সু চি’র কর্মকাণ্ড অপ্রত্যাশিত, তবে পুরস্কার প্রত্যাহার নয়: নোবেল ফাউন্ডেশন

মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা ও শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি’র পুরস্কার প্রত্যাহার করা হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন নোবেল ফাউন্ডেশনের প্রধান লারস হেইকেনস্টেন। শুক্রবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সু চি’র কিছু কিছু কর্মকাণ্ড ‘অপ্রত্যাশিত’ হলেও তাকে দেওয়া নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহার করা হবে না।

সু চি
গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ লাখ মানুষ। সম্প্রতি জাতিসংঘের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা নিপীড়নের ঘটনায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া বেসামরিক সর্বোচ্চ নেতা অং সান সু চিরও সমালোচনা করে বলা হয়েছে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ ঠেকাতে নিজের নৈতিক অবস্থান ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।

রোহিঙ্গা নিপীড়ন প্রশ্নে নীরব ভূমিকার কারণে শুরু থেকেই সমালোচিত হয়ে আসছেন সু চি। বার বারই উঠেছে তার নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহারের দাবি। তবে সু চি’র নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহারে রাজি নয় নোবেল ফাউন্ডেশন। শুক্রবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রয়টার্সের সঙ্গে নোবেল ফাউন্ডেশনের প্রধান লারস হেইকেনস্টেনের সাক্ষাৎকারপর্বে আবারও আসে সু চি’র নোবেল প্রত্যাহারের প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, নোবেল পুরস্কার দেওয়ার পর ঘটা কোনও ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় পুরস্কার প্রত্যাহারের কোনও মানে নেই।

পুরস্কার প্রত্যাহারে রাজি না হলেও মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রশ্নে সু চি’র অবস্থান ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে মনে করেন লারস হেইকেনস্টেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি তিনি মিয়ানমারে যা করছেন তা নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন উঠছে। আমরা মানবাধিকারের পক্ষে অবস্থান নিই এবং এটাই আমাদের মূল মূল্যবোধের জায়গা। সুতরাং সে জায়গা থেকে আমরা অবশ্যই মনে করি তিনি (সু চি) এর জন্য দায়ী, এটা খুব অপ্রত্যাশিত।’  

সু চি’র পুরস্কার প্রত্যাহার না করার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অনুমোদন করি না কিংবা সঠিক মনে করি না- এমন কাজ নোবেল পুরস্কারজয়ীরা পুরস্কার গ্রহণের পর করেছেন, এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে, সামনেও ঘটবে।

নোবেল ফাউন্ডেশনের প্রধান
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিক্রিয়া জানতে সোমবার (১ অক্টোবর) মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জ হটেকে ফোন করে সাড়া পাওয়া যায়নি। গত মাসে তিনি বলেছিলেন, টেলিফোনে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন না। শুধু অর্ধ সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলবেন তিনি।

স্টকহোমভিত্তিক নোবেল ফাউন্ডেশন নোবেল পুরস্কারের প্রশাসনিক কাজগুলো দেখাশোনা করে থাকেন। সুইডেন ও নরওয়ের নোবেল কমিটি পুরস্কার ঘোষণা করে থাকে। গত আগস্টে নরওয়ের নোবেল কমিটি বলেছিল, পুরস্কার প্রদানের পর তা প্রত্যাহার করে নেওয়ার বিধান তাদের কমিটিতে নেই।
উল্লেখ্য, মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী হিসেবে বিবেচিত সু চি’র নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য ক্যাম্পেইন শুরু হয় মূলত ২০১২ সালে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত সহিংসতা শুরু হওয়ার পর। ২০১‌২ সালের ওই সহিংসতায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষকে ঘরহারা হতে হয়েছিল। মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলমানরা দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রীয় ও সংখ্যাগুরু বৌদ্ধদের সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে বরাবরই নিশ্চুপ থেকেছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এ নেত্রী। ২০১৫ সালের ৮ই নভেম্বর মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পদার্পণের ঐতিহাসিক নির্বাচনে সু চির দল কোনও মুসলিম ব্যক্তিকে প্রার্থী না করার পর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আল জাজিরা তুলে আনে মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন নিয়ে সু চির ধারাবাহিক নীরবতার প্রশ্ন। দলের বিভিন্ন শীর্ষ নেতাকে উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলিম প্রার্থীদের নিজ দল থেকে সরিয়ে দিয়েছেন দেশটির গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী এবং এনএলডি’র প্রধান অং সান সুচি।