জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূতদেরও বেশিরভাগেরই সমর্থন পাচ্ছেন না ট্রাম্প। ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে কথা বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, এসকল কূটনীতিকদের একটা বড় অংশ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। সাবেক ১১ জন রাষ্ট্রদূতের মধ্যে ৯ জনই জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী স্বীকৃতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
৬ ডিসেম্বর বুধবার জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসরায়েলের মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানান তিনি। এরপর বিশ্বজুড়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় ওঠে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, কেবল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নয় ইসরায়েলে বিভিন্ন সময়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন এমন ব্যক্তিদের অনেকেও ট্রাম্পের পদক্ষেপকে সমর্থন করেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের অধীনে ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন ড্যানিয়েল কুর্টজার। তিনি বলেন, ‘কূটনৈতিকভাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়ার দিক থেকে এ সিদ্ধান্তের অনেক নেতিবাচক দিক আছে। এর মধ্যে কোনও ইতিবাচকতা নেই। এ সিদ্ধান্তের সমর্থক ইসরায়েলি সরকারকে বাদ দিয়ে বলতে গেলে আন্তর্জাতিকভাবে আমরা আবারও একা হয়ে পড়েছি। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রেসিডেন্ট যে ভূমিকা পালনের কথা বলেন আমরা সেখান থেকে এখন নিজেরাই নিজেদেরকে সরিয়ে ফেলছি।’
কেউ কেউ মনে করছেন, ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ অঞ্চলটিতে আরও বেশি সহিংসতা তৈরি করবে। তেমনই একজন রিচার্ড জোনস। তিনিও বুশ প্রশাসনের অদীনে ২০০৫ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতির প্রশ্নে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন রিচার্ড। তিনি বলেন, ‘এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। এ পদক্ষেপের কারণে ইসরায়েল ও অঞ্চলটিতে যে প্রাণহানি হবে সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। বিশেষ করে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে ন্যায্য প্রমাণ করতে এ স্বীকৃতিকে ব্যবহার করবে।’
অন্য যেসকল মার্কিন রাষ্ট্রদূত ট্রাম্পের সিদ্দান্তের বিরোধিতা করেছেন তারা হলেন-প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রশাসনের অধীনে ১৯৮৮ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত দায়িত্বপালনকারী উইলিয়াম আন্দ্রিয়াস ব্রাউন, ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী উইলিয়াম ক্যাল্ডওয়েল হ্যারপ, ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বে থাকা এডওয়ার্ড ডিজেরেজিয়ান, রিগ্যান প্রশাসনের অধীনে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী থমাস পিকেরিং এবং বুশ ও ওবামা প্রশাসনের অধীনে দায়িত্ব পালনকারী রাষ্ট্রদূত জেমস কুনিংহাম।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের অধীনে ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ড্যানিয়েল শাপিরো। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ‘জেরুজালেম ইসরায়েলের রাজধানী এবং একে এভাকে স্বীকৃতি দেওয়াটা যথার্থ। দেদিক থেকে প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে বাস্তবতাকে স্বীকৃতি প্রদানের এ পদক্ষেপ দারুণ। এক্ষেত্রে যে সুযোগটি হাতছাড়া হয়েছে তাহলো আমাদের বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের দৃষ্টিকোণ থেকে এ সিদ্ধান্তটি সাজানো হয়নি। আমাদের সেই কৌশলগত লক্ষ্য হলো দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান। আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে এ নিয়ে আরও আলোচনার প্রয়োজন ছিল, আরও স্বচ্ছতার প্রয়োজন ছিল; যা ফিলিস্তিনিরা জেরুজালেমের জন্য তাদের আকাঙ্ক্ষার অংশ হিসেবে আশা করতে পারে।’
উল্লেখ্য, ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক নগরী জেরুজালেমকে নিজের রাজধানী হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এই শহরেই মুসলমানদের প্রথম কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাস মসজিদ অবস্থিত। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে এই নগরী দখল করেছিল তেল আবিব।
জেরুজালেম পবিত্র ভূমি হিসেবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয়ের কাছেই গণ্য। এর দখল ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের দ্বন্দ্বও বহু পুরোনো। ইসরায়েল সব সময়ই জেরুজালেমকে নিজেদের রাজধানী হিসেবে দাবি করে আসছে, পাশাপাশি পূর্ব জেরুজালেম ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হবে বলে দেশটির নেতারা বলে আসছেন। এই অবস্থায় ট্রাম্পের এ ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা।