মিয়ানমারে রয়টার্স সাংবাদিকদের কারাদণ্ড

ভেতরে-বাইরে সমালোচনাতেও নীরব সু চি

রোহিঙ্গা গণহত্যার তথ্য সংগ্রহের সময় আটক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের দুই সাংবাদিককে কারাদণ্ড দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে চলছে মিয়ানমারের সমালোচনা। স্বল্প পরিসরে হলেও সমালোচনা চলছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরেও। তা সত্ত্বেও রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞ নিয়ে দীর্ঘদিন নীরব থাকার মতো করেই এবারেও নীরব রয়েছেন দেশটির নেত্রী অং সান সু চি। তবে সু চির নীরবতাকে সমর্থন করে দেশটির এক কর্মকর্তা বলেছেন, বিচার বিভাগের সমালোচনা আদালত অবমাননার শামিল।মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি

গত বছরের ১২ ডিসেম্বর আটক হওয়ার সময়ে ৩২ বছর বয়সী ওয়া লোন ও ২৮ বছরের কিয়াও সোয়ে ও নামের ওই দুই সাংবাদিক রাখাইনের ইন দীন গ্রামে ১০ রোহিঙ্গা হত্যার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। রাখাইনে সেনা অভিযানের কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় সাত লাখ রোহিঙ্গা। আট মাস ধরে শুনানির পর সোমবার তাদের সাত বছরের দণ্ড ঘোষণা করে আদালত।

রয়টার্স সাংবাদিকদের নিয়ে একবারই মুখ খুলেছিলেন সু চি। জাপানের সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ওই দুজন রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইন ভেঙেছেন। তার এই বক্তব্যের সমালোচনা করে বিভিন্ন মানবাধিকার গ্রুপ। তাদের মতে সু চির বক্তব্য আদালতের রায়কে প্রভাবিত করতে পারে। এছাড়া রাখাইন সংকট নিয়ে গঠিত উপদেষ্টা বোর্ডের সাবেক সদস্য ও মার্কিন কূটনীতিক বিল রিচার্ডসন অভিযোগ করেছিলেন এই বছরের শুরুতে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের সময়েও দুই সাংবাদিকের নিন্দা করেছিলেন সু চি।

noname

সোমবার ইয়াঙ্গুনের আদালত ওই দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রমাণ পায়। ইয়াঙ্গুনের উত্তর জেলা জজ ইয়ে লউইন বলেন, ‘দুই সাংবাদিক মিয়ানমারের ঔপনিবেশিক আমলের রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার আইন লঙ্ঘন করেছেন। তাদের সাত বছর কারাদণ্ড দেওয়া হলো। ১২ ডিসেম্বর থেকে তাদের দণ্ড কার্যকর হচ্ছে বলে বিবেচনায় নেওয়া হবে।’ রায় ঘোষণার পরই জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দণ্ড ঘোষণার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেয়। সোমবার এই রায় ঘোষণার সমালোচনা করে খবর প্রকাশ করেছে মিয়ানমারের বেশ কয়েকটি সংবাদপত্র। বেশ কয়েকটি নাগরিক গোষ্ঠীও এই দণ্ড ঘোষণার সমালোচনা করেছে।

মিয়ানমারের সর্বাধিক পঠিত বেসরকারি মালিকানাধীন সংবাদপত্র সেভেন ডে ডেইলি মঙ্গলবার প্রথম পাতায় একটি কালো অংশ ছেপেছে। সাংবাদিকদের কারাদণ্ডের সমালোচনা করে ‘মিয়ানমারের জন্য এক দুঃখের দিন’ শিরোনামের একটি সম্পাদকীয়ও প্রকাশ করেছে সংবাদপত্রটি। বেসরকারি মালিকানাধীন মিয়ানমার টাইমস প্রথম পাতা জুড়ে কারাবন্দি সাংবাদিক কিয়াও সোয়ে ও’র সাদাকালো একটি ছবি ছেপেছে।  ১৬টি নাগরিক গোষ্ঠী টুইটারে এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘এই বিচার স্বাধীন; এমনকি নিরপেক্ষও ছিল না। আর তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত ছিল।’সাজাপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের মুক্তি দাবি করেছে জাতিসংঘও

তবে নীরব রয়েছেন জান্তা সরকারের সময়ে নিজে ১৫ বছর গৃহবন্দি থাকা মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি। এমনকি বিচার প্রক্রিয়ার পুরো সময়জুড়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা চললেও কার্যত নীরবতা বজায় রেখেছেন তিনি। রয়টার্সের সাবেক সাংবাদিক ও বর্তমানে সরকারের উপতথ্যমন্ত্রী অং হ্লা তুন অবশ্য সু চির নীরবতাকেই সমর্থন করছেন। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, বিচার ব্যবস্থার সমালোচনাকে আদালত অবমাননার শামিল বলে দেখা হতে পারে। আমার মনে হয় না তিনি এটা করবেন।

দুই সাংবাদিকের আইনজীবীরা ঘোষিত দণ্ডের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন। সংবিধান অনুসারে সু চির ঘনিষ্ট মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট অবশ্য সাংবাদিকদের সাজা চূড়ান্তভাবে মওকুফ কজরে দিতে পারেন। গত এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট সাড়ে ৮ হাজার কারাবন্দিকে মুক্তি দেন। এর মধ্যে ৩৬ জন ছিলেন রাজনৈতিক বন্দি। তবে রাজনৈতিক বন্দিদের সহায়তা সংস্থার হিসেবে তখনিই রাজনৈতিক কার্যক্রম সংশ্লিষ্টতায় তখনও কারাবন্দি ছিলেন দুই রয়টার্স সাংবাদিকসহ ২০০ জন।