযুক্ত প্রশাসনিক বিন্যাস করে রেখেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইসরায়েলি দূত হিসেবে যাকে মনোনীত করেছেন সেই ডেভিড ফ্রাইডম্যান ‘কট্টরপন্থী’ ঋণখেলাপি আইনজীবী। ফ্রাইডম্যান ইসরায়েলি বসতির ঘোর সমর্থক, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিরোধী এবং ইসরায়েল সরকারের নিরন্তর রক্ষাকবজ বলে বিবেচিত হয়ে আসছেন। এর পাশাপাশি রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম ব্রেইটবার্ট-এর স্টিভ ব্যানন রয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলনির্ধারণী ভূমিকায়। তিনিও কট্টর ইসরায়েলপন্থী। সবমিলে ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে এবং ইসরায়েলের পক্ষে প্রশাসনযন্ত্রকে তৈরি করে রেখেছেন ট্রাম্প।
এদিকে ইসরায়েলর তরফ থেকেও ট্রাম্পের প্রতি নরিঙ্কুশ আস্থার বহিপ্রকাশ দেখা গছে। জাতিসংঘে প্রস্তাব পাশের জন্য প্রথম থেকে ওবামা প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি দোষারোপ করছেন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রের এই ভূমিকার নেপথ্যে এবং ইসরায়েলবিরোধী ওই প্রস্তাব পাসে ব্যক্তি ওবামা কলকাঠি নেড়েছেন, এমন স্পষ্ট প্রমাণ হাজির থাকার কথাও বলছে ইসরায়েল।জাতিসংঘে পাশ হওয়া ওই প্রস্তাবের প্রসঙ্গ ধরে নেতানিয়াহু রবিবার মন্ত্রী পরিষদের এক সভায় বলেন, ‘তারা আমাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিতে চায়।’
ওবামা প্রশাসন যে ফিলিস্তিন প্রশ্নে আরও ইসরায়েলবিরোধী পদক্ষেপ নিতে পারেন, সে সম্পর্কেও আগাম ধারণা করে রেখেছিল তেল আবিব। খোদ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আশঙ্কা করছেন, বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা হয়ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতিও নিরাপত্তা পরিষদে পাশ করিয়ে নিতে পারেন। সোমবার হারেৎজ-কে এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন নিতে পারেন বলে মন্ত্রিপরিষদও আশঙ্কা করছে।
ইসরায়েলের আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণ করে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান বলছে, বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে কেরি যে ভাষণ দেবেন, তাতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রূপরেখা স্পষ্ট হতে পারে। এরপর ১৫ তারিখ প্যারিসে শুরু হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এক শীর্ষ সম্মেলনে সেই রূপরেখার পক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র। গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের আগেই মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চায় ওবামা প্রশাসন। এজন্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রূপরেখা তুলে ধরবে যুক্তরাষ্ট্র। ধারণা করা হচ্ছে, পররাষ্ট্র দফতরে দেওয়া কেরির বুধবারের ভাষণে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ায় দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান প্রক্রিয়ায় ওবামা প্রশাসনের আস্থার বিষয়টি আরও প্রকট হবে। আট বছরের ওবামা প্রশাসনে ইসরায়েলের বিষয়ে এতো শক্ত অবস্থান এর আগে দেখা যায়নি।
কেরির প্রস্তাব গ্রহণ হলে ওবামা প্রশাসন ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ই মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ আসতে পারে। আর তা সমন্বয় করা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে।
কেরির প্রস্তাব গ্রহণ হলে ওবামা প্রশাসন ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ই মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ আসতে পারে। আর তা সমন্বয় করা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনৈতিক রীতি অনুযায়ী, বিদায়ী প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোতে সিদ্দান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমন্বয় করে থাকেন। পরস্পরের বিপরীত অবস্থানে থাকা ওমাবা-ট্রাম্পের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। তাই দুই প্রশাসনের প্রকট হওয়া দ্বন্দ্বের ভবিষ্যত কী, সেটাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
/এফইউ/বিএ/