মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন দেশটির বামপন্থী নেতা আন্দ্রেজ ম্যানুয়েল লোপেজ ওবরাদোর। মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেক্সিকোনীতির বিরুদ্ধে শক্তি খুঁজতে তাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। রবিবারের নির্বাচনের পর ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, ট্রাম্পকে ঠেকাতেই ওবরাদোরকে ভোট দিয়েছেন ভোটাররা। মেক্সিকানরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ১ কোটি ২০ লাখ অভিবাসীকে রক্ষার জন্য ওবরাদোরই সবচেয়ে যোগ্য; তিনিই পারবেন অভিবাসী মেক্সিকানদের স্বার্থ রক্ষা করতে।
ট্রাম্পের এমন মেক্সিকোনীতির প্রতিক্রিয়ায় ওবরাদোর বলেছিলেন, মেক্সিকোকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের খেলার পুতুল হতে দেবেন না। অর্থনৈতিক উন্নয়নে বামপন্থী এই নতুন প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনাকে জাতীয়তাবাদী কর্মসূচি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তিনি অবসর ভাতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোরও আশ্বাস দিয়েছেন। এই বামপন্থী জাতীয়তাবাদী প্রেসিডেন্ট গত জানুয়ারিতে বলেছিলেন, ‘আমরা অপমানজনক কোনও কিছু না করেই ট্রাম্পকে দেখিয়ে দিতে চাই, তার অবস্থান আসলে কোথায়’।
শুরু থেকেই ট্রাম্প মেক্সিকোকে নিয়ে যেসব বক্তব্য দিয়ে আসছেন তা কোনও মেক্সিকানেরই ভালো লাগার কথা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত সাময়িকী টাইমের এক নিবন্ধে মেক্সিকো ও মেক্সিকানদের বিভিন্ন সম্পর্কে ট্রাম্পের করা নানান মন্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি হলো, ‘যুক্তরাষ্ট্র কবে মেক্সিকো ও অন্যান্যদের মতো শত্রু রাষ্ট্রের পেছেনে অর্থ খরচ বন্ধ করবে?’, ‘মেক্সিকোর বিচারব্যবস্থা দুর্নীতিপরায়ণ, ঠিক মেক্সিকোর বেশির ভাগটার মতোই।’, ‘সীমান্তে অনতিক্রম্য দেওয়াল নির্মাণ ছাড়া মেক্সিকো সম্পর্কে আমি আর কিছু ভাবি না’। ট্রাম্প আরও বলেছেন, ‘মেক্সিকানরা আমাদের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশ্বাস করুন, তারা আমাদের বন্ধু নয়।’
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী মেক্সিকানদের সম্পর্কে ট্রাম্পের ভাষ্য, ‘মেক্সিকো থেকে যারা আসে তারা সবচেয়ে ভালো মেক্সিকানদের অংশ নয়। তারা সমস্যায় জর্জরিত লোকজনদের পাঠায়। যুক্তরাষ্ট্রে তারা মাদকের সমস্যা নিয়ে যায়। তারা অপরাধ নিয়ে যায়। তারা ধর্ষক।’ মেক্সিকো সরকারের প্রতি ট্রাম্পের মনোভাব হলো, ‘আমি মেক্সিকানদের ভালোবাসি কিন্তু মেক্সিকো আমাদের বন্ধু নয়। তারা আমাদের সীমান্তে পরাজিত করছে। এখন তারা আমাদের জীবিকা ও বাণিজ্যও দখলে নিয়ে নিচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।’
এসব তীর্যক মন্তব্যের পাশাপাশি সীমান্তে দেওয়াল তোলার খরচ মেক্সিকোর কাছ থেকেই আদায় কারা হুমকি দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের জন্য উন্মুক্ত পড়ে আছে। আমাদের সীমান্ত সুরক্ষার জন্য দেয়াল নির্মাণ করা দরকার এবং তার খরচ মেক্সিকোকে দেওয়া বৈদেশিক সহায়তা তহবিল থেকেই কেটে রাখতে হবে।’ মেক্সিকো অবশ্য বরাবরই সীমান্তে দেওয়াল তৈরির বিষয়ে কোনও ব্যয়ভার বহনের বিষয়ে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
ট্রাম্পের মেক্সিকোবিরোধী বক্তব্যের জন্য শুধু ওবরাদোরই নন, মেক্সিকোর অন্য রাজনীতিকরাও ট্রাম্পবিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন। ওবরাদোরের প্রতিপক্ষ রিকার্দো নাইয়াও ট্রাম্পবিরোধী জনমত লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘মেক্সিকানদের সম্মান দেখিয়ে কথা বলার বিষয়ে ট্রাম্পের কাছে দাবি জানানো উচিত।’
পলিটিকো লিখেছে, ট্রাম্পবিরোধী অবস্থান দিয়েই মেক্সিকানদের সবচেয়ে দ্রুত একতাবদ্ধ করা যায়। মেক্সিকান সংস্থা কনসালটা মিটোফ্সকির গত জুনে চালানো জরিপ মোতাবেক, দেশটির ৮০ শতাংশ মানুষই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অপছন্দ করেন। আর তারই ফলাফল পাওয়া গেছে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে।
ট্রাম্প প্রশাসনের রুঢ় আচরণের সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় মেক্সিকান অভিবাসীরা শুধু ভোট দেওয়ার জন্যই যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোতে গিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ভোট দিতে যাওয়া মেক্সিকান নাগরিকরা রয়টার্সকে বলেছেন, অভিবাসী মেক্সিকানদের স্বার্থ রক্ষায় ওবরাদোরের ওপরই তাদের ভরসা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলস থেকে ওবরাদোরকে ভোট দিতে মেক্সিকোতে যাওয়া ব্যক্তিদের একজন লুইস ইভান্স। তার ভাষ্য, ‘যদি ওবরাদোর মেক্সিকোয় পরিবর্তন আনতে না পারেন, তাহলে ঈশ্বরের হাতে সব ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর উপায় থাকবে না।’
যুক্তরাষ্ট্রের স্যাকরামেন্টো থেকে ভোটারদের জন্য ভাড়া করা বাসে করে মেক্সিকোতে গেছেন ৪৪ বছর বয়সী জোসেফিনা সেরানো। তিনি জানান, মেক্সিকোর দুর্নীতি ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা মেক্সিকানদের স্বার্থ রক্ষায় তিনি ওবরাদোরকে বেছে নিয়েছেন। তার মতে, ‘আমি ফিরে এসেছি। কারণ আমি পরিস্থিতির পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে চুপ করাতে চাই। যুক্তরাষ্ট্রে থাকলে শুধু মেক্সিকান হওয়ার জন্যই নিন্দার শিকার হতে হয়। এটা শুধু ট্রাম্প করেন না, সবাই করে। তারা মনে করে, আমরা সবাই দুর্নীতিপরায়ণ।’
যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলভিত্তিক জরিপ সংস্থা ল্যাটিনো ডিসিশনস প্রকাশিত মে মাসের জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বসবাসরত মেক্সিকানদের ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে ২৩ পয়েন্ট এগিয়ে ছিলেন ওবরাদোর। বিশেষ করে যারা ইমেইলে ভোট দিতে পারেন তাদের মধ্যে এই প্রবণতা দেখা গেছে। মেক্সিকোতে গিয়ে নিবন্ধন করার বিধান পরিবর্তন করে দূতাবাসেই নিবন্ধন করার আইন জারি করে দেশটির সরকার। এর ফলে এই নির্বাচনে এক লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি মেক্সিকান বিদেশ থেকে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছিলেন। তাদের মধ্যে ৯৮ হাজারেরও বেশি ভোটার বিদেশে বসেই ভোট দিয়েছেন।