আসিয়া বিবিকে খালাসের রায়

বিক্ষোভ থামাতে কট্টরপন্থীদের সঙ্গে চুক্তি পাকিস্তানের

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসিয়া বিবির খালাসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভের রাশ টানতে উদ্যোগী হয়েছে পাকিস্তান। কট্টরপন্থী বিক্ষোভকারীদের শান্ত করতে তাদের সঙ্গে একটি চুক্তিতে উপনীত হয়েছে ইমরান খানের সরকার। কট্টর ইসলামপন্থী দল তেহরিক-ই-লাবাইকের (টিএলপি) সঙ্গে করা এ চুক্তিতে আসিয়া বিবির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। একইসঙ্গে এ ইস্যুতে আন্দোলনরত বিক্ষোভকারীদের মধ্যে আটককৃতদের মধ্যে ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। তবে সহিংসতায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী মামলা চলবে।

nonameমুক্তির পর আসিয়া সপরিবারে দেশ ছাড়তে পারেন পারে এমন ইঙ্গিতের মধ্যেই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী বিক্ষোভ বন্ধ করে দলীয় সমর্থকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে নিয়েছে তেহরিক-ই-লাবাইক। ইতোপূর্বে এ ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল দলটি। সর্বাত্মক বিক্ষোভের পাশাপাশি বিচারকদেরও প্রতিও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিল তারা।

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী তেহরিক-ই-লাবাইকের সঙ্গে সরকারের চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিবিসি’কে তিনি বলেন, এ মুহূর্তেই কট্টরপন্থা দমন না করতে পারায় সমঝোতার পথে হাঁটতে হয়েছে সরকারকে। তার ভাষায়, ‘দুইটি রাস্তা আছে। শক্তি প্রয়োগ অথবা আলাপ আলোচনা। কিন্তু যখনই আপনি শক্তি প্রয়োগ করতে যাবেন, তখন লোকজনের প্রাণহানি ঘটতে পারে। একটি রাষ্ট্রের এমনটা করা উচিত নয়। আর আলোচনার মাধ্যমে কিছু পেতে হলে আপনাকে কিছু ছাড় দিতে হবে।’

কট্টরপন্থীদের কাছে সরকার আত্মসমর্পণ করছে না বলেও মন্তব্য পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে সরকার যা করছে তা হচ্ছে আগুনে পানি ঢেলে দেওয়া। তবে সমাধান খুঁজে বের করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এর আগে আসিয়া বিবির খালাসকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত বিক্ষোভমুখর পরিস্থিতি মোকাবেলায় শুক্রবার পাকিস্তান সরকার দেশটির মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। বিক্ষোভের মুখে বন্ধ করে দেওয়া হয় বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। চলতে থাকে সড়ক অবরোধ। এরমধ্যেই শুক্রবার মওলানা সামি উল হক নামের একজন ইসলামপন্থী রাজনীতিবিদের হত্যাকাণ্ডে অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়।

nonameতিন সন্তানের জননী খৃস্টান নারী আসিয়া বিবি (৪৭) ২০০৯ সালের এক গরমের দিনে খামারে কাজ করার সময় মুসলমান শ্রমিকদের গ্লাসে চুমুক দিয়ে পানি খেয়েছিলেন। এতে ক্ষিপ্ত মুসলমান সহকর্মীরা দাবি করেছিল, মুসলমান না হয়ে তাদের গ্লাসে আসিয়া পানি খাওয়ায় গ্লাসটি ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে গেছে। তারা আসিয়াকে ইসলাম গ্রহণ করতে চাপ দেয়। আসিয়া তা প্রত্যাখ্যান করলে মুসলমান সহকর্মীদের সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। পরে মুসলমান শ্রমিকরা দাবি করে, আসিয়া বিবি ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদকে (সা.) নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। আসিয়া বিবি উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হওয়ার কথা স্বীকার করলেও ধর্ম অবমাননার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। দেশটির প্রথম নারী হিসেবে ২০১০ সালে পাকিস্তানের ধর্ম অবমাননা সংক্রান্ত আইনে আসিয়া বিবিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিশ্বজুড়ে এ নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়। এমনকি পাকিস্তানেও তার পক্ষে দাঁড়ান অনেকে। তবে এদের মধ্যে অন্তত দুইজনকে তাদের অবস্থানের কারণে হত্যার শিকার হতে হয়েছে। আসিয়া বিবির পক্ষে কথা বলায় পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসিরকে তারই দেহরক্ষী হত্যা করে। আর সেই দেহরক্ষীকে পাকিস্তানে বীর হিসেবে আখ্যায়িত করে তেহরিক-ই-লাব্বাইক। গত ৩১ অক্টোবর আসিয়া বিবির মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।

রায়ের পরপরই বিক্ষোভ শুরু করে তেহরিক-ই-লাব্বাইক (টিএলপি)। তারা ইসলামাবাদ, করাচি ও লাহোরের গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো রাস্তা অবরোধ করে। টিএলপির সহ-প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আফজাল কাদরি পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সাকিব নিসার ও রায় বাতিল করা বেঞ্চের অপর দুই বিচারককে হত্যার আহ্বান জানিয়েছে। তার ভাষ্য, ‘তাদের তিনজনকেই হত্যা করা উচিত। হয় নিরাপত্তারক্ষী, না হয় গাড়ির চালক আর না হয় বাবুর্চির উচিত তাদেরকে হত্যা করা।’ মুহাম্মদ আফজাল কাদরি পাকিস্তান সরকার ও সেনাপ্রধান জেনারেল কামার বাজওয়াকে উৎখাতেরও আহ্বান জানিয়েছে দেশটির সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় শুক্রবার মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধের নির্দেশ দেয় পাকিস্তান সরকার। রাজধানী ইসলামাবাদে টেলিফোন নেটওয়ার্কও বন্ধ করে দেওয়া হয়। দেশটির সেনাবাহিনী সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখে। এরমধ্যেই শনিবার দুই পক্ষের সমঝোতার খবর সমানে আসে। সূত্র: বিবিসি।