‘গান্ধী-বুদ্ধর দেশে দয়া করে রোহিঙ্গাদের থাকতে দিন’

নরেন্দ্র মোদিকে লেখা খোলা চিঠিভারতের সুপ্রিম কোর্টে দেশটিতে বসবাসকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায়ের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তার সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার আবেদন জানিয়েছেন ভারতের বিশিষ্টজনরা। আজ শুক্রবার (১৩ অক্টোবর) ভারতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর সরকারি উদ্যোগের বিষয়ে রায় দেবেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।

প্রধানমন্ত্রী মোদিকে লেখা বৃহস্পতিবার (১২ অক্টোবর) এক খোলা চিঠিতে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, ‘আপনি প্রায়ই ভারতবর্ষকে গান্ধী ও বুদ্ধর দেশ বলে উল্লেখ করে থাকেন। রোহিঙ্গাদের ভারতে থাকতে দিয়ে আপনি প্রমাণ করুন যে গান্ধী ও বুদ্ধর আদর্শে আপনি অবিচল। গান্ধী-বুদ্ধর দেশে দয়া করে রোহিঙ্গাদের থাকতে দিন।’

চিঠিতে সই করেছেন ভারতের অর্ধশতাধিক বিশিষ্ট নাগরিক– তাদের মধ্যে মানবাধিকার আইনজীবী, রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ, সাবেক আমলা, সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট, ব্যবসায়ী, অভিনেতা, শিল্পপতি রয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও এই উদ্যোগকে সক্রিয় সমর্থন জানাচ্ছে।

শুক্রবারের রায়ে ভারতের শীর্ষ আদালত যদি কেন্দ্রীয় সরকারের হলফনামাকে মেনে নিয়ে রোহিঙ্গাদের ভারতের ‘জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি’ হিসেবে স্বীকার করে নেন, তাহলে ভারত থেকে তাদের বিতাড়ন একরকম নিশ্চিত হয়ে পড়বে কেন্দ্র আগেই ঘোষণা করেছে, তারা ভারতে আশ্রয় নেওয়া চল্লিশ হাজারের মতো রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাতে চায়। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ও সরকারের পক্ষে গেলে ভারতে এই রোহিঙ্গাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে, তা বলাই বাহুল্য।ফলে সুপ্রিম কোর্টেরে রায়ের আগে ভারতের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা তাই সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন, তিনি যেন মানবতা ও উদারতার পরিচয় দিয়ে মাত্র এই কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে ভারতে থাকার অনুমতি দেন।

রোহিঙ্গাদের হয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলাটি লড়ছেন ভারতের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ। প্রধানমন্ত্রীকে লেখা খোলা চিঠিটিতে প্রথম স্বাক্ষরকারীও তিনি। এই আইনজীবী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভারত সত্যিই বিশ্বে একটি সুপারপাওয়ার হয়ে উঠতে পারবে কি না, আজ তারই পরীক্ষা বলা যেতে পারে। কারণ ক্ষমতা তো শুধু অর্থনীতিরই নয়, মানবিকতারও!’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ঘরের পাশে বাংলাদেশ যদি হাজার অসুবিধা সত্ত্বেও লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে পারে, তাহলে ভারতের মতো বড় দেশ মাত্র কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে কেন ঠাঁই দিতে পারবে না– সেটাই আমার বোধগম্য নয়। তাহলে আর ভারত কীসের বড় দেশ?’

প্রশান্ত ভূষণের সঙ্গেই এই চিঠিতে আরও যারা সই করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন, কংগ্রেস নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শশী থারুর, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম, লোকসভা সদস্য ডি পি ত্রিপাঠী ও মাজিদ মেমন, সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব জি কে পিল্লাই, মানবাধিকারকর্মী কামিনী জয়সওয়াল, হর্ষ মান্দের, তিস্তা সেতলবাদ, ফারাহ নকভি ও যোগেন্দ্র যাদব, সাংবাদিক সাগরিকা ঘোষ, করণ থাপার ও পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা, অভিনেত্রী, লেখিকা স্বরা ভাস্কর ও উর্বশী বুটালিয়া প্রমুখ।

তবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, এখন শেষ মুহূর্তে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে ভারত সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ বলা চলে। তার কথায়, নানা গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে গত কয়েক বছর ধরে ভারতে রোহিঙ্গাদের কার্যকলাপ খতিয়ে দেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে তাদের ফেরত পাঠানো হবে। এখন সিভিল সোসাইটির একটা দু’পাতার চিঠিতেই সেই সিদ্ধান্ত বদলে যাওয়ার কোনও কারণ নেই বলেই আমরা মনে করি।

তবে সুপ্রিম কোর্টের রায় সরকারের পক্ষে গেলেও রোহিঙ্গাদের ভারত কিভাবে আর কোন পথে ফেরত পাঠাবে তা স্পষ্ট নয়। কারণ, ভারতে থাকা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফিরিয়ে নিতে রাজি আছে, এমন কথা অন্তত প্রকাশ্যে সে দেশের কর্তৃপক্ষ কখনও বলেনি।