তালেবানের হামলায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নিজ দেশ পাকিস্তান ছেড়ে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের তরুণ অধিকারকর্মী মালালা ইউসুফজাই। হত্যার প্রচেষ্টাও থামাতে পারেনি তাকে, সাহসী মালালা জীবনের গতিপথে ফিরেছেন বিজয়ীর বেশে। হামলার ৬ বছর পর মাতৃভূমিতে পা রাখার সুযোগ হয়েছে তার। দেশে ফেরার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কান্না আটকাতে পারেননি এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত পাকিস্তানি মুখগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে থাকা এই ২০ বছর বয়সী নারী।
নারী শিক্ষার অধিকার নিয়ে সোচ্চার মালালা ২০১২ সালে তালেবান হামলায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হলেও প্রাণে বেঁচে যান। লন্ডনের এক হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে ওঠেন। পাশ্চাত্য দেশগুলো ফলাও করে ঘটনাটি সামনে আনে এবং ২০১৪ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। বর্তমানে সপরিবারে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন মালালা। যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর বুধবার (২৮ মার্চ) দিনগত রাত দেড়টার দিকে প্রথমবারের মতো দেশে ফিরেছেন ২০ বছর বয়সী এ শিক্ষা অধিকারকর্মী। সূত্রকে উদ্ধৃত করে এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানায়, নিরাপত্তাজনিত কারণে তার দেশে ফেরার কথা গোপন রাখা হয়েছিল।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের জাতীয় দিবসেই দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছিলেন তিনি। তবে নিরাপত্তা শঙ্কার কথা বলে তাকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিলো না। এর আগে গত বছর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সম্মেলনে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শহীদ খাকান আব্বাসির সঙ্গে এক পার্শ্ববৈঠকে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছিলেন মালালা। ইসলামাবাদে ফিরে তিনি দেখাও করেছেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। এরপর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছেন তিনি।
টেলিভিশনে দেওয়া বক্তৃতায় পাকিস্তানে ফেরার স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন মালালা। বলেন, ‘আমার জন্ম ১৯৯৯ সালে। আমি বেশি কাঁদিনি। তবে আজ আমি কান্না থামাতে পারছি না। আমি জীবনকে সুন্দর করেই দেখছিলাম। এরপর সন্ত্রাসের ভয়াবহতা দেখি। আমাদের সমাজে নারীদের নিগৃহীত হতে দেখি। চিন্তা করতে থাকি কীভাবে এর প্রতিবাদ করা যায়।’ মালালা বলেন, ‘এরপরই আমার ওপর হামলা হয়। আমাকে দেশ ছাড়তে হয়। আমি কখনোই এমনটা চাইনি। কিন্তু তখন সব আপনাআপনিই হচ্ছিলো। আমার কিছু করার ছিল না। সেখানেই চিকিৎসা হয়। পড়াশোনা চলতে থাকে।’
টেলিভিশন বক্তৃতায় মালালার কান্নার দৃশ্য
কিশোর বয়স থেকেই নারী শিক্ষা ও অধিকার আদায়ে আওয়াজ তুলেছেন তিনি। তার বাবা মেয়েদের একটি স্কুল চালাতো। প্রায়ই টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নারী শিক্ষা নিয়ে কথা বলতে দেখা যেত মালালাকে। ২০১২ সালের মে মাসে একদিন মালালার স্কুল বাসে উঠে পড়ে মুখোশধারী তালেবানরা। নাম ধরেই খুঁজতে থাকে তাকে। সামনে আসার পর তাকে গুলি করে চয়ে যায় তালেবানরা। তৎক্ষণাৎ তাকে যুক্তরাজ্যে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক মাসের চেষ্টায় তার মাথার খুলি ঠিক করতে সক্ষম হয় ডাক্তাররা। এরপর থেকেই বাড়ি ফিরতে পারছিলেন না তিনি। কিন্তু বিশ্বে নারী অধিকার আদায় আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেন তিনি। ২০১৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান মালালা। তিনিই বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী নোবেল বিজয়ী।
বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন, অর্থনীতি ও রাজনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করছেন ২০ বছর বয়সী মালালা। এখনও বিশ্বজুড়ে নারী অধিকার নিয়ে কথা বলেন তিনি। মালালা ফান্ড নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। নারীর অধিকার নিশ্চিতের আন্দোলনে গড়ে তোলেন তহবিল। পাকিস্তান, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করে যাচ্ছে মালালা ফান্ড। পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে যেখানে মালালাকে গুলি করা হয়েছিল সেখানেই নোবেল পুরস্কারের কিছু টাকা দিয়ে মেয়েদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন মালালা। খুব শিগগিরই সেখানে যাওয়ার কথা তার।
পাশ্চাত্যের অনেক দেশেই মালালাকে সম্মান দেওয়া হলেও জন্মভূমির অনেকেই সমালোচনা করেন তার। অনেকে অভিযোগ করেন, মালালার কারণে পাকিস্তানের এমন একটি ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে যেন তারা যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল। মালালা ফিরে আসায় সামাজিক মাধ্যমে অনেকে তাকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানালেও কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, শুধু জনপ্রিয়তাই চান মালালা, পাকিস্তানের হয়ে কিছু করতে চান না। তবে টেলিভিশন বক্তৃতায় সবসময়ই দেশে ফেরার স্বপ্ন ছিল উল্লেখ করে মালালা বলেন, ‘আমি এখানে আসতে চেয়েছি। আমার দেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছি।’
ডন খবর দিয়েছে, ইসলামাবাদ থেকে এবার বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে সোয়াতের নিজ বাড়িতে যেতে চান মালালা।