নিউ জিল্যান্ডের হামলা: সুহাইল শহিদের দুই মেয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে বাবাকে

১৫ মার্চ, ২০১৯। শুক্রবার। নিউ জিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে সেদিন সকালবেলা বৃষ্টি হচ্ছিলো। দুই সন্তানের জনক পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সুহাইল শহিদ ওইদিন আর তার বড় মেয়ে ওয়াজিহাকে গাড়িতে করে নামিয়ে দিলেন স্কুলে। দুপুর ১টা ১০ মিনিটের দিকে স্ত্রীকে ফোন করে সুহাইল জানান, জুমার নামাজ আদায়ের পরপরই বাড়িতে ফিরবেন তিনি। একসঙ্গে দুপুরের খাবার খাবেন। তবে সে খাবার আর খাওয়া হলো না তার। বন্দুকধারীর হামলায় মসজিদের ভেতরেই প্রাণ হারাতে হয় তাকে। স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা স্ত্রী আসমা শহিদ। সন্তানরাও খুঁজে ফিরছে তাদের বাবাকে। মায়ের কাছে ২ বছর বয়সী মেয়ে নায়িরার জিজ্ঞাসা, ‘মা, বাবা কোথায়?’ আর বাবার শূন্যতা বোধ করে কেঁদে যাচ্ছে ৫ বছরের ওয়াজিহাও। অসহায় এ পরিবারের পাশে থাকতে সিডনি থেকে ক্রাইস্টচার্চে স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সুহাইলের ভাই ও পরিবার।

ওয়াজিহা ও নায়িরা
১৫ মার্চ (শুক্রবার) ২৮ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয় নাগরিক ব্রেন্টন ট্যারান্ট নামের সন্দেহভাজন হামলাকারীর লক্ষ্যবস্তু হয় নিউ জিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদ। শহরের হাগলি পার্কমুখী সড়ক ডিনস এভিনিউয়ের আল নূর মসজিদসহ লিনউডের আরেকটি মসজিদে তার তাণ্ডবের বলি হয় অর্ধশত মানুষ।  এর মধ্যে শুধু আল নূর মসজিদে নিহত হন ৪২ জন। তাদেরই একজন সুহাইল শহিদ।

তিন বছর ধরে নিজ দেশ পাকিস্তানে যাননি সুহাইল। মাকে দেখার ইচ্ছা হচ্ছিলো তার। ১৫ মার্চ দুপুরে মসজিদে ঢুকে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে গিয়ে বলেছিলেন অক্টোবরের ছুটিতে দেশে যাবেন তিনি। তবে দুপুর ১টা ৪০ মিনিটের দিকে আল নূর মসজিদে ঢুকে এক বন্দুকধারী গুলি ছুড়তে শুরু করলে সুহাইলসহ নিহত হন ৪২ জন। অল্প সময়ের মধ্যেই স্ত্রী জানতে পারেন মসজিদে বন্দুকধারীর হামলা হয়েছে। সুহাইলের অফিসের ফোন ও ব্যক্তিগত ফোন-দুই জায়গাতেই চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন আসমা। তবে কোনও পাশ থেকেই ছিল না কোনও সাড়া।

আসমা বলেন, ‘আমি ভাবছিলাম, হয়তো সুহাইল আমাকে ফোন করবে, হয়তো ও আহত হয়েছে। আমি জানতাম না ও কোথায় আছে। তবে ওর কাছ থেকে আমি আর ফোন পেলাম না।

এরপর সিডনিতে বসবাসরত সুহাইলের বড় ভাই নাভিদকে ফোন দেন আসমা। নাভিদ আহত ও নিখোঁজদের খোঁজ নিতে পুলিশকে ফোন দিতে থাকেন। সংবাদমাধ্যমের প্রাথমিক খবরে ৯ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছিল। নাভিদ সুহাইলকেও ফোন দিয়ে যেতে থাকেন। তবে কোনও সাড়া নেই। সে রাতে সুহাইলের এক প্রতিবেশির সঙ্গে কথা বলেন নাভিদ। ওই প্রতিবেশি গলায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। তবে তিনি ছিলেন আশঙ্কামুক্ত এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন। তার কাছ থেকেও সুহাইলের ব্যাপারে কিছু জানা গেলো না।

স্ত্রী আসমার সঙ্গে সুহাইল
সুহাইলের মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হতে দুইদিন লেগে গিয়েছিল। শনিবার (১৬ মার্চ) আহতদের তালিকায় তাকে খুঁজে পাওয়া গেলো না। রবিবার (১৭ মার্চ) নিহতদের নামের প্রাথমিক তালিকা পড়ে শোনান এক কর্মকর্তা। দুই নম্বর পৃষ্ঠার দ্বিতীয় ভাগে এসে পাওয়া গেলো সুহাইলের নাম। নাভিদ বলেন, ‘তখনই আমি জানলাম, আমার ভাই আর এ দুনিয়ায় নেই।’

ক্রাইস্টচার্চের মেমোরিয়াল পার্ক সিমেট্রিতে সুহাইলকে কবর দেওয়া হয়। তার পরিবার এখনও জানে না ঠিক কিভাবে সুহাইল মারা গেলেন। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চায় তারা।

৪০ বছর বয়সী নাভিদও তার ভাইয়ের মতোই একজন রাসায়নিক প্রকৌশলী। উন্নত জীবন গড়তে সিডনিকে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। আর আরেক ভাই ৩৮ বছর বয়সী তানভীর থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটে। ২০১৭ সালে লাহোর থেকে অকল্যান্ডে যান সুহাইল। নাভিদ জানান, চাইলে আইসিআই পাকিস্তান লিমিটেডে (ইমপেরিয়াল কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ) ভালো বেতনে চাকরি করতে পারতেন তার ভাই, তার বাড়ি-গাড়ি সবই থাকতো। তবে তিনি তার পরিবারকে যতোটা সম্ভব সকল সুযোগ সুবিধার মধ্যে রাখতে চেয়েছিলেন। ‘ও নিউ জিল্যান্ডকে নিশ্চিত থাকার জায়গা বলে মনে করতো, নিরাপদ পরিবেশে সন্তানরা ভালোভাবে শিক্ষা নিতে পারবে বলে আশা ছিল তার। আর এটাই ছিল তার নিউ জিল্যান্ডে থাকার পেছনে মূল উদ্দেশ্য।’ বলেন নাভিদ।

সুহাইলের দুই ভাই তানভীর (বামে) ও নাভিদ
প্রথমে সুহাইল ও তার পরিবার অকল্যান্ডে থাকতো। ওয়াটারকেয়ার-এ চাকরি করতেন তিনি। হেক্সিওন কোম্পানিতে প্রডাকশন ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর গত বছর ক্রাইস্টচার্চে চলে যান তারা।

ছোট ভাই সুহাইল সম্পর্কে নাভিদ বলেন, ‘সুহাইল ছিল খুব মেধাবি ও পেশাদারিত্বপূর্ণ। ও খুব প্রেমময় ও যত্নবান ছিল, বিশেষ করে দুই মেয়ের প্রতি। নম্র ও সৎ ছিল সে-প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতো না।’

সুহাইলের স্ত্রী আসমা কিভাবে দুই মেয়েকে নিয়ে পরিস্থিতি সামলাবেন তা নিয়ে চিন্তিত নাভিদ। আসমারা পাকিস্তানে ফিরে গেলে তার ভাইয়ের দেখা উন্নত জীবনের স্বপ্ন ‘ধূলিস্যাৎ’ হয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি। সেকারণে নিজেই সিডনির ভালো চাকরিটি ছেড়ে স্ত্রী তিন সন্তানকে নিয়ে ক্রাইস্টচার্চে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নাভিদ। তিনি বলেন, ‘এ মাটিতেই শুয়ে আছে আমার ভাই। আর এখন নিউ জিল্যান্ডের সঙ্গে আমাদের আবেগের এক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।’

নাভিদ আরও বলেন, ‘যা কিছু ঘটেছে তাতে নিউ জিল্যান্ড কিংবা সেখানকার মানুষের কোনও দোষ নেই। এটি একটি ঘটনা আর আমরা সে ঘটনার শিকার। নিউ জিল্যান্ডের সরকারসহ প্রত্যেকে খুব সহযোগিতাপ্রবণ। তারা আমাদের প্রিয়জনকে আর ফিরিয়ে দিতে পারবে না ঠিকই, তবে তারা আমাদেরকে সম্মানিত করেছে, আমাদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েছে। আমাদের সঙ্গেই শোকাহত হয়েছে তারা।’