ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির জেরে নিয়ন্ত্রণ রেখার স্পর্শকাতর এলাকায় বসবাসকারী পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের হাজার হাজার বাসিন্দা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। নিরাপত্তার আশায় এসব বাসিন্দারা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সরকারি ভবন বা নিজেদের আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে। সেখানকার বাসিন্দারা বলছেন যেসব পরিবার নিজেদের বাড়িতে বা অন্যকোথাও কংক্রিটের বাঙ্কারের ব্যবস্থা করতে পেরেছেন তারাই শুধু ওই এলাকায় থাকছেন। বাকিরা কাশ্মির ছেড়ে মুজাফরাবাদ বা আরও ভেতরের দিকে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের সরকারি কর্তৃপক্ষ প্রায় একশো পরিবারকে আশ্রয় দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মিরের পুলওয়ামায় ভারতের ‘সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের’ গাড়িবহরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় বাহিনীটির অন্তত ৪০ জন সদস্য প্রাণ হারান। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী জইশ-ই-মোহাম্মদ হামলার দায় স্বীকার করে। মঙ্গলবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) ভারতীয় বিমান বাহিনী ৭১-পরবর্তী ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের আকাশসীমায় ঢুকে বিমান হামলা চালানোর পর জানায়,জইশ-ই মোহাম্মদের ঘাঁটি ধ্বংসের উদ্দেশ্যেই তারা ওই ‘অসামরিক অভিযান’ পরিচালনা করেছে। বুধবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে দুটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে পাকিস্তান। বিপরীতে ভারতও পাকিস্তানের একটি ফাইটার জেট ভূপাতিত করার দাবি করে। এছাড়াও দুই দেশই কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে।
পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরকে ডাকা হয় আজাদ কাশ্মির নামে। স্বশাসিত ওই প্রদেশের বেসামরিক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমাদ রাজা কাদরি বলেছেন, বুধবার ভারতীয় বাহিনীর হামলায় তিন পাকিস্তানি আহত হওয়ার পর সেখান থেকে বাসিন্দারা সরে যাওয়া শুরু করেছেন।
আজাদ কাশ্মিরের বাসিন্দারা বলছেন, নিয়ন্ত্রণ রেখার খিলানা ও চাকোথিসহ আশেপাশের এলাকায় আগের দিন রাতভর এবং বুধবারেও সামান্য বিরতি দিয়ে পাল্টাপাল্টি গুলিবর্ষ হয়েছে। সাব্বির আহমেদ নামে চাকোথির এক বাসিন্দা জানান, অন্য অনেক পরিবারসহ তাদের পরিবার মুজাফফরাবাদ বা আরও ভেতরের দিকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। আজাদ কাশ্মিরের মন্ত্রী আহমাদ রাজা কাদরি জানিয়েছেন চাকোথির বিভিন্ন গ্রামের অন্তত ৬১টি পরিবার এলাকা ছেড়েছে। তাদের মধ্যে ২১টি পরিবারকে কাশ্মিরের আরেক জেলা হাতিয়ান বালার দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া বিম্বার জেলার ১৮টি পরিবার ও কোটলি জেলার ১২টি পরিবারকে সরকারি ভবনে থাকতে দেওয়া হয়েছে। বাকিরা তাদের আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে বলে জানান তিনি।
কাশ্মিরের কর্মকর্তারা বলছেন, কাশ্মিরের স্পর্শকাতর এলাকার মানুষদের জন্য কমিউনিটি বাঙ্কার নির্মাণে বরাদ্দ অনুমোদন করেছে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার। কর্মকর্তারা বলছেন, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ২০১৮ সালে এধরণের ৬৭৮টি বাঙ্কার নির্মাণ করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা ছিলো ৯২৬টি বাঙ্কার। বাকিগুলোর নির্মাণ কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
আজাদ কাশ্মিরের কোনও কোনও কর্মকর্তা এবং বাসিন্দার দাবি, নিবন্ধন ছাড়া বা কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে বহু পরিবার নিয়ন্ত্রণ রেখা থেকে দূরে সরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। কোটলি জেলার ডেপুটি কমিশনার ড. ওমর আজম বলেন, খুইরাত্তা, চারোই এবং তত্তপানি সেক্টরের প্রায় দুই হাজার বাসিন্দা এরইমধ্যে এলাকা ছেড়ে গেছে। এছাড়া নাকিয়াল সেক্টরের বহু মানুষও সরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
কাশ্মিরের বেসামরিক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমাদ রাজা কাদরি জানিয়েছেন সময়ের প্রয়োজনে শহর এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুই দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, কোথাও কোথাও এসব ভবনে বাড়ি ছেড়ে আসা মানুষদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রয়োজন পড়লে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটিও বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।