মিয়ানমারে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে দেশটির সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন চিত কো কো-সহ তার পুরো স্কোয়াডের সদস্যরা নিহত হয়েছে। উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইনের বুথিয়াডং শহর থেকে দূরবর্তী একটি এলাকায় এ সংঘর্ষ হয়। মিয়ানমারের সেনাসূত্র ও হতাহতদের আত্মীয়দের উদ্ধৃত করে দেশটির সংবাদমাধ্যম ইরাবতি খবরটি জানিয়েছে। আরাকান আর্মির দাবি, ওই ঘটনায় অন্তত ১২ জন সরকারি সেনা নিহত হয়েছে। তবে সংঘাতের কথা স্বীকার করলেও নিহত সেনাদের সংখ্যা উল্লেখ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।
ইতিহাস আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণসহ রাখাইনে সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নকে সামনে রেখে প্রচারণা চালায় আরাকান আর্মি। রাখাইনে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যের তথ্য বারবার সামনে আনার মধ্য দিয়ে সেখানকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনার বিরুদ্ধে সচেতন করে তুলছে তারা। কারও ধারণা, এই মুহূর্তে তাদের সদস্য সংখ্যা ৩ হাজার। কেউ আবার মনে করেন, ৭ হাজার সেনা রয়েছে তাদের। তবে সবাই মানেন, সামরিক শক্তি নয়, তাদের প্রকৃত অস্ত্র আরাকানের জনসাধারণের অকুণ্ঠ সমর্থন। গত ১৪ জানুয়ারি মিয়ানমারের পুলিশ চৌকিতে আরাকান আর্মির হামলায় ১৩ জন নিহত হওয়ার জবাবে দেশটির সেনাবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। তখন থেকে দুই পক্ষের মধ্যে থেমে থেমে সংঘর্ষ চলছে। গত শুক্রবার নতুন করে সংঘর্ষ হয়।
কমান্ডার ইন চিফের কার্যালয়ের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জ মিন তুন স্বীকার করেছেন, শুক্রবার (৫ এপ্রিল) আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ক্যাপ্টেন চিত কো কো-সহ আরও কয়েকজন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে মোট কতজন সেনা নিহত হয়েছেন সে সংখ্যা জানাতে রাজি হননি তিনি।
শনিবার (৬ এপ্রিল) আরাকান আর্মির ওয়েবসাইটেও শুক্রবারের সংঘর্ষের ব্যাপারে জানানো হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, শুক্রবার ওয়ার নেট ইয়োন অঞ্চলে সেনাবাহিনীর অ্যানভিত্তিক লাইট ইনফ্যানট্রি ব্যাটালিয়নের (এলআইবি) প্রায় ১৫০ সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তাদের (এএ) যোদ্ধারা। ওই সংঘর্ষে প্রায় ১২ জন সরকারি সেনা নিহত হওয়ার দাবি করেছে আরাকান আর্মি। এলআইবি’র সেনাদের কাছ থেকে জব্দ করা কিছু সামরিক অস্ত্রের ছবিও প্রকাশ করেছে তারা। এরমধ্যে রয়েছে মিয়ানমারের উচ্চপর্যায়ের সেনা কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত একটি ৯ এমএম পিস্তল, একটি ৬০ এমএম মর্টার, চারটি আর্টিলারি শেল, সাতটি অ্যাসল্ট রাইফেল, একটি রিমোট চালিত জ্যামার, একটি রকেটচালিত গ্রেনেড, এক হাজারের বেশি তাজা গুলি ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম।
ক্যাপ্টেন চিত কো কো’র দীর্ঘদিনের বন্ধু সাউ লোয়িন সাউ শুক্রবার (৫ এপ্রিল) ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, তার বন্ধু যে দলটিকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলো সেখানে ২০ জনের বেশি সেনা ছিল না। কমান্ডারের নির্দেশ অনুযায়ীই চিত কো কো বুথিয়াডংয়ের ওয়ার নেট ইয়োন অঞ্চলে আরাকান আর্মির যোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ চালান। ওই অঞ্চলটি বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে অবস্থিত। অপ্রত্যাশিতভাবে আরাকান আর্মির সদস্যরা ওই স্কোয়াডকে ঘেরাও করে ফেলে। সাউ লোয়িন সাউ জানান, সংঘর্ষ চলাকালে রকেটচালিত একটি গ্রেনেড তার বন্ধুর গায়ে লাগে। পরে অন্য সরকারি সেনারা তার মরদেহ উদ্ধার করতে পারেননি। সাউ লোয়িন সাউ আরও জানিয়েছেন, তার বন্ধু সাগাইং অঞ্চলের মনিওয়াতে দায়িত্বরত ছিলেন। তবে সম্প্রতি তাকে রাখাইন রাজ্যের অ্যান শহরে মোতায়েন করা হয়। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলীয় কমান্ডের ঘাঁটি রয়েছে সেখানে।
আরাকান আর্মির দাবি, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বুথিয়াডং, কিয়াউকতো ও ম্রাউক উ শহরে সরকারি সেনাদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়েছে। শুক্রবার কিয়াউকতোর ফাউক পে পার্বত্য এলাকায় নিহত হয়েছে অন্তত তিন সরকারি সেনা। আর শনিবারের লড়াইয়ে নিহত হয়েছে ১০ সেনা।
গত মাসে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের মুখপাত্র উ জ হটে নেপিদোতে সাংবাদিকদের বলেন, তিন মাসে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১২ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। গত বুধবার (৩ এপ্রিল) বুথিয়াডংয়ের সাইদিন জলপ্রপাত এলাকায় একটি সামরিক হেলিকপ্টার দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। সে সময় ওই এলাকায় কয়েকশ’ রোহিঙ্গা বাঁশ চাষ ও ভেলা তৈরি করছিলো। ওই হামলায় অন্তত ৬ রোহিঙ্গা নিহত হয়। আহত হয় ১০ জনেরও বেশি।
উ জ হটে দাবি করেছেন, সরকারি সেনারা আরাকান আর্মির মোট ৫৮ জন সদস্যকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে। তবে আরাকান আর্মি ও অন্য আরাকানিজ সিভিল সোসাইটি গ্রুপগুলোর দাবি, নিহতদের বেশিরভাগই কোনও ধরনের সশস্ত্র সংঘাত ছাড়াই সরকারি বাহিনীর আক্রমণের বলি হয়েছেন।