মিয়ানমার সরকার গত ৯ অক্টোবর মিয়ানমারের মংদোর সীমান্ত চৌকিতে সশস্ত্রদের হামলায় ৯ পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার পর থেকে রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে দেশটির সরকার। শুরু থেকেই নিপীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে দেশটির দ্বি-ফ্যাক্টো ক্ষমতার প্রতিনিধি অং সান সু চির সরকার এবং সেনাবাহিনী। জাতিসংঘ রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ এবং জাতিগত নির্মুল প্রক্রিয়া পরিচালনার অভিযোগ তুললেও ক্ষমতাসীন সরকারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চি সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। সু চির দাবি, মিয়ানমারে যা ঘটছে তা নিয়ে অতিরঞ্জন হচ্ছে। মিয়ানমার সরকার দাবি করছিল, রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনী আইন মেনেই কাজ করছে। তবে এবার খোদ একজন পুলিশ সদস্যের ধারণকৃত ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর টনক নড়েছে মিয়ানমারের।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পুলিশি নির্যাতনের ভিডিওটি গত নভেম্বরের। মংদোতে পুলিশের অভিযান চলার সময় ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছিল। এক পুলিশ কর্মকর্তাই ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন। ভিডিওতে দেখা গেছে একটা বিশাল সংখ্যক গ্রামবাসী পুলিশ কর্মকর্তাদের সামনে সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন। আরও দেখা গেছে এক পুলিশ কর্মকর্তা এক ব্যক্তিকে মারধর করছেন, আর আরেকজন তার মুখে লাথি দিচ্ছেন। এরপর অন্য লোকদেরও লাথি দিতে থাকেন তারা। যে পুলিশ কর্মকর্তা ভিডিওটি ধারণ করেছেন, তিনি তা কবে কীভাবে করেছেন তা জানাতে পারেনি কোনও সংবাদমাধ্যম। ভিডিওটি ধারণ করে তিনি রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়েছেন কিনা, তাও জানা যায়নি। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, যেসব কর্মকর্তা পুলিশ বাহিনীর আইন লঙ্ঘন করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে সাংবাদিক ও তদন্তকারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ায় স্বাধীনভাবে নিপীড়নের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা যাবে কিনা, তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের অক্টোবর মাসের ৯ তারিখে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ এলাকায় সন্ত্রাসীদের সমন্বিত হামলায় ৯ পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার পর তার দায় চাপানো হয় রোহিঙ্গাদের ওপর। আর তখন থেকেই শুরু হয় সেনাবাহিনীর দমন প্রক্রিয়া।জাতিসংঘের মতে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের রাখাইন রাজ্যে মৃতের সংখ্যা ৮৬ জন। এখন পর্যন্ত ঘরহারা হয়েছেন ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ। পালাতে গিয়েও গুলি খেয়ে মরতে হচ্ছে তাদের। মিয়ানমারে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাস করে। কিন্তু, সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধরা তাদেরকে দেশটির নাগরিক হিসেবে স্বীকার তো করেই না বরং এসব রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে দাবি করে থাকে। রাখাইন রাজ্যে এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টির পরেও চলমান দমন প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকার করে দায় এড়াতে চাইছে দেশটির সরকার। রোহিঙ্গারা নিজেরাই নিজেদের বাড়িঘর পোড়াচ্ছে বলেও দাবি করছে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিশ্চিত করেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবেই চেনে। জাতিসংঘের অবস্থানও আলাদা নয়।
/এফইউ/বিএ/