ট্রাম্পের ভাষণে কি যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব চিত্র পাওয়া যাবে?

কিছুক্ষণ পরই মার্কিন ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম স্টেট ইউনিয়ন ভাষণ দেবেন। তার ঘণ্টাব্যাপী ভাষণের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘নিরাপদ, শক্তিশালী ও গর্বিত যুক্তরাষ্ট্র গড়া’। তিনদিনের সরকারি অচলাবস্থা ও সরকারি তহবিলের মেয়াদ ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বহাল থাকায় বিষয়টি সামনে নিয়েই এই বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন ট্রাম্প। দেশটির অভিবাসন আইন নিয়ে এখনও রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে দ্বন্দ্বও চলছে। এই অবস্থায় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, কী বলবেন ট্রাম্প? তার বক্তব্যে কি যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব চিত্র উঠে আসবে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

রয়টার্স, বিবিসি, পলিটিকো, নিউ ইয়র্ক  টাইমসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে  ট্রাম্প এই ভাষণে পাঁচটি বিষয়ে গুরুত্ব দেবেন বলে আভাস পাওয়া গেছে। তা হলো- কর্মসংস্থান, অবকাঠামো, অভিবাসন, বাণিজ্য ও জাতীয় নিরাপত্তা। তবে ট্রাম্পের ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব চিত্র লক্ষ্য করতে গেলে কিছু বিষয়ের ওপর খেয়াল রাখতে হবে।

 ট্রাম্প কি স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী বক্তব্য দেবেন?

গত বছর ট্রাম্পের ভাষণ সবার কাছ সমাদৃত হয়েছিল। তবে বিভিন্ন বিষয়ে যুদ্ধংদেহী  টুইটার ব্যক্তিত্ব ও অভিবাসন ইস্যুতে বিভিন্ন দেশকে ‘শিটহোল’ বলাসহ বিভিন্ন মন্তব্যের কারণে বেশ সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। ট্রাম্প ভাল করেই বুঝে গেছেন লিখিত বক্তব্য হলেই সব ভালভাবে হয়। এছাড়া সাম্প্রতিক শাটডাউনের সময়ও ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। দু’য়েকটি টুইট করা ছাড়া তেমন কোনও তৎপরতাই লক্ষ্য করা যায়নি তার। এটা রিপাবলিকানদের সহায়তাই করেছে। এর ফলে শাটডাউনের জন্য তারা ডেমোক্র্যাটদের দোষারোপ করতে পেরেছে। ৮ ফেব্রুয়ারির সময়সীমার আগেইকংগ্রেস সদস্যরা অভিবাসন ও বাজেট নিয়ে আলোচনায় বসতে বাধ্য হচ্ছেন। সেক্ষেত্রে এবারও ট্রাম্প লিখিত বক্তব্যের বাইরে তেমন কিছু বলবেন না বলে আশা করা হচ্ছে।    

নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াগনার স্কুলের প্রফেসর তিমোথি নাফতালি বলেন, ‘স্টিভ ব্যননের পদত্যাগ ও অভিবাসন ইস্যুতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিতে মনে হচ্ছে প্রেসিডেন্ট তার কথায় বেশ পরিবর্তন আনতে পারেন। নতুন সুরে কথা বলার জন্য এটা ভাল সুযোগ।’

স্বাস্থ্য নীতি বিষয়ে কী বলতে পারেন তিনি?

মার্কিন রাজনৈতিক সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৫৯ শতাংশ ভোটার চায় ট্রাম্প স্বাস্থ্য সুরক্ষা পদ্ধতির উন্নয়নে কথা বলুক। যেখানে ৫৮ শতাংশ মানুষ চায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতির উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হোক। স্বাস্থ্য নীতির বিষয়টি ভোটারদের মনে বড় বিষয় হয়ে রয়েছে। ২০১৭ সালে রিপাবলিকানরা ওবামাকেয়ার চালিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছেন। তার পরিবর্তে নতুন বিলও চালু হয়নি। ২০১২ সালে রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারভিযানের নীতি নির্ধারক লানহি শেন বলেন, ‘আমি আশা করি তিনি এই বিষয়ে কিছু বলবেন। কারণ এটা দ্বিধাগ্রস্ত ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

স্বাস্থ্যনীতি বিশেষজ্ঞ ল্যারি লেভিট বলেন, ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ে এখন কথা বললে তা জনগণকে রিপাবলিকানদের সমস্যার কথা মনে করিয়ে দেবে। তারা ব্যয়সাধ্য সুরক্ষা আইন বাতিল করে সমস্যাটির সৃষ্টি করেছে।’ তবে হোয়াইট হাউজ থেকে ট্রাম্পের ভাষণ সম্পর্কে যেসব বিষয়ের আভাস দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে স্বাস্থ্যনীতি নেই।

অভিবাসন বিষয়ে ট্রাম্প কী বলবেন?

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়, অভিবাসন বিষয়ে চমক দিতে পারেন ট্রাম্প। তার প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘ড্রিমারস’ নামে পরিচিত শিশুকালে বাবা-মায়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া অবৈধ অভিবাসীদের সেখানে থাকার অনুমতি দেবেন ট্রাম্প। তবে দেশের দক্ষিণ সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের ব্যাপারে তিনি আইনপ্রণেতাদের রাজি করার চেষ্টা করবেন। একই সঙ্গে অভিবাসীদের পরিবারের সদস্যদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার কথাও বলবেন। ট্রাম্পের এই প্রস্তাবে অভিবাসন সমর্থনকারী ও বিরোধিতাকারী দুই পক্ষকেই হতাশ করতে পারেন। কয়েকজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা ড্রিমারসদের ওই বক্তব্য শোনার জন্য আমন্ত্রণও জানিয়েছেন।

হোয়াইট হাউজ গত ২৫ জানুয়ারি বিষয়টি নিয়ে বিস্তৃত কাঠামোও প্রকাশ করেছে। আর তার তাৎক্ষণিক বিরোধিতা করেছে ডেমোক্র্যাটরা। অভিবাসন নীতির দুই পক্ষের বিশেষজ্ঞরাই স্টেট ইউনিয়ন বক্তব্যে ট্রাম্পের কথার দিকে গভীর মনযোগ দেবেন। ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ প্রকাশিত কাঠামোর পক্ষেই থাকবেন নাকি অলিখিত ইঙ্গিতের মাধ্যমে বিষয়টিতে ছাড় দেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি দেখাবেন সেটির দিকেই তারা খেয়াল রাখবেন।  

রাশিয়ার ব্যাপারে কি কিছু বলবেন ট্রাম্প?

২০১৬ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারিভিযানে রাশিয়ার সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। হোয়াইট হাউজ বলছে, তারা রবার্ট ‍মুলারের তদন্ত দলকে পুরোদমে সহায়তা করছে। এমনকি ট্রাম্পও তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হয়েছেন। তবে তিনি বার বার তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাই ভাষণে ট্রাম্প রাশিয়ার বিষয়ে কিছু বলেন কিনা তা সবার নজরে থাকবে।

ট্রাম্প কি দ্বিদলীয় হওয়ার চেষ্টা করবেন?

প্রথম স্টেট ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থার উপরই বেশি জোর দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সময়ে শেয়ার বাজারের রমরমা অবস্থা, মার্কিন কোম্পানিগুলোর বোনাস ঘোষণা, বেকারত্বে সর্বনিম্ন হারসহ বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি বক্তব্য দেবেন যা দলীয় কর্মী ছাড়াও নাগরিকদের আকর্ষিত করবে। তবে বারাক ওবামার শেষ বছরেও মার্কিন অর্থনীতি ভাল একটা অবস্থানে আসা শুরু করে। বক্তব্যে ট্রাম্প সেই বিষয়টি অস্বীকার করে পুরো কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তবে বর্তমান সময়ে আফ্রিকান-আমেরিকান, হিস্পানিক (স্প্যানিস ভাষাভাষীর নাগরিক) ও নারীদের বেকারত্বের হারের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি। বিষয়টি ট্রাম্প তার বক্তব্যে তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।  

বক্তব্যের পরও অনেকে দেখবে তিনি কোথায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আর কীভাবে নিজের এজেন্ডা ও প্রেসিডেন্সিকে তুলে ধরতে পারেন। নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াগনার স্কুলের প্রফেসর তিমোথি নাফতালি বলেন, ‘সত্যি সমর্থনের ভিত্তি মজবুত করতে চাইলে তাকে সেখানে যেতে হবে যেখানে পৌঁছাতে পারেননি। তিনি রেড কান্ট্রিগুলোর প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি কিছু করতে পারবেন?’