জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ ওকিনাওয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থানান্তর পরিকল্পনার প্রতিবাদে শনিবার বিক্ষোভ করেছে হাজার হাজার মানুষ। টাইফুনের আশঙ্কা আর বৃষ্টিপাত উপেক্ষা করে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ ওই দ্বীপের রাজধানী নাহার একটি পার্কে সমবেত হয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, সমবেত বিক্ষোভকারীরা সামরিক ঘাঁটি বিরোধী স্লোগানসহ ওকিনাওয়ার প্রয়াত গভর্নর তাকেশি ওনাগার স্মরণে নিরবতা পালন করে।
ওকিনাওয়া দ্বীপের জনবহুল এলাকা ফুটেনমায় রয়েছে মার্কিন মেরিন সেনাদের সামরিক ঘাঁটিটি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঘাঁটিটি সেখানকার পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। বাস্তুসংস্থান প্রক্রিয়া ধ্বংস করে হুমকির মুখে ফেলছে সেখানকার লাখ লাখ প্রাণকে। সরকার তাই ঘাঁটিটিকে সেখানকার অপেক্ষাকৃত কম জনবহুল অঞ্চল হেনোকো সাগরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে পরিবেশের বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না।
উপকূলে মার্কিন ঘাঁটির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন ওকিনাওয়ার সদ্য সাবেক গভর্নর তাকেশি ওনাগা। গত বৃহস্পতিবার (১০ আগস্ট) ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারানো ওনাগার স্মরণে নীরবতা পালিত হয়েছে। ২০১৪ সালে গভর্নর নির্বাচিত হওয়া ওনাগা ঘাঁটি স্থানান্তরে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের প্রবল বিরোধী ছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তিনি ওকিনাওয়া দ্বীপবাসীর কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করবার অভিযোগ তুলেছিলেন। সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করেছিলেন তিনি।
ঘাঁটি নির্মাণে সেখানে জমি ভরাটের প্রয়োজন। তাকেশি ঘোষণা দিয়েছিলেন, পূর্বসুরির দেওয়া জমি ভরাটের অনুমোদন প্রত্যাহার করে নেবেন তিনি। ওকিনাওয়াবাসী হেনোকো সাগরে মাটি ভরাটে কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা আটকানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। নতুন সামরিক ঘাঁটি নির্মানে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই মাটি ভরাটের কাজ শুরু হবে। তবে শনিবারের বিক্ষোভে প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে ওকিনাওয়ার ডেপুটি গভর্নর অঙ্গীকার করেছেন, ওনাগার প্রতিবাদী ঘোষণার ধারাবাহিকতা রক্ষা করবেন তিনি। পরিবেশবাদীরা বলছেন নতুন এই নির্মাণ উপকূলের কোরাল ও সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী ডুজোনসকে বিপন্ন করে তুলবে।
শনিবারের বিক্ষোভে যোগ দেওয়া অনেকেই ‘হেনোকো নতুন ঘাঁটি, না’ ‘ওকিনাওয়াবাসীরা হাল ছাড়বে না’ লেখা প্লাকার্ড নিয়ে হাজির হয়। স্থানান্তর পরিকল্পনা বাতিলে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে উপস্থাপনের জন্য একটি প্রস্তাবে সম্মত হয় তারা। কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্য বলছে, জাপানে অবস্থানরত ৫৯ হাজার মার্কিন সেনার মধ্যে ২৫ হাজারই থাকেন ওকিনাওয়া দ্বীপে। এসব সেনাদের ঘাঁটির জন্য বর্তমান পরিকল্পনাটিই একমাত্র সমাধান। তবে বেশিরভাগ ওকিনাওয়াবাসী চান ওই সামরিক ঘাঁটিটি এখন এই দ্বীপ থেকেই সরিয়ে নেওয়া হোক।
একবার এক সাক্ষাৎকারে তাকেশি ওনাগা বলেছিলেন টোকিওর যুদ্ধ পরবর্তী প্রতিরক্ষা পদক্ষেপ জাপান-যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা জোট তৈরি হয়েছে ওকিনাওয়ার আত্মত্যাগের বিনিময়ে। ফুটেনমা সামরিক ঘাঁটি স্থানান্তর পরিকল্পনা জাপানের মূল ভূখন্ড ও ওকিনাওয়া দ্বীপের মধ্যকার প্রায় শতাব্দী প্রাচীন এক বিতর্ক উস্কে দিয়েছে। ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত স্বাধীন রাইয়ুকু রাজ্যের অধীনে ছিল ওকিনাওয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত দিনগুলোতে জাপানের একমাত্র নিজস্ব যুদ্ধভূমি ছিল ওকিনাওয়া। জাপানের অন্য অঞ্চলের তুলনায় ২০ বছর বেশি সময় ধরে মার্কিন শাসনের অধীনে ছিল দ্বীপটি।
তাকেশি ওনাগার ছেলে ও ওকিনাওয়ার সংসদ সদস্য তাকিহারু শনিবারের বিক্ষোভে বলেছেন, এখনও ওকিনাওয়াবাসী মূল ভূখন্ডের স্বার্থে ত্যাগ স্বীকারে বাধ্য হচ্ছে। তিনি বলেন, এই স্থানান্তর ইস্যুটি ওকিনাওয়ায় ঠেলে পাঠানো হয়েছে কারণ মূল ভূখন্ডের কেউ এটাকে চায় না। তার দাবি দেশের বাকি অংশের মানুষও বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেছেন। তাকিহারু বলেন, ‘বাবার অপূর্ণ লক্ষ্য পূর্ণ করে তাকে একটি ভালো খবর দিতে আমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’