বৈষম্যবিরোধী আন্তর্জাতিক সম্মিলন

পরিবর্তন আনতে এক হয়েছেন নারীরা

সম অধিকারের দাবিতে বিক্ষোভ

বৈষম্যবিরোধী সম্মিলনের ডাক দিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নারীরা। থাইল্যান্ড থেকে শুরু করে পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ট্রেলিয়া কিংবা ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, জাপান- নারীর সম্মিলিত কণ্ঠস্বর শুনতে যেন পুরো পৃথিবীই কান পেতেছে। বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে এই আন্দোলন শুরু হয়েছে। কয়েকটি দেশে কর্মসূচি শেষও হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টিটিভের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা স্থানীয় সময় বুধবার দুপুরে ওয়াক আউট করার পরিকল্পনা করেছেন বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান। 

১৮ শতকের মার্কিন নারী শ্রমিকদের ঐতিহাসিক উদ্যোগের পরম্পরায় আজও বন্ধুর পথে হেঁটে চলেছেন নারীরা। প্রতিবাদ-প্রতিরোধে প্রতিটি দিন নারীর প্রতি সহিষ্ণু করে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা। তবু একুশ শতকের এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগে এসেও অর্জন খুব সামান্য। বন্ধ হয়নি যৌন সহিংসতা। অন্ধকার আর রাতের পৃথিবীতে এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি তাদের অধিকার। অনেক স্থানেই কমানো যায়নি মাতৃমৃত্যুর হার। সভ্য জাতি হিসেবে নিজেদের সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে মনে করলেও যুক্তরাষ্ট্রে রাতে কোনও কারণে বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ হয়ে গেলেই বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ইউরোপের বর্ষবরণের রাত যেন অন্ধকার বিভীষিকা হয়েই নামে তাদের জন্য। আমাদের প্রাচ্যের বাস্তবতাও আলাদা নয়। আর নারীর প্রতি আধিপত্য আর সহিংসতার ভিত্তিভূমি যেখানে সেই মজুরি বৈষম্য নিরসনে আজও তেমন অগ্রগতি হয়নি।

ল্যাম্প পোস্টে ক্রস এঁকে নিহত ও নিখোঁজ নারীদের স্মরণ করছে মেক্সিকোর নারীরা

গত নভেম্বরে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ সম্পদশালী ৪৯টি দেশের মধ্যে ৪টি দেশে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্যের পরিমাণ ৮০ শতাংশেরও বেশি। এর মধ্যে ১৬ টি দেশে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ, ২৩ টি দেশে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ।এই বৈষম্য পুরোপুরি নিরসন করতে অন্তত ১৭০ বছর সময় দরকার হবে।

এই যখন বাস্তবতা, তখন বিশ্বজুড়ে নারীরা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আর জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী নির্বিশেষে লৈঙ্গিক সমতার জন্য জেগে উঠেছে নারীর কণ্ঠস্বর। যুক্তরাষ্ট্রে আজ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন বিশ্বের ৫০ টিরও বেশি দেশের নারী শ্রমিকরা। ১৮ শতকের ইতিহাস যেন প্রত্যাবর্তন করেছে ২১ শতকে। সেই সময় সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা যেভাবে রাস্তায় নেমে প্রতিরোধ গড়েছিলেন, সেভাবেই রাস্তায় নামছেন লাখো নারী। সারাবিশ্বে এ আন্তর্জাতিক নারী ধর্মঘট চলবে।

নারী দিবস

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ও ওয়াশিংটন ডিসিতে বড় জমায়েত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। নর্থ ক্যারোলিনা ও ভার্জিনিয়ার দুটি ডিস্ট্রিক্টের শিক্ষকরা কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন। সে কারণে স্কুল বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে। আলেক্সান্দ্রিয়ায় ৩০০ কর্মী সাপ্তাহিক ছুটি চেয়েছেন।  বুধবার ব্রিটেনের নারীরাও প্রতিবাদমুখর রয়েছেন। ‘নারীবিহীন একদিন’ আন্দোলনের আয়োজকরা নারীদের শ্রমবিরতি পালন করার আহ্বান জানিয়েছেন। লন্ডনে হলবর্নের পারিবারিক আদালতের সামনে সকালে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে।

আর্জেন্টিনায় গত বছর মার ডেল প্লাটায় ১৬ বছর বয়সী এক নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর জাতীয়ভাবে তুমুল বিক্ষোভ হয়েছিল। সেখানে বড় ধরনের সমাবেশ হতে পারে। পেরুতে ১০টি অঞ্চলে বিক্ষোভ হওয়ার কথা। ব্রাজিলে ৭০টিরও বেশি শহরে বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছে। ঘরবাড়ি এবং কর্মস্থল- সবখানেই এক ঘণ্টার কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সংহতি প্রকাশে সমর্থকদের বেগুনি রঙ-এর পোশাক পরার আহ্বান জানানো হয়েছে। আফগানিস্তানে প্রথমবারের মতো নারী সাংবাদিকদের জন্য একটি সুরক্ষা কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, বৈষম্যেবিরোধী ধর্মঘটের মাধ্যমে সমতা প্রতিষ্ঠার যে আহ্বান জানানো হয়েছে, এর মধ্য দিয়ে এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবস অনন্য রাজনৈতিক উপলব্ধি তৈরি করেছে। বিশ্ব-ইতিহাসের রাজনৈতিক পরম্পরায় এক গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে দেখা হচ্ছে এবার।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস

এবারের নারী দিবসের থিম ‘বি বোল্ড ফর চেইঞ্জ’ অর্থাৎ ‘পরিবর্তন আনতে সোচ্চার হও’।  এই প্রেরণাতেই পোল্যান্ডে ধর্মঘটের আয়োজক ক্লিমেন্তিনা সুচানো সেখানে আন্তর্জাতিক নারী ধর্মঘটের ডাক দেন। আয়োজক ক্লিমেন্তিনা বলেন, ‘আমরা বিশ্বমানুষ, আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে সর্বত্র আছি।’ তার মতে, এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখা নারীর কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতে সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ তৈরি হবে। ক্লিমেন্তিনা বলেন, ‘আমরা বিশ্বের নারীদের এক বাহিনী এবং আমরা আর আমাদের কথা শুনতে বলব না। আমাদের কথা শুনতে বিশ্বকে বাধ্য করা হবে।’

ইন্টারন্যাশনাল উইমেন’স স্ট্রাইকের আয়োজকদের পক্ষ থেকে নারীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, তারা যেন নারী দিবসের দিনে স্থানীয় নারীবিদ্বেষীদের বর্জন করে। শপিং বন্ধ রাখে, যৌনসম্পর্ক থেকে বিরত থাকে, রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেয় এবং মিছিলে অংশ নেয়। এই মুভমেন্টের সদস্যরা আবার যুক্ত হয়েছেন উইমেন’স মার্চ-এর সমন্বয়কারী এবং শত শত মানবাধিকার ও নারী আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পরদিন থেকে উইমেন’স মার্চ নামে আন্দোলন চলছে। বিশ্বের ২০ লাখ মানুষ সমতা প্রতিষ্ঠার দাবিতে ওই মার্চ করেছিলেন।

১৮৫২ সালে মার্কিন শ্রমজীবীদের নারী প্রতিনিধি সুসান অ্যান্থনির নেতৃত্বে যে অধিকার আন্দোলনের সূচনা হয়, ১৮৬৮ সালে তা মজুরি বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারপর কেটে গেছে প্রায় দেড়শ বছর। বৈষম্য কিছুটা কমলেও শেষ হয়ে যায়নি, বরং ভয়াবহভাবে সেই বৈষম্য দৃশ্যমান।

/বিএ/জেডআর/