'কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা'র মুখোমুখি ইরান

ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরানের পরমাণু চুক্তির সুবাধে যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ওপর থেকে যে নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নিয়েছিল, চলতি মাস থেকে সে নিষেধাজ্ঞাগুলো পুনরায় বহাল হতে যাচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এ মাস থেকেই তেহরানের ওপর পুরনো সব নিষেধাজ্ঞা বহাল করছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। হোয়াইট হাউস বলছে, এটি হতে যাচ্ছে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ওপর আরোপ করা ‘সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’।তবে মার্কিন এ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তেহরান খুব বেশি ‘উদ্বিগ্ন নয়’ বলে জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 
noname

২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া, জার্মানি ও ফ্রান্সের কাছে ইউরেনিয়াম প্রকল্প সীমিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করে ইরান। চুক্তির মেয়াদ ২০২৫ সাল পর্যন্ত। তবে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের দাবি ছিল ইউরোপীয় স্বাক্ষরকারীরা ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়ে স্থায়ী অবরোধ আরোপ করুক। এই দাবি মানতে নারাজ ইউরোপীয় ৫ দেশ। তারা ২০২৫ সালের পর ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পক্ষে। এমন বাস্তবতায় চলতি বছরের মে মাসে চুক্তি থেকে বের হয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র। সে সময়ই নতুন করে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হয়। সে সময়ই ছয় ইরানি নাগরিক ও ৩টি কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। 

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, জাহাজ নির্মাণ, বাণিজ্য, অর্থায়ন, ব্যাংক ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ইরানের ওপর আরোপিত পুরনো নিষেধাজ্ঞাকে সোমবার থেকে নতুন করে কার্যকর করতে যাচ্ছে। এবার নতুন ধাপে জারিকৃত নিষেধাজ্ঞায় থাকছে ৭০০রও বেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, নৌযান ও উড়োজাহাজ। থাকছে বৃহৎ ব্যাংক, জাহাজ ও তেল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোও। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাইক পম্পেও এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে তেহরানকে ১২টি শর্ত বেধে দিয়েছেন; এর মধ্যে আছে ইরানের পরমাণু ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ ও সিরিয়া-ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা।

২০১৫ সালে জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন-জেসিপিওএ’র আওতায় ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় ‍যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৬ সালে নির্বাচনি প্রচারণার সময়ই চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তিনি সে সময় বলেন, প্রেসিডেন্ট হলে পূর্বসূরি বারাক ওবামার করা এ চুক্তি বাতিল করবেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী প্রতি ৯০ দিন পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিশ্চিত করতে হতো যে, ইরান এ সমঝোতা মেনে চলছে। যদি তিনি মনে করেন, তেহরান সমঝোতা মানছে না তাহলে মার্কিন কংগ্রেস এ সমঝোতা বাতিল করতে বাধ্য।   ১২ মে ট্রাম্প চুক্তিটি নতুন করে নবায়ন না করায় যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে চুক্তিটি বাতিল হয়ে যায়। 

শুক্রবার জারিকৃত ওয়াশিংটনের নতুন এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় কেবল ইরানই থাকছে না; যারা যারা এ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে ব্যবসা করবে কিংবা তেল কিনবে তাদের ওপরও খড়্গ পড়তে যাচ্ছে মার্কিন প্রশাসনের। যদিও ভারত, ইতালি, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৮টি দেশকে আপাতত এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। তুরস্কও ইরানি তেল কেনার ক্ষেত্রে এ ছাড় চায় বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। পম্পেও জানিয়েছেন, ছাড় দেওয়া দেশগুলোকে ইরানের তেল ক্রয় বন্ধে সময় বেধে দেওয়া হতে পারে; ওই সময়ের মধ্যে তারা ধীরে ধীরে ব্যবসা গুটিয়ে নেবে। 

চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্য দেশগুলো মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের একা এই চুক্তি বাতিলের এখতিয়ার নেই। মার্কিন প্রেডিডেন্টের একতরফাভাবে দেওয়া এ ঘোষণা ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থানের বিপক্ষে গেলো। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি অব্যাহত রাখার পক্ষে থাকলেও ভবিষ্যতে দেশটির ‘ব্যালাস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম'-এর কী হবে তা নিয়ে আলোচনায় রাজি আছে। দেশটির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির বেশ কিছু ধারার মেয়াদ ২০২৫ সাল নাগাদ শেষ হয়ে যাবে। এরপর দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে এখনই আলোচনায় আগ্রহী দেশ তিনটি। পাশাপাশি সিরিয়া এবং ইয়েমেনে চলমান গৃহযুদ্ধে ইরানের ভূমিকা নিয়েও আলোচনায় আগ্রহী পশ্চিমা দেশগুলো। অনেক মার্কিন সামরিক উপদেষ্টাও চুক্তি বহাল রাখার পক্ষে ছিলেন।