সংসদেই সাংবাদিকদের হুমকি দিলেন মিয়ানমারের সামরিক সাংসদ

মিয়ামারের সামরিক বাহিনীর নিয়োগ দেওয়া এক সাংসদ সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয়েছেন সংসদেই। বুধবার রাজধানী নেপিদোতে পার্লামেন্ট ভবনের সামনে ছবি তোলা সাংবাদিকদের মার দেওয়ার হুমকি দেন ওই সাংসদ। এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সামরিক বাহিনীর কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেছে দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো।সবুজ পোশাকে মিয়ানমারের সামরিক সাংসদ তিন সুয়ে উইন

মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ইরাবতির খবরে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরুর আগে মেজর জেনারেল তিন সুয়ে উইন নামের ওই সাংসদ পার্লামেন্ট ভবনের সামনে ইউরোপিয়ান প্রেস এজেন্সির এক আলোকচিত্রী সাংবাদিককে হুমকি দেন। ওই সাংবাদিককে তার ছবি তোলা ও তাকে নিয়ে কোনও কিছু অনলাইনে প্রকাশ করতে নিষেধ করেন। এমন কিছু করা হলে তাকে ঘুষি মারবেন বলে হুমকি দেন ওই সাংসদ।

একইদিন অধিবেশনের পর মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম মিজিমার এক কর্মীর ওপর অশ্লীল ভাষায় চড়াও হন ওই সাংসদ। সংবাদমাধ্যমে আসন্ন অর্থবছরের জন্য সামরিক বাহিনীর জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের সঙ্গে ওই সাংসদের চড়াও হওয়ার ভিডিও প্রকাশ হয়েছে।

মেজর জেনারেল তিন সুয়ে উইন পাইন ও লিন’র ডিফেন্স সার্ভিস অ্যাকাডেমি থেকে প্রতিরক্ষা শিক্ষায় মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন। পার্লামেন্টের সদস্য নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি নেপিদো কমান্ডের সহায়ক বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।

মিয়ানমার জার্নালিজম ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষণ পরিচালক উ সেইন উইন বলেন, ‘তার বিচক্ষণ হওয়া উচিত। পার্লামেন্ট তার এই ভাষায় কথা বলা উচিত না।’ ইরাবতিকে তিনি বলেন, ‘এটা যুদ্ধের ময়দান নয়, এটা পার্লামেন্ট। তাকে অবশ্যই নিজেকে সংযত রাখতে হবে।’

মিয়ানমারের অং সান সু চির দল ন্যাশনাল-লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) নেতৃত্বাধীন সরকার পার্লামেন্টের সংবাদ সংগ্রহের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে। ওই বিধিনিষেধ মেনে নির্ধারিত জায়গায় থেকে ইউনিয়ন পার্লামেন্ট অধিবেশনের খবর সংগ্রহের সময় সামরিক বাহিনীর ওই কর্মকর্তা সাংবাদিকদের হুমকি দিয়েছেন।

উ সেইন উইন বলেন, ‘সংবাদমাধ্যম তাদের কাজ করছিল। তারা কোনও নিয়ম ভাঙেনি। সংবাদপ্রতিষ্ঠানগুলো সামরিক বাহিনীর কাছে একটি অভিযোগপত্র পাঠাবে। তার আচরণে মনে হয় তিনি আমাদের কাজকে সম্মান করেন না। এটা অগ্রহণযোগ্য।’

২০১৬ সালে মিয়ানমারের ইউনিয়ন পার্লামেন্ট কার্যালয় থেকে সংবাদমাধ্যমের জন্য ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করে। এতে প্রতি প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ পাঁচজন সাংবাদিককে পার্লামেন্ট বিষয়ক খবর সংগ্রহ ও নির্ধারিত এলাকায় সাংসদদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়। এছাড়া অনুমতি ছাড়া পার্লামেন্টের বিশেষ কিছু ভবন ও এলাকার ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণ করতে নিষেধ করা হয়।

আগের সরকারের সময়েও পার্লামেন্টের অধিবেশন কক্ষের পর্যবেক্ষণ বুথে সাংবাদিকদের প্রবেশের ওর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তার পরিবর্তে পার্লামেন্টের করিডরে রাখা টিভিতে অধিবেশন দেখতে বাধ্য করা হয়। সংবাদকর্মীরা বলে থাকেন অধিবেশন কক্ষে সাংসদদের ঘুমানোর ছবি তোলা ও এক সামরিক আইন প্রণেতা অন্যের হয়ে ভোট দেওয়ার খবর প্রকাশের পর তৎকালীন সরকার এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

মিয়ানমারের সংবাদকর্মীরা বলছেন, সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাং তার বাহিনীর কর্মকর্তাদের সংবাদমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ার তাগিদ দিলেও তা মানছে না সামরিক কর্মকর্তারা। এই ঘটনা তাই প্রমাণ করে।

হিনথা মিডিয়ার প্রধান সম্পাদক উ নাইয়ান লিন বলেন, বহু বছর ধরেই সামরিক বাহিনী মিডিয়ার সঙ্গে এমন আচরণ করে আসছে। নিজেদের প্রয়োজন পড়লেই তারা কেবল সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

মিজিমার সংবাদকর্মী কো মিন মিন বলেন, কোনও ধরণের প্ররোচনা ছাড়াই এক সামরিক আইনপ্রণেতা তার ওপর চড়াও হয়েছেন এটা মেনে নেওয়া যায় না। তিনি জানান, সামরিক আইনপ্রণেতা ও পার্লামেন্টারি অধিকার কমিটির কাছে অভিযোগ দায়েরের বিষয় বিবেচনা করছেন তিনি।

বুধবারের ওই ঘটনার পর মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যমগুলোতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, মেজর জেনারেল তিন সুয়ে উইনের এই ঘটনার পর নতুন করে পুরনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যমই এই ঘটনায় সামরিক বাহিনীর কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেছে।

মিয়ানমার প্রেস কাউন্সিলের সদস্য ই মিয়ান্টর কিয়াও বলেন, অবস্থানের কারণেই পার্লামেন্টে অন্যদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে পারেন না তিনি, এমনকি মিডিয়ার সঙ্গেও নয়। সামরিক কর্মকর্তাদের এই ঘটনা তদন্ত করা উচিত আর কেন তা ঘটেছে তা ব্যাখ্যা করা উচিত। তিনি বলেন, আমাদের অপেক্ষা করে দেখতে হবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী কিভাবে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানায়।

সংবিধান অনুযায়ী মিয়ানমারের পার্লামেন্টের দুই কক্ষ রয়েছে। এর নিম্নকক্ষে ৪৪০টি আসন আর উচ্চকক্ষে ২২৪টি আসন মিলিয়ে মোট আসন সংখ্যা ৬৬৪টি। এদের ৭৫ শতাংশ বা ৪৯৮ জন সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। আর বাকি ২৫ শতাংশ বা ১৬৬ আসনে সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয় ডিফেন্স সার্ভিসের কমান্ডার ইন চিফ।