রোহিঙ্গাদের কথা ভুলে যাননি পোপ: ভ্যাটিকান

পোপের মিয়ানমার সফরে রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণ না করা এবং সে দেশের সেনাপ্রধানের সঙ্গে পোপের আকস্মিক বৈঠক নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে ভ্যাটিকান সিটি। তাদের দাবি, পোপ রোহিঙ্গাদের দুর্দশার কথা ভুলে গেছেন; এমনটা মনে করা ঠিক হবে না। প্রকাশ্যে রোহিঙ্গাদের কথা না বললেও পোপ একান্ত বৈঠকে এ নিয়ে কথা বলে থাকতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে তারা। বুধবার (২৯ নভেম্বর) ইয়াঙ্গুনে এক সংবাদ সম্মেলনে পোপের অবস্থানের ব্যাখ্যা হাজির করে ভ্যাটিকান। রোমান ক্যাথলিক প্রার্থনালয়ের সদর দফতর হিসেবে পরিচিত ভ্যাটিক্যান সিটির মুখপত্র ক্রাক্স নাউ.কম প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এসব কথা জানা গেছে।

সমাবেশে পোপ
মঙ্গলবার নেপিদোতে পোপ মিয়ানমার সফরের মূল বক্তব্য হাজির করেন। সেই ভাষণে সরাসরি রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ না করায় মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর একাংশ হতাশা ব্যক্ত করে। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আরেক অংশ ইঙ্গিত দেয়, মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে, সংখ্যালঘু ক্যাথলিকদের সুরক্ষা দিতে আর রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন জোরদারের আশঙ্কা থেকেই পোপ ফ্রান্সিস পৃথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন ওই জনগোষ্ঠীর নাম উচ্চারণে সমর্থ হননি। ভ্যাটিকান মুখপত্র ক্রাক্সের প্রতিবেদনেও স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের চাপের কারণে পোপ রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করতে পারেননি। তবে পরোক্ষে তিনি রোহিঙ্গাদের কথাই বলেছেন। বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে ভ্যাটিকান মুখপাত্র এবং প্রভাবশালী মার্কিন সাংবাদিক গ্রেগ বুরকে বলেন, ‘ফ্রান্সিস রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেননি তার মানে এই নয় যে তিনি রোহিঙ্গাদেরকে নিয়ে পূর্বের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন।’

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানবিক আবেদন জানাতে গিয়ে চলতি বছরেই দুই দুইবার রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করেছেন পোপ ফ্রান্সিস। তবে এবার মিয়ানমারে এসে রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ না করতে সফর শুরুর আগেই স্থানীয় কার্ডিনালের পক্ষ থেকে পোপকে সতর্ক করা হয়েছিল। শব্দটি উচ্চারণ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুমকি দিয়েছিল উগ্র বৌদ্ধদের সংগঠনগুলো। প্রটোকল ভেঙে প্রথমদিনেই পোপকে বাধ্য করা হয়েছিল সেনা নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে বসতে। পোপ রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ না করায় হতাশা প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। ব্যক্তিগত মত প্রকাশের অধিকারের কথা উল্লেখ করে বুরকে বলেন, ‘পোপ এক্ষেত্রে যেকোনও ধরনের নৈতিক কর্তৃত্ব হারিয়েছেন এমনটা বিশ্বাস করা আমার জন্য কঠিন। আমি খুব খুশি লোকজন পোপকে সর্বশক্তিধর বলে মনে করেন, কিন্তু তিনি তা নন। মিয়ানমার কিংবা মধপ্রাচ্যের মতো জায়গাগুলোতে তিনি উড়ে চলে যেতে পারেন না এবং সমস্যাকে হাওয়া করে দিতে পারেন না’। 

বুরকের দাবি, ‘কেউ কখনও বলতে পারবে না ভ্যাটিকান কূটনীতি অব্যর্থ।’ তবে এক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার ভাবার অবকাশ নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রকাশ্যে রোহিঙ্গা নিয়ে কথা না বললেও একান্ত বৈঠকে পোপ এ ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন পোপ। ভ্যাটিকান ঐতিহ্য মেনে পোপের একান্ত বৈঠক নিয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বুরকে। তিনি দাবি করেন, এক্ষেত্রে স্বয়ং ফ্রান্সিসকে জিজ্ঞেস করলেও তিনি বলতেন না। তবে এটা বলা জরুরি, আপনি যদি পোপকে দেখেন এবং পর্যবেক্ষণ করেন, তাহলে বুঝবেন তিনি অনেক মুক্ত মানুষ।’

দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি সত্ত্বেও মিয়ানমারের শীর্ষ জেনারেলদের সঙ্গে পৌঁছানোর দিনেই পোপের আকস্মিক বৈঠক নিয়ে জানতে চাইলে বুরকে মন্তব্য করেন, মিয়ানমারের সেনাপ্রধান ও অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সফর শেষে বৈঠক করার কথা থাকলে তা এগিয়ে প্রথম দিনে নিয়ে আসার সঙ্গে পোপ ফ্রান্সিসের কোনও ভূমিকা নেই। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেই ওই অনুরোধ করা হয়েছিল। সোমবার মিয়ানমারে পৌঁছার পর মঙ্গলবার পোপের সফরসূচিতে ছিল প্রেসিডেন্ট ও রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি। সেনা নেতৃত্বের সঙ্গের বৈঠকটি ওইদিনের পরে হলে প্রটোকল নিয়ে কথা উঠত না বলে মত দেন বুরকে।

উল্লেখ্য, তিন দিনের মিয়ানমার সফর শেষে বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন পোপ ফ্রান্সিস।