উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করার প্রশ্নে যুক্তরাজ্যের আদালতে শুনানি শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২ মে) ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ সংক্রান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পিত হওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দেননি অ্যাসাঞ্জ। তিনি দাবি করেন, জনসাধারণের সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্যই তিনি সাংবাদিকতা করেছেন এবং এর জন্য প্রত্যর্পিত হতে তিনি রাজি নন। আগামী ৩০ মে পর্যন্ত শুনানি মুলতবি ঘোষণা করেছে আদালত।
২০১২ সালের জুন থেকে লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। গত ১১ এপ্রিল রাজনৈতিক আশ্রয় প্রত্যাহার করে তাকে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে তুলে দেয় ইকুয়েডর। তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের অনুরোধ সাপেক্ষেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ১১ এপ্রিল তাকে জামিনের শর্ত ভঙ্গের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ব্রিটিশ আদালত। তখন থেকে বেলমার্শ নামক ‘যুক্তরাজ্যের গুয়ানতানামো বে’ খ্যাত কুখ্যাত কারাগারে রাখা হয়েছে তাকে। ১ মে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে ৫০ সপ্তাহের সাজা ঘোষণা করা হয়। আর তার একদিন পরই (২ মে) যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে শুনানি শুরু করেছে ব্রিটিশ আদালত।
বৃহস্পতিবার বেলমার্শ কারাগার থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অনুষ্ঠিত শুনানিতে যোগ দেন অ্যাসাঞ্জ। আদালতে তিনি বলেন, ‘জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য যে সাংবাদিকতা করেছি, যে সাংবাদিকতা এতো এতো পুরস্কার জিতে নিয়েছে, তার জন্য নিজেকে প্রত্যর্পিত করতে চাই না আমি। আত্মসমর্পণের কোনও ইচ্ছা আমার নেই।’
শুনানিতে আদালত জানায় ‘প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শেষ হতে অনেক মাস লেগে যাবে।’ পরে ৩০ মে পর্যন্ত শুনানি মুলতবি ঘোষণা করে আদালত।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাউন্সেল বেন ব্রান্ডন ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মামলার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
সংক্ষিপ্ত শুনানিতে বিচারপতি মাইকেল স্নো অ্যাসাঞ্জকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে আত্মসমর্পণের ব্যাপারে তিনি সম্মতি জানাবেন কিনা। সম্মতি জানালে আপিল করার অধিকার হারাবেন তিনি। তবে এর সুবিধাজনক দিক হলো এতে বিষয়বস্তুগুলো সহজসাধ্য হবে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার সুরাহা হবে। তবে প্রত্যর্পণের ব্যাপারে সম্মতি দিতে অস্বীকৃতি জানান অ্যাসাঞ্জ।
ব্রান্ডনের কাছে স্নো জানতে চান, যুক্তরাষ্ট্রে এ অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা কত হতে পারে। জবাবে ব্রান্ডন জানান পাঁচ বছর।
বিচারপতি স্নো অ্যাসাঞ্জকে বলেন, বৃহস্পতিবারের এ শুনানি নিছকই একটি বিচারিক প্রক্রিয়া। তিনি বলেন, ‘৩০ মে আরও একটি নিছক বিচারিক শুনানি হবে, আমার ধারণা সেখানকার প্রাপ্তি আরও কম হবে।’ স্নো এর ধারণা, পরবর্তীতে ১২ জুন অনুষ্ঠেয় শুনানিতে কিছু অগ্রগতি হতে পারে। কারণ, সে সময় নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে লিখিত কাগজপত্র হাতে পেয়ে যাবেন তিনি। তবে স্নো এর ধারণা পুরোদমে অ্যাসাঞ্জের মামলার শুনানি হতে অনেক মাস লেগে যেতে পারে।
যৌন হয়রানির দুই অভিযোগে ২০১০ সালের ২০ আগস্ট অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে দুইটি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে একদিনের মাথায় প্রত্যাহার করে নেয় সুইডেন। তবে সে দেশে চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে ২০১০ সালের নভেম্বরে আবারও অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পরোয়ানা জারি করা হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে তিনি যুক্তরাজ্যের আদালতে আত্মসমর্পণের ১০ দিনের মাথায় জামিন লাভ করেন। অ্যাসাঞ্জের আইনজীবীরা আদালতে নতুন পরোয়ানাকে অবৈধ দাবি করলেও ২০১২ সালের মে মাসে যুক্তরাজ্যের আদালত একে বৈধ বলে রায় দেয়। রায়ের প্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্য থেকে সুইডেনে বা যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হতে পারে আশঙ্কায় জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ওই বছরের জুন মাসে জামিনের শর্ত ভঙ্গ করে ইকুয়েডর দূতাবাসে যান এবং রাজনৈতিক আশ্রয় নেন।
২০১০ সালের মার্চ মাসে মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা বিশ্লেষক ব্র্যাডলি ম্যানিং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দফতরের গোপন তথ্য উইকিলিকস-এর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এ ঘটনায় উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রচেষ্টা নিয়েছিল বিগত ওবামা প্রশাসনও। তবে অ্যাসাঞ্জের ভূমিকাকে আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ হিসেবে প্রমাণ করার রাস্তা না পেয়ে ওবামাকে থেমে যেতে হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৮ সালের মার্চে নতুন করে দায়ের করা অভিযোগে তাকে ‘হ্যাকিং’-এ অভিযুক্ত করে। ট্রাম্প প্রশাসনের দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, অ্যাসাঞ্জ ম্যানিংকে হ্যাকিং-এ সহায়তা দিয়েছিলেন বলেই ওইসব রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস সম্ভব হয়েছে।
২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত আফগান যুদ্ধের ৯০ হাজার, ইরাক যুদ্ধের ৪ লাখ, গুয়ানতানামো বে’র ৮০০ বন্দির জবানবন্দি ডাউনলোড করেন ম্যানিং। সেবছরই ৮ মার্চ প্রতিরক্ষা দফতরের কম্পিউটার পাসওয়ার্ড হ্যাক করতে তাকে সাহায্য করেন অ্যাসাঞ্জ। সেখান থেকেই উইকিলিকসকে তথ্য সরবরাহ করেন ম্যানিং।
গত ১১ এপ্রিল অ্যাসাঞ্জ গ্রেফতার হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে নতুন করে আইনি পদক্ষেপ নিতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসন যে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে নতুন আইনি পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে,তা জানা গিয়েছিল সেই গত বছর ডিসেম্বরেই। ২০১৮ সালের নভেম্বরে ভার্জিনিয়ার আলেকজান্দ্রিয়া জেলা আদালতে উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে অভিযোগ গঠনের নথি ভুল করে ফাঁস করে ফেলেন প্রসিকিউটররা। অ্যাসাঞ্জ গ্রেফতারের পর আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। জানা যায়, নতুন অভিযোগটি আনা হয়েছে দুইটি ধারায়। একটি হলো ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ বা প্রতারণা’ সংক্রান্ত ধারা, অপরটি কম্পিউটার জালিয়াতির মাধ্যমে ষড়যন্ত্র’ বিষয়ক ধারা ১০৩০।