জুমার নামাজে হামলার আতঙ্কে শ্রীলঙ্কার মুসলিমরা

শ্রীলঙ্কায় জুমার নামাজের দিনেও হামলার শিকার হওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মুসলিমরা। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা বেশি আতঙ্কিত। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।  

9d7594bbd39e4b7fbb7a54fee5af17e8_18

প্রতিবেদনে বলা হয়, জরুরি অবস্থা ও কারফিউয়ের পরও মুসলিমদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। ফাতিমা রিজকা নামে স্থানীয় একজন বলেন, ‘আমি খুবই ভয়ে আছি এবং সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। বাসার পুরুষরা আমাদের সুরক্ষা দিতে বাইরে আছে। আমরা বাসায় একা।’

তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ তাদের সুরক্ষা দিচ্ছেন না। হামলার সময় ‍শুধু পাশেই দাঁড়িয়ে থাকছেন। ফাতিমা বলেন, ‘আমরা জানি না এর পরে কি হতে যাচ্ছে।’

বৃহস্পতিবার ক্যান্ডির রাজপথে কোনও সাধারণ মানুষ দেখা যায়নি। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিয়েছিলেন সর্বত্র। এরপরও নিশ্চিন্তে থাকতে পারছেন না মুসলিমরা। ফাতিমা বলেন, শোনা যাচ্ছে জুমার নামাজের সময় হামলা হবে। তিনি বলেন, ‘পুরুষরা বিভিন্ন সময় নামাজ পড়বেন। নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় পালাক্রমে দায়িত্বপালন করার পরিকল্পনা করেছেন তারা।’

এক গুজব থেকে মুসলিমবিরোধী এই দাঙ্গার সূত্রপাত। পর্যটন নগরী ক্যান্ডির মুসলিম মালিকানাধীন দোকানে বৌদ্ধদের খাবারে গর্ভনিরোধক মেশানো হয়েছে; এমন গুজব ছড়িয়ে শুরু হয় অগ্নিসংযোগ। সহিংসতার মধ্যেই এক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নিহতের খবর আগুনে ঘি ছড়ায়। আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে হামলাকারীরা। ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগ চালানো হয় মুসলমানদের বিভিন্ন স্থাপনায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্যান্ডিতে কারফিউ জারি করেন কর্তৃপক্ষ। তবে কারফিউ ভেঙে উচ্ছৃঙ্খল জনতার তাণ্ডব অব্যাহত থাকে। পুড়ে যাওয়া বাড়ি থেকে এক মুসলিমের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা। ক্যান্ডি ছাড়িয়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। আরও সংঘাতের আশঙ্কায় মঙ্গলবার দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা।

তবে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী। মোহাম্মদ নামে এক স্থানীয় জানান, ‘সরকার বলছে তারা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু সত্য হচ্ছে মুসলিমরা নিরাপদবোধ করছেন না। আমাদের মনে হচ্ছে উচ্চপর্যায়ের কেউ এই হামলাকারীদের সমর্থন দিচ্ছেন। তারা আমাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছে।’

d54c02dcd4ef40d290041f2308bcf926_18

এজন্য মুসলিমরা নিজেরাই সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে বলে জানান মোহম্মদ। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের স্ত্রী, মা ও বোনকে একা ফেলে রাখতে পারি না। আমরা নিজেদের সুরক্ষার দায়িত্ব নিজেরাই নিয়েছি। কারণ, পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে।’

শ্রীলঙ্কায় ২ কোটি ১০ লাখ বাসিন্দার ৭৫ শতাংশ বৌদ্ধ, ১০ শতাংশ মুসলিম ও ১৩ শতাংশ হিন্দু। ঐতিহাসিকভাবে বৌদ্ধ ও মুসলিমরা সেখানে সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। আশার কারিম নামে একজন বলেন, যেসব বৌদ্ধ স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের দোষ দেওয়ার কিছু নেই। তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ সিংহলিজ শান্তিপ্রিয় ও দয়ালু। কয়েকজন আছে উগ্রবাদী। মুসলিমরা সবসময়ই সহিষ্ণু ছিল।’

এর আগে সর্বশেষ ২০১৪ সালের জুনে দেশটিতে মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণার কারণে রক্তক্ষয়ী আলুথগামা দাঙ্গা শুরু হয়। ওই সময়ে শত শত মুসলমান গৃহহীন হয়ে পড়েন। তাদের বাড়িঘর, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের অভিযোগ, দেশটিতে মুসলমানরা বৌদ্ধদের বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করছে। তারা বৌদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো ভাঙচুর করছে। কিছু পর্যবেক্ষক চলমান সহিংসতার জন্য কট্টর বৌদ্ধ সংগঠন বোদু বালা সেনা’কে (বিবিএস) দায়ী করছেন।