মালয়েশিয়ার অভিবাসন কেন্দ্রে আটক থাকা সাত রোহিঙ্গা শিশুর মুক্তি

মালয়েশিয়ার কেদাহতে সাত মাস ধরে অভিবাসন কেন্দ্রে আটক থাকা সাত রোহিঙ্গা শিশুকে মুক্তির আদেশ দিয়েছে সেদেশের আদালত। রবিবার (১৮ নভেম্বর) আলোর সেতার হাইকোর্ট এ রায় দেয়। এ সাত রোহিঙ্গা শিশুকে কুয়ালালামপুরে ইয়াইয়াসান চৌ কিট আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হবে। মালয়েশীয় সংবাদমাধ্যম দ্য স্টার-এর এক প্রতিবেদন থেকে এসব কথা জানা গেছে।

২০১৫ সালে লংকাউয়ি উপকুল থেকে আটক হওয়া রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়ার মূল ভূখণ্ডে নেওয়া হচ্ছে (ফাইল ফটো)গত ৩ এপ্রিল লংকাউয়ি উপকূল থেকে ৫৬ রোহিঙ্গাকে আটক করে মালয়েশিয়ার মেরিটাইম এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি। তাদেরকে বেলান্তিক অভিবাসন ডিপোতে রাখা হয়। নৌকায় করে এসব রোহিঙ্গা মিয়ানমারের রাখাইন থেকে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিয়েছিল। আটক হওয়া ওই ৫৬ রোহিঙ্গার মধ্যে ১৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, ১৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও ২০ জন শিশু-কিশোর। এরমধ্যে সর্বকনিষ্ঠ শিশুর বয়স পাঁচ বছর। আটককৃত রোহিঙ্গা শিশুদের মুক্তির জন্য তৎপরতা শুরু করে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। এর মধ্যে সাত শিশুর পরিবারের সদস্যদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয় তারা। এ সাত শিশুর অবিলম্বে মুক্তি চেয়ে আদালতে রিট আবেদন করা হয়। অভিবাসন কেন্দ্রের শাস্তিমূলক পরিবেশ থেকে মুক্তি দিয়ে ওই শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়।

অবশেষে রবিবার (১৮ নভেম্বর) তাদেরকে মুক্তির আদেশ দিয়েছে আলোর সেতার হাইকোর্ট। ৫০০ মালয়েশীয় রিঙ্গিত জামানত নিয়ে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়ার ও কুয়ালালামপুরের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রোহিঙ্গারা রাখাইনে থাকলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। উগ্র বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে সেখানকার সেনাবাহিনী ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে স্থাপন করেছে সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের চিহ্ন। ছড়িয়েছে বিদ্বেষ। ৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনে পরিচয়হীনতার কাল শুরু হয় রোহিঙ্গাদের। এরপর কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনও নিবন্ধনপত্র,কখনও নীলচে সবুজ রঙের রশিদ,কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড,কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের রং-বেরঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে। ধাপে ধাপে মলিন হয়েছে তাদের পরিচয়। ক্রমশ তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন বেনাগরিকে। গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ লাখ মানুষ। সম্প্রতি জাতিসংঘের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা নিপীড়নের ঘটনায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া বেসামরিক সর্বোচ্চ নেতা অং সান সু চিরও সমালোচনা করে বলা হয়েছে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ ঠেকাতে নিজের নৈতিক অবস্থান ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। মিয়ানমারে নাগরিকত্বহীন অসহায় রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ সাগরপথে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায়ও পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে থাকে। 

শুক্রবার (১৭ নভেম্বর) জাতিসংঘ মহাসচিবের শিশু ও সশস্ত্র সংঘাত বিষয়ক সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে,গত ১৪ মাসে মিয়ানমারে ৬৬৯ শিশু নিহত ও ৩৯ জন বিকলাঙ্গ হয়েছে। এদের বেশিরভাগই রোহিঙ্গা শিশু। ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে সামরিক অভিযান জোরদারের পর হতে মিয়ানমারের শিশুরা বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র বলেন,আমি মনে করি বাংলাদেশিরা ১০ লাখ মানুষকে আশ্রয় দিয়ে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে। সত্যিকার অর্থেই এটা বড় পদক্ষেপ। রোহিঙ্গাদের জোর করে মিয়ানমার পাঠানো উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেছেন স্টেফানি।