১২ লাখ রোহিঙ্গার দুই তৃতীয়াংশ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে ঈদ উদযাপন করছে। এদের মধ্যে ৭ লাখ রয়েছে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে। দৈনন্দিন ভোগান্তির সঙ্গে তারা এখন চিন্তিত মৌসুমী বৃষ্টিজনিত ধস নিয়ে। ঈদের আনন্দ নেই শিবিরে থাকা শরণার্থীদের মধ্যে। শিশুরাও এই বাস্তবতা বুঝে নিয়েছে। ঈদের দিনে তারাও চালিয়ে যাচ্ছে দৈনন্দিন অস্তিত্বের লড়াই। উৎসব নিয়ে ভাবনার সময় নেই তাদের। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির সরেজমিন পরদর্শন করে ঢাকা ট্রিবিউনের পক্ষে তারেক মাহমুদ সেখানকার ঈদ উদযাপনের বাস্তবতা তুলে এনেছেন। বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য সেই প্রতিবেদনের ভাষান্তর প্রকাশ করা হলো।
‘ভারি বৃষ্টিপাতে যে কোনও সময় ধসে পড়তে পারে আমাদের ঘর।’ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেণ কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের ডি-ফোর অঞ্চলের শিবিরে থাকা এক রোহিঙ্গা। মোহাম্মদ হোসেন নামের সেই রোহিঙ্গা বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের ভাবনায় কেবল একটাই বিষয় থাকে, তা হলো অস্তিত্ব রক্ষা, আমার পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখা’।
গত বছরের আগস্টে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। সে সময় মংডু জেলা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন মোহাম্মদ হোসেন। ঢাকা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন ত্রাণ সংস্থার কাজ থেকে অনেক সংগ্রাম করে খাবার যোগাড় করে আমার পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে, ঈদ নিয়ে ভাবার সময় কোথায়?’
বালুখালী শরণার্থী শিবিরে আছেন ৪০ বছর বয়সী আব্দুর রহমান। বাংলাদেশে এসে তিনি যে মানষিক বিপর্যস্ততা থেকে রক্ষা পেয়েছেন, তাতেই তিনি খুশি। ‘নিজ বাড়ির [রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমার সরকারের জ্বালিয়ে দেওয়া নিজস্ব ঘরবাড়ি] মতো করে এখানে ঈদ পালনের সুযোগ নেই, তবে আমি যে বেঁচে আছি, এতেই আমি ভীষণ খুশি’। তিনি বলেন, ‘এই ঈদের দিনে আমরা স্মরণ করছি হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া পরিবার আর বন্ধুদের এই ঈদ যাদের কাছে বিষাদের বার্তা নিয়ে এসেছে’।
মংডুর বলিবাজার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন রাজ্জাক মিয়া। তিনি জানান, হারানো বন্ধু ও স্বজনদের স্মৃতি হয়ে তার কাছে এসেছে এবারের ঈদ।
রাখাইনে মিয়ানমারের নিধনযজ্ঞের দ্বারা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিয়ানমারের শিশুরা। প্রয়োজনীয় মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষা তারা পায়নি। এদের কেউ কেউ বাংলাদেশে এসেছে পরিবারের সদস্য ছাড়াই, একা একা। শৈশব হারানো এমনই এক রোহিঙ্গা শিশু ১০ বছর বয়সী নুরু। সে জানায়, তার পরিবার খুবই গরীব। দিনের খাবার যোগাড় করতেই অনেক কাঠখোড় পোহাতে হয় তার বাবাকে। নুরু ঢাকা ট্রিবিউনকে বলে, ‘ঈদে আমার কোনও চাওয়া নেই। আমার জন্য নতুন কাপড় কিনতে বলে আমার বাবা-মা’র বোঝা বাড়াতে চাই না আমি। এমনিতেই তারা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন পার করছে’।
স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে রোহিঙ্গা শিবিরে কাজ করে ১৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ রফিক। রফিক ঢাকা ট্রিবিউনকে জানায়, ‘ঈদের দিনে বন্ধুদের সঙ্গে একত্রিত হবো। ত্রাণ পাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়াব। এরপর দিনের বাকী সময় বন্যা ও ভূমিধস থেকে প্রতিবেশিদের ঘর রক্ষার কাজে ব্যয় করব’।
বেশকিছু রোহিঙ্গা সংগঠন দাবি করেছে, ঈদ উপলক্ষে রোহিঙ্গাদের মধ্যে নতুন কাপড় ও খাবার বিতরণ করা হয়েছে। তবে শরণার্থী শিবির সরেজমিন পরিদর্শন করে সেখানে উৎসবের তেমন কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
রিফিউজি রিহ্যাবিটেশন ও রিলিফ কমিশন অফিস থেকে দাবি করা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ঈদের নামাজের জন্য শরণার্থী শিবিরে পর্যাপ্ত মসজিদ রয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের দিক থেকে ঈদের নামাজ নিয়ে কোনও পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানা যায়নি।
সৌজন্য: ঢাকা ট্রিবিউন