রাখাইনের বুথিয়াডাউং এলাকার সাবেক বাসিন্দা মোহাম্মদ রশিদ বলেন, আমাদের কোনও প্রশিক্ষণ নেই, অস্ত্র নেই।
২৫ আগস্ট মিয়ানমারের পুলিশ ফাঁড়িতে হামলায় অংশ নেওয়া রশিদের মতো অনেকেই আশাহীন, ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের চিত্র তুলে ধরেছে। একে-৪৭ রাইফেলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তারা লাঠি ও ছুরি দিয়ে হামলা চালায়। তাদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের জুন মাসে কয়েকশ মানুষ আরসা’য় যোগ দেয়। সদস্য হওয়ার জন্য বিশেষ কিছু তাদের করতে হয় না। একটি ছুরি ও জনপ্রিয় মোবাইল মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপে সংগঠনের নেতার কাছ থেকে একটি বার্তা।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া এই সংগঠনের ছয়জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে ১০ থেকে ১২ জনের সাক্ষাৎকার নেয় সংবাদমাধ্যমটি।
২০১৬ সালে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশের মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসে আরসা। ওই বার্তায় সংগঠনটির নেতা আতা উল্লাহ দাবি করেন, তারা রোহিঙ্গাদের অধিকারের জন্য লড়াই করছে। যে রোহিঙ্গারা বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে রাষ্ট্রহীন সংখ্যালঘু হিসেবে বাস করছে। মিয়ানমার আরসা’কে একটি উগ্র ইসলামপন্থী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সরকারের দাবি, আরসা রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে ইসলামি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়।
আগস্টের হামলার পর রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ব্যাপক দুর্ভোগের মুখে পড়ে। বাংলাদেশে নোংরা শরণার্থী শিবিরে আটকা পড়লেও প্রায় সব আরসা সদস্যই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। পালিয়ে আসা অনেক রোহিঙ্গাও বিদ্রোহীদের সমর্থনের কথা জানিয়েছে। তবে কিছু রোহিঙ্গা তাদের দুর্দশার জন্য আরসাকেই দায়ী করেছে।
মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী অং সান সু চি’র মুখপাত্র জাউ থায় জানান, আরসা অনেক মুসলমানকেও হত্যা করেছে। সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য তারা মুসলমানদেরও হত্যা করে। যাতে করে লোকজন ভয়ে তাদের সমর্থন করে। গোয়েন্দা তথ্যে দেখা গেছে, ধর্মীয় নেতারা সংগঠনটির সদস্য সংগ্রহ করছে।
আরসা বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। সংগঠনটি ইতোপূর্বে রয়টার্স’কে বলেছে, আমরা কোনও বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যব্স্তুতে পরিণত না করার নীতিতে অটল রয়েছি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সহিংসতার কারণে আরসা সদস্য ও সমর্থকরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। রোহিঙ্গা যারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে এবং যারা এখনও মিয়ানমারে রয়েছে তারা মনে করতে পারে, তাদের এখন আর হারানোর কিছু নেই।
ইয়াঙ্গুনভিত্তিক বিশ্লেষক ও সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা রিচার্ড হর্সে বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সমাজের মানুষের বেপরোয়া মনোভাব আরসা’র মতো সংগঠনের জন্য উর্বর ভিত্তি তৈরি করে। আন্তর্জাতিক ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলোও এই বেপরোয়া পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে রোহিঙ্গাদের জঙ্গি কর্মকাণ্ডের জন্য সংগ্রহ করতে পারে। গত মাসে আল কায়েদা রোহিঙ্গাদের সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছিল।
রয়টার্সের সাক্ষাৎকারে আরসা সদস্যদের দেওয়া বক্তব্যের সতত্য অন্য কোনও সূত্র থেকে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে সাধারণভাবে আরসা সদস্যদের বক্তব্যের ধরন ছিল কাছাকাছি।
রাথেডাউং এলাকার একটি গ্রামের বাসিন্দা ৩৫ বছরের কামাল হোসেন। চলতি বছরের জুন মাসে সে আরসায় যোগ দেয়। সে জানায়, হামলা চালানো ছাড়া আমাদের কোনও উপায় ছিল না। কারণ দিনের পর দিন আমাদের ভাই-বোনদের হত্যা করা হচ্ছে। আমাদের বার বার হামলা করা উচিত। সুযোগ পেলে আমি ফিরে যাব এবং লড়াই করব।
পুরনোদের মতোই আরসায় যোগ দেওয়া নতুন সদস্যদেরও সামান্যতম প্রশিক্ষণ নেই। এমনকি সংগঠনের নেতার সঙ্গেও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাওয়া ছাড়া কোনও যোগাযোগ নেই। তবে হামলার আগে তাদের হাতবোমা সরবরাহ করা হয়েছিল।
আরেক আরসা সদস্যের বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছেন তার গ্রামের দুই বয়স্ক ব্যক্তি। ওই সদস্য জানায়, তিন মাস আগে মুই লাট গ্রামের প্রায় ৬০ জন আরসায় যোগ দিয়েছে।
২৬ বছরের এই আরসা সদস্য বাংলাদেশে গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কায় নাম প্রকাশে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সে জানায়, ২৫ আগস্ট হামলা চালানো ২০০ জনের একজন ছিল সে। তার ভাষায়, আমাদের কাছে ছিল শুধু ছুরি আর লাঠি, কোনও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না। তারা বলেছিল একে-৪৭ রাইফেল দেওয়ার কথা। কিন্তু আমরা কিছুই পাইনি। বিস্ফোরক যা দেওয়া হয়েছিল তা কাজ করেনি। পুরো দলের জন্য মাত্র দুটি বিস্ফোরক দেওয়া হয়েছিল। আমরা যখন তা ছুড়ে মারি তখন কিছুই হয়নি।
হামলা চালাতে গিয়ে আরসা’র ৪০ সদস্য নিহত হয়েছিল জানিয়ে সে জানায়, যদি আবার হামলার ডাক দেওয়া হয় সে তাতে অংশগ্রহণ করবে। তরা ভাষায়, আমি এখনও আরসাকে সমর্থন করি। যদি নেতারা ডাকেন তাহলে আবার লড়াই করব।
গ্রাম পর্যায়ের দুই কমান্ডারের মতে, যে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যোগাযোগ করা হয় তা নেতা ও কয়েকজন সদস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিদেশ থেকে বড় ধরনের একটি দল আরসা ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমর্থন আদায়ে কাজ করছে।
২৬ বছরের ওই সদস্যের চাচা শকেত উল্লাহ মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের বার্তা দেখায়। ওই গ্রুপটির নাম আরসা ডট জি ওয়ান। সৌদি আরবের একটি ফোন নম্বর গ্রুপটির অ্যাডমিন। এই গ্রুপে আরসা’র সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংসতার ভিডিও এবং রোহিঙ্গাদের সমর্থনে বিভিন্ন বার্তা শেয়ার করা হয়।
শকেত উল্লাহ আরসার আরেকটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ দেখায়। ওই গ্রুপটির নাম ‘রোহিঙ্গা দেশ আরাকান’। এই গ্রুপটি মালয়েশিয়ার একটি নম্বর দিয়ে খোলা হয়েছে। সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বাস করে।
মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের হলেও এক দশকের মধ্যে আগস্টের হামলাটি ছিল বড় ধরনের সশস্ত্র প্রতিরোধ। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনেকেই আরসার পক্ষে সমর্থন জানাচ্ছে।
৪৫ বছরের শাফি রহমান জানায়, যা ঘটেছে তাতে হতাশ ও অনুতপ্ত আমি। তবে তা মিয়ানমার সরকারের পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে। আরসা হামলা না করলেও তারা (সেনাবাহিনী) যে কোনওভাবে এমনটি করত।
একাধিক রোহিঙ্গা জানিয়েছে, লোকজন গরু, সবজি ও ধান বিক্রি করে আরসার জন্য তহবিল সংগ্রহ করছে। তবে সবাই আরসাকে সমর্থন করছে না। কামাল হোসেন যখন জানায় যে আরসার লড়াই চালিয়ে যাওয়া উচিত তখন পাশে বসা আরেক বয়স্ক রোহিঙ্গা তাকে থামিয়ে দেয়। ওই বয়স্ক ব্যক্তির ভাষায়, আমরা সবকিছু হারিয়েছি। সহিংসতা এর জবাব নয়।
আরসা সদস্যরা নিশ্চিত নয় কিভাবে তারা পুনরায় সংগঠিত হবে। তিন সদস্য রয়টার্সকে জানায়, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পাল্টা হামলার ধরন ও ব্যাপকতায় তারা অবাক হয়েছে। হামলার প্রথম সপ্তাহেই তাদের কমান্ডাররা লোকজনকে অস্ত্র ফেলে গ্রাম ছেড়ে পালানোর নির্দেশ দেয়।
অনেকেই বলেছে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আরসা’র আঞ্চলিক ও মাঠের কমান্ডাররা রয়েছে। এর আগে সংগঠনটি আল-ইয়াকিন নামে পরিচিত ছিল। আরসার গ্রাম পর্যায়ের কমান্ডারদের একজন যার বেড়ে ওঠা বাংলাদেশে, পরে মিয়ানমারে ফিরে যায়। সে জানায়, যারা আল-ইয়াকিনকে দায়ী করছে তাদের অনুধাবন করা উচিত যে, আমাদের মানুষ ১৯৭৮ ও ১৯৯০ সালেও পালিয়েছে। তখন আরসা ছিল না। আমাদের হামলা চালিয়ে যাওয়া উচিত। এমনকি নারীরাও যোগ দিতে পারে।