সদ্য প্রয়াত চীনা লেখক, সরকারের সমালোচক ও গণতন্ত্রপন্থি মানবাধিকারকর্মী লিউ জিয়াওবোর মৃত্যুর জন্য দেশটির সরকারকে দায়ী করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে বেইজিং। এ ঘটনাকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ উল্লেখ করে চীনা সরকার বলেছে এ ব্যাপারে আজেবাজে মন্তব্য করার অধিকার অন্য দেশগুলোর নেই।
বৃহস্পতিবার (১৩ জুলাই) চীনের একটি হাসপাতালে ৬১ বছর বয়সী লিউ জিয়াওবোর জীবনাবসান হয়। চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শেনইয়াং নগরীর সরকার তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। জিয়াওবো লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। শেনইয়াংয়ের ‘ব্যুরো অব জাস্টিস’ তাদের ওয়েবসাইটে এক বিবৃতিতে বলেছে, জিয়াওবোর কয়েকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে পড়েছিল। সেকারণে তাকে আর বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।
লিওকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে বেশ কিছুদিন চীনা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিল পশ্চিমা দেশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। চীন সরকার দাবি করছিল,লিও জিয়াওবোর শারীরিক অবস্থা বিদেশে যাওয়ার অনুকূল নয়। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির বিশেষজ্ঞরা জিয়াওবোকে পরীক্ষা করার পর জানান,এ লেখক বিদেশে যাওয়ার মতো অবস্থায় আছেন। আর তার পর মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠে। কিন্তু সে দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে লিও জিয়াওবোকে দেশেই রেখে দেওয়ায় তার মৃত্যুর পর তোপের মুখে পড়েছে চীনা সরকার।
সে সমালোচনার মধ্যে শুক্রবার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা শিনহুয়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সে বক্তব্যটি প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়: “লিও জিয়াওবোকে সামলানোর বিষয়টি চীনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এ ব্যাপারে অন্য দেশগুলো ভ্রান্ত মন্তব্য করতে পারে না।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং আরও দাবি করেন, ‘লিউ জিয়াওবোর চিকিৎসার জন্য চীনের মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে।”
চীনে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য কাজ করে যাওয়া লিউ ২০১০ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। চীনে আমূল রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে অন্যান্য অধিকারকর্মীদের সঙ্গে ‘চার্টার ৮’ শীর্ষক একটি পিটিশন সই করেছিলেন লিউ। চীনে একদলীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসনের সূচনার আহ্বান জানানো হয়েছিল ওই চার্টারে। ২০০৯ সালে রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উস্কে দেওয়ার অভিযোগে তাকে ১১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল চীন সরকার। গত মাসে কারাগার থেকে শেনইয়াং এর একটি হাসপাতালে তাকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।
লিউ জিয়াওবোর প্রয়াণকে ‘অকাল মৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ নোবেল কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়, চীনের পক্ষ থেকে এ লেখককে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার অনুমতি না দেওয়ার ব্যাপারটি ‘গভীর উদ্বেগের’।
এক বিবৃতিতে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিগমার গ্যাব্রিয়েল বলেন, ‘কেন আরও আগে লিউ জিয়াওবোর ক্যান্সার শনাক্ত করা যায়নি তা নিয়ে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং যৌক্তিকভাবে উত্তর দেওয়া এখন চীনের দায়িত্ব।’
বিবৃতিতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন বলেন: “লিউ জিয়াওবোকে বিদেশে নিজের চিকিৎসা করানোর সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু চীনা কর্তৃপক্ষ বার বার তা অস্বীকার করেছেন। এ সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। আমি এখন তাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি যেন লিউ জিয়াওবোর স্ত্রীকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।”
/এফইউ/