আবারও ‘রোহিঙ্গা পরিচয়’ অস্বীকার করলেন সু চি

অং সান সু চিসীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মুসলমানরা দেশে ফিরতে চাইলে তাদের ‘স্বাগত’ জানাবে মিয়ানমার; দাবি করেছেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চি। তবে গণতান্ত্রিক মিয়ানমারের পক্ষে একদা সরব এই নেত্রী রাখাইন প্রদেশে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, মিয়ানমারে রাখাইন বৌদ্ধ ও মুসলিমদের মধ্যে ঐতিহাসিক সংঘর্ষ চলমান। এখানে নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীকে দমন করার চেষ্টা হয়নি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন মিয়ানমারের সেনা-গণতান্ত্রিক ডি-ফ্যাক্টো সরকারের এই শীর্ষ ব্যক্তি। তবে বরাবরের মতোই ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি এড়িয়ে গেছেন তিনি। অস্বীকার করেছেন তাদের জাতিগত পরিচয়। রোহিঙ্গাদের কেবল ধর্মীয়ভাবে ‘মুসলিম’ পরিচয়ে পরিচিত করেছেন তিনি।

রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে গত শতকের ৮০ এর দশক থেকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শিরণার্থী মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের মিয়ানমারের নাগরিক বললেও মিয়ানমারের পক্ষ থেকে কার্যত কোনওদিনই তা স্বীকার করা হয়নি। তাদের ফিরিয়ে নিতে বার বার আহ্বান জানানো হলেও মিয়ানমারের সাড়া পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে গতবছর অক্টোবরে চেকপোস্টে হামলায় ৯ সীমান্ত পুলিশ নিহত হওয়ার পর দেশটির সেনাবাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী পুলিশ একযোগে রোহিঙ্গা দমনে অভিযান শুরু করে। সে সময় নতুন করে আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

রোহিঙ্গা নাগরিকত্বের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী বিক্ষোভ

বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সু চি কৌশলে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি এড়িয়ে যান। বাংলাদেশে আশ্রিত ওই মানুষদের জাতিগত পরিচয় অস্বীকার করেন তিনি। সাক্ষাৎকারে সু চি তাদের শুধুই ধর্মীয় মুসলমান পরিচয়ে পরিচিত করার চেষ্টা করেছেন তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।  সু চি  বলেন, ‘তারা যদি ফিরে আসে, নিরাপত্তা পাবে। অনেকে ফিরেও এসেছে। এখন সিদ্ধান্ত তাদের।’ সু চি বলেন, ‘আমরা তাদের স্বাগত জানাই, তারা ফিরে এলে আমরা স্বাগত জানাব।’

মিয়ানমার রাষ্ট্রের মতো করেই খোদ রোহিঙ্গা শব্দটিই স্বীকার করেন না সু চি। কিছুদিন আগে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা এমন কোনও শব্দ ব্যবহার করতে চাই না যা আগুনে জ্বালানি সরবরাহ করে। আমি কোনও নির্দিষ্ট শব্দের কথা বলতে চাচ্ছি না। আমি সেই সব শব্দের ব্যবহারের কথা বলছি যেগুলো রাখাইনসহ অন্যান্য অঞ্চলে বিভেদ সৃষ্টি করে।’

সাক্ষাৎকারে রাখাইন অঞ্চলের সমস্যা ও সংঘর্ষের কথা স্বীকার করলেও একে ‘জাতিগত নিধন প্রক্রিয়া’ বলতে নারাজ সু চি। বহু বছর ধরে গৃহবন্দি থাকার পর রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো এই নেত্রী বিবিসির বিশেষ প্রতিনিধি ফারজেল কিয়েনকে বলেন, ‘আমি মনে করি না সেখানে কোনো ধরনের জাতিগত নির্মূল অভিযান চলছে। সেখানে যা হচ্ছে তাকে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বললে অনেক বেশি বলা হবে’।

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শিশু

সু চি বলেন, “সেখানে বহুমাত্রিক সংঘাত চলছে। এমনকি মুসলমানরাও অন্য মুসলিমানদের মারছে- যদি তারা মনে করে যে ওই মুসলমান কর্তৃপক্ষকে সাহায্য করছে। আপনি যেভাবে বলছেন, সেভাবে সেখানে জাতিগত দমনাভিযান চলছে না; এ বিষয়টি আসলে দুই পক্ষের বিবাদ, আর আমরা সেই বিরোধ মেটাতে চাই।”

সাক্ষাৎকারে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা হত্যা-ধর্ষণ-ঘর বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন সু চি।

উল্লেখ্য, সবশেষ জাতিসংঘ সম্মেলনেও তাই রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেননি সু চি। তবে রোহিঙ্গা প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে মিয়ানমারের নেতা বলেছিলেন, ‘আমরা সকল পক্ষের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি টেকসই সমাধানের জন্য কাজ করছি। আমাদের সরকার উন্নয়নের লক্ষ্যে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।’

/বিএ/