ত্রাণের জন্য ছুটছে রোহিঙ্গা শিশুরাও

 

nonameকক্সবাজারের বালুখালীর অস্থায়ী রোহিঙ্গা শিবিরের সামনে যেন রীতিমতো লড়াই করছেন শত শত মানুষ। গোড়ালি পর্যন্ত কাদা নিয়ে তারা ছুটছেন ত্রাণবাহী একটি ট্রাকের পেছনে। সেই একটি খোলা ট্রাক থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে নির্যাতিত এ জনগোষ্ঠীর মানুষদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সামগ্রী ছুড়ে দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবকরা। এসব ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ছোট চালের ব্যাগ আর ছেলে ও মেয়েদের নতুন-পুরনো নানা পোশাক। তীব্র বৃষ্টির মধ্যেই সামান্য ত্রাণের আশায় ট্রাকটির পিছু নিচ্ছে রোহিঙ্গারা। ছুড়ে দেওয়া সামগ্রীর মধ্যে যার হাতে যেটা পড়ে বা যে যতুটুকু নিতে পারে। আর এসব কুড়িয়ে নিতে সেখানে জড়ো হওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে রয়েছে বয়স্করা থেকে শুরু করে ৫ থেকে ৬ বছরের শিশুরাও।

ট্রাক থেকে ছুড়ে দেওয়া তুলনামূলক বড় সাইজের এক জোড়া জিন্স প্যান্ট নিতে যেন রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয় তাকে। কিন্তু তার আগেই সেটি তুলে নেয় অপেক্ষাকৃত অধিক বয়সী আরেক রোহিঙ্গা বালক।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা আইওএম-এর হিসাবে, সেই থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক মাস তিন দিনে ৫ লাখ ১ হাজার ৮০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সরকারের জাতিগত নিধনযজ্ঞের ফলে শরণার্থী হওয়া মানুষের সংখ্যা গৃহযুদ্ধকবলিত সিরীয় শরণার্থীদের সংখ্যাকেও অতিক্রম করেছে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং দেশটির উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের হাত থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের একটা বড় অংশেরই ঠাঁই হয়েছে বালুখালী ক্যাম্পে। সেখানে এরইমধ্যে বসবাস করছেন দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও তুরস্কের মতো দেশগুলো মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞের কঠোর সমালোচনা করেছে। এ ঘটনায় দেশটির সেনাকর্মকর্তাদের শাস্তি দাবির বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে সরাসরি মিয়ানমারের পক্ষ নিয়েছে আঞ্চলিক দুই প্রভাবশালী দেশ চীন ও ভারত। চীনের পক্ষ থেকে এমনকি মিয়ানমার সরকারের পাশে থাকতেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

noname

জীবন বাঁচাতে মবাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জীবনযাপনের চিত্রটা আসলে কেমন? তাদের আবাসস্থলগুলো আসলে বাঁশ আর তেরপলের তৈরি একটি কাঠামোর চেয়ে বেশি কিছু নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কিভাবে কাদার মধ্যেই সামান্য খাবার আর পোশাক খুঁজছিল ছোট্ট শিশুরা। এখন এই শিশুদের মধ্যে কলেরা ও যক্ষ্মার মতো রোগের সংক্রমণের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা শিশু রোজিনা আক্তারের বয়স এখনও ১০ বছর পেরোয়নি। বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের দক্ষিণে চিতলক্ষ্যা গ্রামে। বাবা আব্দুস সালাম ছিলেন একজন দিনমজুর, মা গৃহিনী। মিয়ানমারের সেনারা তাদের ধরে নিয়ে যায়। প্রাণের ভয়ে ছয় বছরের বোন ও তিন বছরের ভাইকে সঙ্গে নিয়ে এক সপ্তাহ আগে নাইক্ষ্যংদিয়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সে। উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঠাঁই হয়েছে তার। তবে এখন খাবারের জন্য, একটু মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্য কোথায় যেতে হবে, কার কাছে বলতে হবে তার কিছুই বুঝতে পারছে না অভিভাবকহারা এই তিন শিশু। খাদ্যের জন্যই হন্যে হয়ে ঘুরতে হচ্ছে তাদের।

যে ত্রাণগুলো গাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে তাও তারা পাচ্ছে না। কারণ কোলে ছোট ভাই, আরেক হাতে ধরা ছোট বোন। ‘ত্রাণ পেতে গেলে তো প্রতিযোগিতায় ঠিকে থাকতে হবে’ বলে রোজিনা। সে জানায়, ছোট ভাই ইউনুস (৩) ও ছয় বছরের বোন জান্নাত আরা রয়েছে তার সঙ্গে। উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে ঠাঁই হলেও পেঠের ক্ষুধায় চলে এসেছে বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। খাবারের আশায় ছুটছে ক্যাম্পের এদিক-ওদিক।

শিশুরাই শুধু নয়; অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছেন রাষ্ট্রহীন এ জনগোষ্ঠীর লাখ লাখ মানুষ। বিপুল সংখ্যক মানুষের ব্যবহারের জন্য কোনও টয়লেট নেই। বাধ্য হয়ে এ কাজে সংলগ্ন বনজঙ্গল ব্যবহার করতে হচ্ছে তাদের। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনযজ্ঞ শুরু হওয়ার এক মাসেরও বেশি সময় পর এখনও পরিস্থিতি মোকাবিলায় ত্রাণ সংস্থাগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন 'ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস'-এর মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি ম্যানেজার কেট হোয়াইট। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা যে মাত্রায় দুর্দশার শিকার হচ্ছে সেটা অকল্পনীয়। ছোট্ট এক টুকরো জায়গায় সবাইকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, সেখানে কোনও রাস্তাঘাট নেই। এ অবস্থার মধ্যেই ব্যাপক বৃষ্টিতে আমাদের সরঞ্জাম বহন করছি।

বালুখালীতে ত্রাণকার্য পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের একজন আবুল হোসেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের এই দুঃসময়ে আমরা ঘরে বসে থাকতে পারি না। গত সপ্তাহে গ্রামের সবাইকে সাহায্য করতে বলেছিলাম। রাতে সংগৃহীত সবকিছু নিয়ে এখানে এসেছি।

আবুল হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা, এই মানুষগুলো একদিন নিজেদের ঘরবাড়িতে ফিরে যাবেন। কিন্তু এখন আমাদের তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তারা আমাদের ভাই-বোন।’

খাবার সংকটে ব্যাহত হচ্ছে বাংলাদেশের রোহিঙ্গাদের ডিজিটাল নিবন্ধন কার্যক্রম। নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রাজু নামে এক তরুণ বলেন, ‘অনুপ্রবেশের পর রোহিঙ্গারা প্রথমে থাকার জন্য একটি আশ্রয় তৈরি করে। তারপর থেকে প্রতিদিনই তাদের দুবেলা খাবারের জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। ত্রাণ সহায়তা না পেলে থাকতে হয় অনাহারে। এই অবস্থায় মানুষ খাবারের জন্য দৌড়াবে নাকি নাম নিবন্ধন করতে যাবে?’ সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, আল জাজিরা, বিবিসি।