আর্কটিক সাগরে বসবাসকারী বোহেড তিমি। একটি বিশেষ ঋতুতে তাদের কণ্ঠে শোনা যায় বিচিত্র সুর। আর তাই অনেকে এখন এ তিমিগুলোকে প্রখ্যাত মার্কিন জ্যাজ সংগীতশিল্পী ‘লুই আর্মস্ট্রং’-এর নামে ডাকতে শুরু করেছেন। নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে সমুদ্রবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রজনন ঋতুতে এ প্রজাতির তিমিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সারাক্ষণ বিচিত্রকমের গান গেয়ে যায় এবং এ গান দিয়ে একে অপরকে কাছে ডাকে। হাইড্রোফোন (পানির তলদেশে ব্যবহার উপযোগী মাইক্রোফোন) ব্যবহার করে শব্দ রেকর্ড করার পর এ ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন তারা। বিজ্ঞানীরা বোহেড তিমির গান গাওয়ার এ স্টাইলকে তুলনা করছেন জ্যাজ সংগীতের সঙ্গে। তবে বোহেড তিমি কেন এমন আচরণ করে সে ব্যাপারে এখনও জানা যায়নি। আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন বোহেড তিমির বিচিত্র ধারার গান গাওয়ার কারণ উদঘাটনের পরিকল্পনা করছেন গবেষকরা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পিটসবেরজেন বোহেড তিমিগুলো খুব বিপন্ন অবস্থায় আছে। সপ্তদশ শতকে তিমির বাণিজ্যকরণ শুরু হওয়ার পর পরই এ প্রজাতির তিমি শিকার শুরু হয়। ঘণ্টায় এসব তিমি সাধারণত ১-৩ মাইল গতিতে চলতে পারে। এরা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬ মাইল যেতে পারে। আর সেকারণে সহজেই এরা শিকারিদের হাতে ধরা পড়ে। আর সেকারণে এ তিমিগুরো প্রায় বিলুপ্ত অবস্থায় আছে। বোহেড তিমির মুখ খুব বড়। গবেষকরা জানান, শীতকালীন প্রজনন ঋতুতে বোহেড তিমি ধারাবাহিকভাবে তাদের কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করতে থাকে। এ ঋতুতে বোহেড তিমির একটা বড় অংশ মেরু অঞ্চলের ২৪ ঘণ্টার রাত্রিকালীন অন্ধকারে বরফের তলায় থাকে। প্রজনন ঋতুতে দিনে ২৪ ঘণ্টা গান গায় বোহেড তিমি। এসময় হাইড্রোফোন ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা তিমিদের স্বর রেকর্ড করেছেন।
২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ডের পূর্বাঞ্চল থেকে পডে করে সংগ্রহকৃত অডিও ডাটা বিশ্লেষণ করার পর বায়োলজি লেটারস-এ গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে রেকর্ড থেকে মোট ১৮৪টি গান কিংবা সুর শনাক্ত করেন গবেষকরা।
সর্বপ্রথম ২০০৭ সালে পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রিনল্যান্ডে গান করা বোহেড তিমি শনাক্ত করেন অধ্যাপক স্টাফোর্ড। তিনি বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই আশা করছিলাম যে হাইড্রোফোন স্থাপন করলে আমরা কিছু না কিছু শব্দ পাব। কিন্তু যখন রেকর্ডকৃত শব্দ শুনলাম, তখন হতবাক হয়ে গেলাম। নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বোহেড তিমি জোরে জোরে গান গেয়ে যাচ্ছিলো, দিনে ২৪ ঘণ্টা গান গাচ্ছিলো তারা। আর তাদের গানগুলো একটি থেকে আরেকটি অনেক ভিন্ন ছিল।’
পরবর্তীতে যে রেকর্ডগুলো করা হয়েছিল, তাতে দেখা যায় বোহেড তিমির সংগীত ঋতু শুরু হয় শরতের শেষ থেকে। আর বসন্তের শুরু পর্যন্ত তা চলতে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাইড্রোফোন স্থাপন করে দেখা গেছে গানের মাত্রা আরও বেড়েছে।
গবেষক এবং ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক কেট স্টাফোর্ড বোহেড হোয়েলের গানের ধরনকে জ্যাজ সংগীতের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘হাম্পব্যাক তিমির গান যদি হয় ক্লাসিক্যাল সংগীতের মতো তবে বোহেডের গান হবে জ্যাজ সংগীত। তাদের সুর অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত। চারটি শীতকালীন ঋতুতে রেকর্ডকৃত স্বর বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি কেবল যে কয়েক বছরের মধ্যে কোনও গানের পুনরাবৃত্তি হয়নি তাই নয়, বরং প্রত্যেক ঋতুতেই নতুন নতুন ধরনের গান পাওয়া গেছে।’
বোহেড তিমির যে বিশেষ বৈশিষ্ট্যটি বিজ্ঞানীদের বেশি আকৃষ্ট করেছে, তাহলো তাদের গানের বৈচিত্র্য। তবে বোহেড তিমি কেন এতো বিচিত্র সুর করে তা জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। স্ত্রী ও পুরুষ দুই লিঙ্গের বোহেড তিমিই গান গায় কিনা তাও এখনও জানা যায়নি। হাম্পব্যাক প্রজাতির তিমির ক্ষেত্রে দেখা গেছে কেবল পুরুষ হাম্পব্যাকরাই গান গায়।
বোহেড তিমিরা শীতকালে এ ধরনের আচরণ করে থাকে। শীতকালে মেরু অঞ্চলের ২৪ ঘণ্টার অন্ধকারে তারা সাগরের বরফের নিচে থাকে। সেকারণে কেন তারা বিচিত্র গান গায় তা শনাক্ত করা সহজ কাজ নয়। বিজ্ঞানীরা এখন তাদের গবেষণা বিস্তৃত করতে চাইছেন। এক্ষেত্রে বোহেড তিমির গায়ে রেডিও ট্যাগ স্থাপনের পরিকল্পনা করছেন তারা।