মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক উত্তোরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে অং সান সু চি’র নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) বিজয় আশাবাদী করেছিল সে দেশের সাংবাদিকদের। অপেক্ষাকৃত গণতান্ত্রিক কর্মপরিবেশের আশা ছিল তাদের। তবে সু চি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে প্রাধান্যশীলতায় নিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে মনে করছে সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোটার্স উইদাউট বর্ডার (আরএসএফ)। রাখাইন রাজ্যে সংবাদমাধ্যম ও সংবাদকর্মীদের বিপন্নতার কথা উঠে এসেছে সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের সময় থেকে উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইনকে সংবাদ ও তথ্যের মৃত্যুকূপ বানিয়েছে মিয়ানমার।
প্রতিবছরই বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা-সূচক প্রকাশ করে আরএসএফ। সূচকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করে তারা। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো ব্ল্যাকলিস্টেড বা কালোতালিকাভুক্ত হয়। এর চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে রাখা হয় লাল তালিকায়। কিছুটা ভালো অবস্থানে থাকা দেশগুলো চিহ্নিত হয় হলুদ রং দিয়ে। আর যে সব দেশ সংবাদমাধ্যমের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা ভোগ করে, সেই দেশগুলো অন্তর্ভূক্ত হয় সাদা তালিকায়। এবারের তালিকাতে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে মিয়ানমারের অবস্থান হয়েছে লাল তালিকার ১৩৭ নম্বর দেশ হিসেবে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে নরওয়ে। আর তালিকায় সবার নিচে ১৮০তম স্থানে জায়গা হয়েছে উত্তর কোরিয়ার।
অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সামরিক-বৌদ্ধতন্ত্রের প্রচারণায় রাখাইনে ছড়ানো হয়েছে রোহিঙ্গা-বিদ্বেষ। ২০১৬ সালের আগস্টে অভিযান জোরদার করার আগের কয়েক মাসের সেনাপ্রচারণায় সেই বিদ্বেষ জোরালো হয়। এরপর শুরু হয় সেনা-নিধনযজ্ঞ। হত্যা-ধর্ষণ ও ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়ার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের মাধ্যমে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য করা হয় ৬ লাখ ৯২ হাজার মানুষকে। পুড়িয়ে দেওয়া রোহিঙ্গা আবাস বুলডোজারে গুড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করা হয় মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত। এক পর্যায়ে সেনা অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হলেও অব্যাহত থাকে জাতিগত নিধন। এরপর সামরিকায়নকে জোরালো করতে অবশিষ্ট ঘরবাড়িও নিশ্চিহ্ন করা হয়। মিয়ানমার এইসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে রাখাইনে অবাধ প্রবেশাধিকার দিতে রাজি হয়নি এ পর্যন্ত।
রিপোটার্স উইদাউট বর্ডারের ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাই রাজ্যে সামরিক হস্তক্ষেপের পর সাংবাদিকদের অবস্থা সংকটপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা। রাজ্যের উত্তরাঞ্চলীয় অংশ সংবাদ ও তথ্যের মৃত্যুকূপে (ব্ল্যাক হোলে) পরিণত হয়। যেসব সাংবাদিক সেখানে কী চলছে তা নিয়ে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছেন তাদেরকে কারাবরণ করতে হয়েছে।
রোহিঙ্গা নিধনের ঘটনা অস্বীকার করে সমালোচিত হয়েছেন এক সময় গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের প্রতিকী ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়া মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চি। বিশ্বব্যাপী নিন্দার পাশাপাশি বহু সম্মাননা হারিয়েছেন তিনি। প্রতিবেদনের মিয়ানমার অংশে বলা হয়েছে, এনএলডি নির্বাচনে জয় পাওয়ার পর দেশটির সাংবাদিকরা আশা করেছিলেন সরকার ও সেনাবাহিনীর সমালোচনার জন্য তাদেরকে আর কখনও গ্রেফতার কিংবা কারান্তরীণ হওয়ার ভয়ে থাকতে হবে না। কিন্তু অং সান সু চি সরকারের প্রাধান্য পাওয়া বিষয়গুলোর মধ্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টি ছিল না। ২০১৭ সালে প্রায় ২০ জন সাংবাদিকের বিচার করা হয়েছিল। এদের মধ্যে অনেককেই টেলিযোগাযোগ আইনের ৬৬ (ডি) ধারার আওতায় বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল।
টেলিযোগাযোগ আইনের ৬৬ (ডি) ধারা অনুযায়ী, অনলাইনে মানহানিকে অপরাধ বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। মিয়ানমারে স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের সংস্কৃতি জোরালো হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনী নাখোশ হতে পারে এমন কোনও গল্প কিংবা তথ্য প্রকাশ থেকে সাংবাদিকরা বিরত থাকে। মিয়ানমারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে থাকা শান ও কাচির সংখ্যালঘুদের সংঘাত নিয়ে খবর সংগ্রহ করার ক্ষেত্রেও মিডিয়াকে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
মিয়ানমার আদতে রাষ্ট্রীয়ভাবেই মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় নিয়োজিত। গত বছরের ১১ আগস্ট থেকে ১৩ আগস্ট মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক উত্তোরণ বিষয়ক এক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেই আলোচনায় ছিলেন ‘মিয়ানমার টাইমস-এর সম্পাদক ও নির্বাহী পরিচালক কাভি চংকির্তাভন। আলোচনায় তার চাকরিগত দায়িত্ব ব্যাখ্যা করেছেন চংকির্তাভন। বর্তমান সরকারের অধীনে মিডিয়ার ভূমিকা কী, এমন এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি সাফ বলেন, ‘সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো মিয়ানমার সংক্রান্ত ইতিবাচক বয়ান নির্মাণ করা। আপনি অং সান সু চির মন্তব্য পড়েন, কিংবা নিউ লাইট অব মিয়ানমার পড়েন কিংবা যাই পড়ছেন, তার সবকিছুই আসছে সরকারের পক্ষ থেকে। এই সরকার মিয়ানমারের ইতিবাচক ভাবমূর্তি নির্মাণ করতে চায়, যা একেবারেই অনুপস্থিত। যা দরকার, তা হলো বিপুল সংখ্যক মানুষের একই জিনিস বিশ্বাস করা।’