আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশের শহুরে এলাকা থেকে সব ধরণের মাদক উৎপাদন কেন্দ্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সেখানকার এক তালেবান কমান্ডার। এসমস্ত স্থাপনা লক্ষ্য করে মার্কিন বিমান হামলায় বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে খবর দিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান। সংবাদমাধ্যমটির দাবি এই সংক্রান্ত আলোচনার রেকর্ড তাদের কাছে রয়েছে।
প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও আফগানিস্তানের আফিম ব্যবসার বেশিরভাগই নিয়ন্ত্রণ করে তালেবান। জাতিসংঘের হিসেবে গত বছর বিশ্বের মোট আফিম উৎপাদনের ৮৭ শতাংশ আফগানিস্তানে উৎপাদিত হয়েছে। পপি চাষের ওপর ১০ শতাংশ কর আদায় করে তারা। স্থানীয়রা বলছেন প্রকাশ্য বাজারে পপি বীজ বিক্রি করতে দিতে এখন থেকে অতিরিক্ত কর আদায় করা হচ্ছে। এই খাত থেকে তালেবানদের আয় কমাতে চলতি বছরে বিমান হামলা জোরালো করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ওয়াকিটকিতে নিজ সহকারির সঙ্গে তালেবান কমান্ডারের আলোচনার অডিওটি নিজেদের হোয়াটঅ্যাপস গ্রুপে শেয়ার করা হয়েছে। ওই আলোচনায় হেলমান্দের ছায়া সরকারের তালেবান গভর্নর মোল্লা মান্নান বলেন একটি পরীক্ষা কেন্দ্রের জন্য শত শত মানুষ মিসাইল আর বোমা হামলার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সেকারণে তা পার্বত্য ও উপত্যকা এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হোক।
তালেবান বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা্ও এই রেকর্ডিংয়ের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তারা বলছেন গত ১৭ বছর ধরে এভাবেই অবস্থান বদলে মার্কিন প্রশাসনকে পরাজিত করে যাচ্ছে আফগান তালেবানরা।
গত সোমবার মার্কিন পর্যক্ষেকদের প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে তালেবানদের বিরুদ্ধে আমেরিকার এই ধরনের ছোট অপারেশনের সাফল্য সীমিত। মোল্লাহ মান্নানের বার্তায় এই ইঙ্গিত স্পষ্ট যে মাদক পরীক্ষা কেন্দ্রের এলাকায় বিমান হামলার ঘটনায় স্থানীয়দের নাখোশ হওয়াকে ভয় পাচ্ছে তালেবান।
গার্ডিয়ান জানিয়েছে স্থানীয়দের হতাহতের শঙ্কায় বছরের পর বছর আফিম প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্রে হামলা চালানো এড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই খাত থেকে তালেবানদের আয় কমাতে চলতি বছরে বিমান হামলা জোরালো করেছে তারা। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে গত বছরের তুলনায় অন্তত তিনগুন বেশি বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
সহকারিকে পাঠানো বার্তায় মোল্লাহ মান্নান বলছেন, আকাশে ড্রোন উড়তে দেখে নারী-পুরুষি আর শিশুরা বোমা হামলার ভয় পাচ্ছে। আমরা মানুষদের কঠোরভাবে জানিয়ে দিতে চাই জনবসতিতে থাকা মাদক কারখানাগুলো বন্ধ করা না হলে তাদের অবশ্যই জেলে যেতে হবে। তিনি বলেন, এই ধরনের কারখানার অনুমোদন কোনও তালেবান সদস্য দিলেও তাকে শাস্তি পেতে হবে।
মাদক বাজারের জন্য বিখ্যাত সীমান্ত অঞ্চলের বাজার বারাম শাহের কয়েকটি বাড়ি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। আমার এক নৈশপ্রহরী চাচা মার্কিন বিমান হামলার সময়ে বাজারে ছিলেআর তিনি মারা গেছেন। জান মুহাম্মদ নামে এক বাসিন্দা গার্ডিয়ানকে বলেন, তিনি সাত সন্তান রেখে গেছেন।
হেলমান্দের মুসা কালা শহরে চালানো হয় আরেকটি বিমান হামলা। ওই হামলায় নিহত হয় হাজি হাবিবুল্লাহ নামে এক হেরোইন উৎপাদনকারী। তার স্ত্রী ও ছয় সন্তান এখন মাদক বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে চালানো একশোটি বিমান হামলায় কোনও বেসামরিক হতাহত হয়নি বলে দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র গার্ডিয়ানকে পাঠানো ইমেইলে বলেছেন, ‘আজ পর্যন্ত আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনী বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে কোনও বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগ পায়নি।’
তবে লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিকসের শিক্ষক ও গবেষক ডেভিড ম্যানসফিল্ড বলছেন, মার্কিন কর্তৃপক্ষের এই ঘোষণা সম্ভব টার্মের বদল। কারন হিসেবে তিনি তার সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধে লিখেছেন, এই ধরনের পরীক্ষা কেন্দ্রে যারা কাজ করেন অথবা বসবাত করেন তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্র আর বেসামরিক নাগরিক হিসেবে দেখছে না। তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত বেসামরিক মানুষ হিসেবে দেখে শত্রুপক্ষের যোদ্ধা ও প্রাণঘাতী অস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।