‘সালাম, মানবতার জীবনদূত ইমাম রশিদি’

নুরানি মসজিদের ইমাম মওলানা ইমদাদুল রশিদি, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার অন্ধকার থেকে যেন ঐশ্বরিক জ্যোতির্ময়তায় টেনে তুললেন পশ্চিমবঙ্গকে। কেউ কেউ তাকে পিতৃতুল্য বোধে সালাম জানাচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন তার নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত। কেউ চাইছেন তাকে ভারতরত্ন ঘোষণা করা হোক। কেউ তাকে বলছেন ‘মানবতার জীবনদূত’। রাজনীতিকরা যখন বিভাজনের বিষাক্ত বীজ ছড়িয়েছেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ১৬ বছর বয়সী সন্তান হারানোর পাথরসম শোক বুকে নিয়ে তখন আসানসোলবাসীকে শান্তির বাণী শুনিয়েছেন তিনি। পুত্র হত্যার প্রতিশোধের প্রতিহিংসা নয়, প্রেম-ভালোবাসার শান্তিময়তার পক্ষে হাঁটতে এলাকাবাসীকে তাগিদ দিয়েছেন আসানসোলের এই মাওলানা। তাই তিনি জ্বলজ্বল করে জ্বলছেন অন্ধকার সময়ের আলোকশিখা হয়ে। ভারতজুড়ে এখন তাকে নিয়েই আলোচনা। ফেসবুক-টুইটারসহ সামাজিকমাধ্যমেও ভাইরাল তার শান্তির বাণী। রাজনীতিক, কণ্ঠশিল্পী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী থেকে একেবারে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সর্বস্তরের আলোচনায় উঠে এসেছে সম্প্রীতির পক্ষে তার অনুসরণীয় ভূমিকার কথা।
আসানসোলের ইমাম মওলানা রশিদি

রাম নবমীর মিছিলকে কেন্দ্র করে সোমবার থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বাতাসে মিশতে শুরু করে সাম্প্রদায়িক বিভেদের বিষ। মঙ্গলবার বিকেলে আসানসোল উত্তর থানার রেলপাড় এলাকা থেকে মাওলানার ছোট ছেলে সিবতুল্লা রশিদি নিখোঁজ হয়। তার আক্ষেপ,  ‘বড় ছেলে থানায় গিয়ে জানিয়েছিল দুষ্কৃতিরা তার ভাইকে তুলে নিয়ে গেছে। কিন্তু পুলিশ তাকে কেবল অপেক্ষা করিয়ে রাখলো।’ বুধবার সিবতুল্লা রশিদির মরদেহ উদ্ধার হয়। বলা হয়ে থাকে, পিতার কাঁধে সবচেয়ে ভারি জিনিস নাকি সন্তানের মরদেহ। তবে সাম্প্রদায়িক ঘৃণার মারণাস্ত্রে খুন হওয়া ১৬ বছরের কিশোর পুত্রের শেষকৃত্যে প্রতিশোধের বিপরীতে মাওলানা রশিদি আহ্বান জানিয়েছেন জীবনের। বলেছেন, ‘কোনও প্রতিহিংসা নয়। প্রতিশোধ নিতে যদি কারোর মৃত্যু ঘটাও, তাহলে আমি এই শহর ছেড়ে চলে যাব। আমি তোমাদের সঙ্গে ৩০ বছর ধরে আছি, আমাকে যদি তোমরা ভালোবাসো তাহলে আর কাউকে যেন এভাবে মরতে না হয়।’

চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় আসানসোল, পশ্চিমবঙ্গের সীমানা ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে পুত্রহারা পিতার এই আবেদনের কথা। সিপিআই (এম)-র রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র এই ঘটনার কথা জেনে একটি টুইট বার্তায় পুত্রহারা ইমামের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আপনি আসানসোল তথা বাংলা ও দেশের মহত্তম ঐতিহ্যের প্রতিনিধি। অনুরোধ, আপনি কখনোই আমাদের ছেড়ে যাবেন না। আপনার লক্ষ লক্ষ সন্তান এই অন্ধকার সময়ে আপনার অভিভাবকত্ব চায়। আমরা নই একা, আমরা করব জয় নিশ্চয়।’

ইমদাদুল রশিদির নিহত ছেলে সিবতুল্লাহ রশিদি

নন্দিত কণ্ঠশিল্পী কবীর সুমন দাবি তুলেছেন, মাওলানা রশিদিকে ‘ভারতরত্ন’ ঘোষণা করা হোক। ছোট গল্পকার রবিশ কুমার লিখেছেন, ‘ইমাম ইমদাদুল রশিদি শুধু আসানসোলকেই বাঁচাননি, সম্ভবত পুরো ভারতে আগুনের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। অনেক শ্রদ্ধা ইমাম সাহেব।’  হায়দরাবাদের মানবাধিকার কর্মী পূর্বা আগারওয়াল লিখেছেন এক মাস আগে দিল্লিতে খুন হওয়া অঙ্কিত সাক্সেনার কথা। লিখেছেন,  ‘ইমাম ইমদাদুল রশিদি অথবা অঙ্কিত সাকসিনার বাবা উভয়ই ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছেন। তারা বলছেন, ‘আমাদের সন্তান মারা গেছে, দয়া করে আর কারও সন্তানকে যেন হত্যা করা না হয় তা নিশ্চিত করুন। এখানে শান্তি ও বন্ধুত্ব নিশ্চিত করুন। ভারত কী তা শুনবে? এমন নোংরা রাজনীতির জন্য আর কত প্রাণ যাবে? ’

বৃহস্পতিবার রাতে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। থমথমে উত্তেজনা ছিলই। তবে ইমাম বলেছিলেন, ‘আল্লাহ্‌ আমার সন্তানের যতদিন আয়ু রেখেছিলেন, ততদিন সে বেঁচেছে। তাকে যারা হত্যা করেছে, আল্লাহ্‌ তাদের শাস্তি দেবেন। কিন্তু, আমার সন্তানের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার আপনাদের কারও নেই। আমার সন্তানের মৃত্যুর জন্য একটি মানুষের ওপরেও আক্রমণ করা চলবে না। বাড়িঘর, দোকানপাট ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ বা লুটপাট করা চলবে না। ইসলাম আমাদের মানুষ হত্যা শেখায় না।’

আসানসোলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় পুড়িয়ে দেওয়া গাড়ি

মাওলানার ছেলের জানাজায় উপস্থিত হওয়া রেলপার এলাকার বাসিন্দা আশফাক খান বলেন, তিনি আমাদের উদ্দেশে প্রার্থনার আগে ও পরে দুবার কথা বলেন। তার কথা শুনে আমরা কেঁদেছি। মহল্লার বাসিন্দা মুহাম্মদ ফরহাদ মালিক জানান, ইমাম সাহেবের ছেলের মৃত্যুর ঘটনাটা শুনে প্রথমে সবারই মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল। এটা তো রক্ত গরম করে দেওয়ার মতোই ঘটনা। কিন্তু ইমাম সাহেব যা বললেন, তাতে সবাই বুঝেছে, বাইরে থেকে এসে কেউ কেউ রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য অশান্তি ছড়াচ্ছে, উস্কানি দিচ্ছে। আমরা কেন তার মধ্যে জড়াব? এলাকারই আরেক হিন্দু বাসিন্দা প্রমোদ বিশ্বকর্মা জানান, ইমাম সাহেবকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব! ছেলে হারানোর পরেও রাস্তায় মাইক নিয়ে বলে বেড়িয়েছেন সবাই যেন শান্তি বজায় রাখে।  

কেবল আসানসোল নয়, গোটা ভারত থেকে প্রতিক্রিয়া আসছে টুইটারে, ফেসবুকে।  সালাম নামে একজন ভারতীয় ব্লগার ইমাম রশিদিকে সবার জন্য রোল মডেল হিসেব উল্লেখ করে লিখেছেন, যতদিন ইমাম রশিদির মতো নেতা আমাদের মধ্যে থাকবেন ততদিন ড্রাকুলা ও ভ্যাম্পায়ারদের (কাল্পনিক রক্তখোকো দানব) পরিকল্পনা কখনও সফল হবে না। ভারতের বেঙ্গালুরুর আইটি বিশেষজ্ঞ সুরেশ ভেঙ্কাতারামান লিখেছেন, আমাদের দেশের কোন রাজনীতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধের চেষ্টা করে? এই শোকার্ত মানুষটির কাছ থেকে শিখুন। হায়দরাবাদে উন্নয়ন কর্মী আতিক মোহাম্মদ টুইট বার্তায় বলেন, ইমদাদুল রশিদি নিজের শান্তির বার্তার মাধ্যমে পুরো মানবতাকে জীবন দান করলেন।

সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেও কথা বলেন মওলানা ইমদাদুল রশিদি

ইমামের ভালোবাসার বাণী যখন ছড়িয়ে পড়ে এবং তাতে চাপা পড়ে বিদ্বেষের ডাক তখন বাধ্য হয়ে বাবুল সুপ্রিয়ও নিজের অবস্থান পাল্টান। ‘চামড়া তুলে দেব’ টুইট নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেন এবং ইমামকে স্যালুটও জানিয়েছেন। অবশ্য স্থানীয় প্রশাসন, দাঙ্গায় উসকানি ছড়ানোর অভিযোগে এই নেতার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছে। চেন্নাইয়ের সাংবাদিক কার্তিক শংকর অবশ্য টুইটার ফেসবুকের এসব প্রশংসা আর বাহবাতেই সন্তুষ্ট নন। নিজের টুইট বার্তায় তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘ইমদাদুল রশিদি যদি তার ছেলের হত্যার প্রতিবাদে জনরোষ উস্কে দিতেন তাহলে কি আমরা তাকে নিয়ে উচ্চবাচ্য করতাম?’ টুইটে তিনি লিখেছেন, তার ছেলের খুনের বিচারের দাবি তোলার পরিবর্তে শুধু শুধু তার  প্রশংসা বেমানান লাগছে।

বাহাদুরগড়ের বাসিন্দা রাজা সেনগুপ্ত ইমদাদুল রশিদিকে শান্তিতে নোবেল প্রাইজ দেওয়ার দাবি জানিয়ে টুইট করেছেন। তেলেঙ্গানার বাসিন্দা ও প্রকৌশলী সৈয়দ আজহারুদ্দিন ‘শান্তিরক্ষার জন্য’ ইমদাদুল রশিদিকে স্যালুট জানিয়েছেন। ভারতীয় প্রযুক্তিবিদ সিদ্ধার্ত ইমদাদুল রশিদির বক্তব্য তুলে ধরে অন্ধকার সময়ে তাকে ‘ভারতের ভরসা’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন।