১৯৮২ সালে মিয়ানমারে নাগরিকত্বের নতুন আইন প্রণীত হওয়ার আগে সবুজ পরিচয়পত্রে পুরুষ ও গোলাপী পরিচয়পত্রই ছিল মিয়ানমারে বসবাসকারী নিজ দেশের মানুষদের শনাক্ত করার উপায়। সেই পরিচয়পত্র ছিল রোহিঙ্গাদের কাছেও। তখন তারাও স্বীকৃত ছিলেন মিয়ানমারের অধিবাসী হিসেবে। ৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনে পরিচয়হীনতার কাল শুরু হয় রোহিঙ্গাদের। কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনও নিবন্ধনপত্র, কখনও নীলচে সবুজ রঙের রসিদ, কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড, কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি। ধাপে ধাপে রং-বেরঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে। ধাপে ধাপে মলিন হয়েছে তাদের পরিচয়। ক্রমশ তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন বেনাগরিকে। রোহিঙ্গাদের পরিচয় এখন একটাই: পৃথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন শরণার্থী জনগোষ্ঠী।
মানবিক সহায়তা বিষয়ক বৈশ্বিক মাধ্যম আইআরআইএন। অলাভজনক এই সংবাদমাধ্যম বলছে, রোহিঙ্গাদের দেওয়া পরিচয়পত্রগুলো রাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত, নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত রোহিঙ্গাদের ওপর চলা ধারাবাহিক নির্যাতন-নিপীড়নের সাক্ষী। কৌশলে তাদেরকে রাষ্ট্রহীন করে দিয়ে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল এসব পরিচয়পত্র। প্রতিবারের নতুন পরিচয়পত্র রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে একটু একটু করে কেড়ে নিয়েছে তাদের অধিকার আইআরআইএন বলছে, ৮২ সালের পরে মিয়ানমারের কাছ থেকে পাওয়া পরিচয়পত্রগুলোর মধ্যে রোহিঙ্গাদের একটি পরিচয়পত্রেই তাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব স্বীকার করা হয়েছে। সেটা তারা পেয়েছেন বাংলাদেশের কাছে। শুধু ওই পরিচয়পত্রেই লেখা রয়েছে, মিয়ানমার তাদের দেশ, তারা মিয়ানমারেরই নাগরিক। তবে বাংলাদেশ বললেও মিয়ানমার তো আর তা স্বীকার করে না।
মিয়ানমারের ইতিহাসে চোখ ফেরালে দেখা যায়, ১৯৮২ সালে তৎকালীন সামরিক জান্তা সরকার নৃগোষ্ঠীভিত্তিক নতুন নাগরিকত্ব আইন কার্যকর করে। বিতর্কিত ওই বর্ণবাদী নাগরিকত্ব আইনে মিয়ানমারের প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়। আইনের ৪ নম্বর ধারায় শর্ত দেওয়া হয়, কোনও জাতিগোষ্ঠী রাষ্ট্রের নাগরিক কি না, তা আইন-আদালত নয়; নির্ধারণ করবে সরকারের নীতি-নির্ধারণী সংস্থা ‘কাউন্সিল অব স্টেট’। বস্তুত এই আইনটিই জান্তাশাসিত মিয়ানমারে সর্বোচ্চ সেনাবিদ্বেষের শিকার রোহিঙ্গাদের ভাসমান জনগোষ্ঠীতে রূপান্তর করে।
উত্তরাধিকারসূত্রে দাদার কাছে পাওয়া পরিচয়পত্র নিয়ে রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে অবস্থান নেন নুরুল হক । ছেঁড়া-ফাটা ওই পরিচয়পত্রে তার দাদার মিয়ানমারের নাগরিকত্বের তথ্য রয়েছে। সেটি দেখিয়ে নুরুল হক বলেছিলেন, ওটাই তাদের একমাত্র শক্তির জায়গা। তিনি ও তার পরিবার যে মিয়ানমারের বৈধ নাগরিক তার প্রমাণ ওই পরিচয়পত্রটি।
নুরুল হক থাকছিলেন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য বানানো শিবিরের একটা পলকা তাঁবুতে। দাদার পরিচয়পত্রটি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের হাত থেকে বাঁচিয়ে মাটিতে পুঁতে রেখেছিলেন নুরুল। গত বছর বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় তিনি মাটি খুঁড়ে বের করা ওই পরিচয়পত্রটি, পুরানো কিছু ছবি আর তার নতুন পাওয়া সাদা পরিচয়পত্রটি নিয়ে এসেছিলেন। বাংলাদেশে পৌঁছানোর পরে তিনি ওই কাগজপত্রগুলো লেমিনেটিং করিয়ে ফেলেন সংরক্ষণের সুবিধার জন্য। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় নুরুল কাগজগুলো তার বালিশের তলায় রাখেন। আইআরআইএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুছিয়ে রাখা কাগজগুলো মিয়ানমারের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে তা নুরুল জানেন না, তবু সেগুলো সযত্নে রেখেছেন দেশে ফেরার আশায়। তার ধারণা ওই কাগজগুলোক ভরসা করেই তিনি একদিন মিয়ানমারে ফেরার সুযোগ পাবেন।
যে চুক্তিকে উপজীব্য করে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার কথা জানিয়েছে, তাতে যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বৈধ প্রমাণপত্র হাজিরের শর্ত আছে। পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি ফেলে স্রেফ জীবন নিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জিজ্ঞাসা: বৈধ-অবৈধ পরের প্রশ্ন; কাগজপত্র কোথায় পাবে তারা? এরই মধ্যে জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নীতিতে নিজেদের আস্থাহীনতার কথা জানিয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইনে ভয়ঙ্কর মানবাধিকার হরণ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকির মুখে জোর করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরকে ফেরত পাঠানো উচিৎ হবে না বলে মনে করছে তারা সবাই।
আইআরআইএন বলছে, পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে গিয়ে বেশির ভাগ রোহিঙ্গাই সব কিছু হারিয়েছে। পায়ে হেঁটে বাংলাদেশে পৌঁছাবার সময়ে হাতে করে যা পেরেছে তা-ই সঙ্গে নিয়ে এসেছে তারা। এক জরিপে থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ৯৪ শতাংশেরই কোনও পরিচয়পত্র নেই। নুরুল হক, হাসিনা খাতুন ও লালুর মতো কিছু মানুষ তাদের পরিচয়পত্র রক্ষা করতে পেরেছে।
নুরুল হক ২০১৭ সালে তার পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য রওনা হয়। নুরুল হকের সঙ্গে কথা হয় আইআরআইএনের। ওই পরিচয়পত্রটি এবং অন্যান্য পরিবারের হাতে থাকা একই এরকম পরিচয়পত্র তাদের মনে করিয়ে দেয় ফেলে আসা জীবনের কথা। আশা-দুরাশার দোলাচালে দুলতে থাকা মানুষগুলো মনে করে, হয়তো কোনও একদিন এইসব পরিচয়পত্র দেখিয়ে তারা আবার মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে তাদেরকে নাগরিকত্ব, সম্পদ ও পরিচয় থেকে বঞ্চিত রাখার জন্য আমলাতান্ত্রিক কৌশল ছাড়াও আরও অনেক পদ্ধতি কাজ করছে। আইআরআইএন বলছে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত প্রশ্নের মূলে রয়েছে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কৌশল যা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে থাকার অধিকার কেড়ে নিয়েছে, এক কোনায় ঠেসে ধরেছে এবং অবশেষে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। রোহিঙ্গারাই মিয়ানমারের নাগরিকত্ব বঞ্চনার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
২০১২ সালে রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হোয়াইট কার্ড দেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালে গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্যেই তা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সে সময় প্রেসিডেন্ট দফতরের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ওই কার্ড মার্চ থেকে আপনাআপনিই বাতিল হয়ে যাবে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মিয়ানমার টাইমসের সেই সময়ের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার ওই কার্ড ছিল।
সে সময় নাগরিকত্ব না থাকা ব্যক্তিদের এনভিসি (ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড) করার প্রস্তাব দেয় প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের দফতর। তবে ফ্রন্টিয়ার মিয়ানমারের সেই সময়ের এক প্রতিবেদন বলছে, কেবল ৩৫ হাজার ৯৪২ জন ওই আবেদন করেন। আর গোটা রাখাইন রাজ্যে নাগরিকত্বহীন ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ওই কার্ড দেওয়া হয় সাত হাজার ৫৪৮ জনকে। এদের সবাই যদি রোহিঙ্গাও হয়, তাহলে এই সাড়ে সাত হাজার মানুষের বাইরে আর কোনও রোহিঙ্গার নাগরিকত্বের বৈধ কাগজপত্র নেই।
সূত্র: আইআরআইএন, মিয়ানমার টাইমস, ফ্রন্টিয়ার মিয়ানমার, জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, এইচআরডব্লিউ এবং দ্য আরাকান প্রজেক্টের ওয়েবসাইট